সবুজ শিবিরের আর উইকেট পড়ল না। তিন উইকেটে দুশো বারো রান উঠতেই খেলা শেষ। তখন বেলা সওয়া দুটো। নট আউট রইলেন জহর একশো ষাট রানে, সমু কুড়ি রানে, অতিরিক্ত বত্রিশ রান।
”দাদা, আমি ভুল ভেবে কিছু কথা আপনাকে বলেছি, মাপ করে দেবেন”, জয়প্রকাশ হাত ধরল জহরের।
.
জহর ওকে বুকে টেনে নিয়ে বললেন, ”তোমার মতো ব্যাট আমি করতে পারিনি।”
”কী বলছেন দাদা! এই পিচে আপনার এগেনস্টে ছিল দুটো কারেন্ট বেঙ্গল টিমের বোলার! জয়দেব তো এ—বছরই রিজার্ভে ছিল।”
কথা বলতে—বলতে তাঁরা শামিয়ানায় এলেন, রামবাবু দু’হাত বাড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন, জহরকে জড়িয়ে ধরে উদ্বিগ্নস্বরে বললেন, ‘মাথায় খুব বেশি লাগেনি তো?” জহর ‘ও কিছু নয়’ বলায় তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন, ”আমার মুখ রেখেছেন। কই হে হেমন্ত, এদিকে এসো, খুব তো তখন বললে ফর্ম কেমন আছে দেখি…. দেখলে তো, এবার লুফে নাও।”
হেমন্ত গুহ অপ্রতিভ হাসিতে মুখ ভরিয়ে ফেললেন। রামবাবু ফুলবাগানকে বছর—বছর মোটা টাকা দেন। ক্রিকেট টিমটা বলতে গেলে তাঁর টাকাতেই চলে, হেমন্ত বুঝে ফেলেছেন রামবাবু কী চান।
”লুফে নেব কী…নিয়ে ফেলেছি। জহর ট্রান্সফারের জন্য তৈরি থেকো।” হেমন্ত গুহর স্বরে হালকা রসিকতা নেই। তিনিও আজ জহরের ব্যাটিং দেখে মনে—মনে তারিফ করেছেন।
”তা হলে একটা কথা বলি। আমি আর ক’দিন খেলব! বহুদিন খেলবে এমন সম্ভাবনাময় ছেলেদের এখনই টিমে নিয়ে ফেলুন। আমার সঙ্গে খেলল যে ছেলেটা, তার কথা বলছি, অদ্ভুত ভাল টেম্পারামেন্ট আর ডিফেন্স দেখাল এই পিচে। ওর নাম সমর, আম্পায়ার অমর দত্তর ছেলে।”
”আমি তোমার বলার আগেই ভেবে রেখেছি জহর,” হেমন্ত চারধারে তাকিয়ে সমুকে খুঁজলেন, ”এই যে, শোনো, শোনো”, হাতছানি দিয়ে ডাকলেন সমুকে। ”খেলবে ফুলবাগানে?”
সমু বিহ্বল। ঢোক গিলে শুধু মাথাটা হেলাল।
”ট্রান্সফার শুরু হওয়ার আগে দেখা কোরো আমার সঙ্গে।”
”চলুন, চলুন, আর দেরি নয়, খাওয়ার দেরি হয়ে যাচ্ছে।” রামবাবু তাড়া দিলেন।
খাওয়ার ব্যবস্থা রামবাবুর বাড়ির উঠোনে, চেয়ার টেবিল পেতে। হেঁটে মিনিট চারেকের পথ। জহরের পাশের চেয়ারে বসল সমু। ভেটকি মাছের ফ্রাইয়ে কামড় দিয়ে সে বলল, ”জহরদা আপনি আমার কথা হেমন্ত গুহকে বলেছেন?”
”কে বলল?”
”শুভ্র বলল।”
”মোটেই না। যার হাতে স্ট্রোক নেই তাকে আমি সুপারিশ করতে যাব কেন?’
”স্ট্রোক আছে কি নেই, সময় এলেই দেখিয়ে দেব। … শুধু ফ্রাই দিয়েই পেট ভরাবেন না, এর পর গলদা চিংড়িও আছে।”
.
সকাল থেকে টিপটিপ বৃষ্টি। জহর সকাল আটটায় দোকান খুলেছেন। ঘণ্টাদুয়েক কেটে গেছে, বিক্রিবাটা বিশেষ হয়নি। একশো গ্রাম স্ক্রু, চারটে কবজা, একটা তালা, একটা প্লাস্টিক বালতি। আর কেরোসিন স্টোভের দাম জেনে একজন বলে গেছে সন্ধেবেলায় কিনে নিয়ে যাবে। এসব খদ্দের নাদুই সামলায়। ধরেই নিয়েছেন আজ খদ্দের পাবেন না। এরই মধ্যে জহর মাছের বাজার ঘুরে এসেছেন। প্রতিদিনের অভ্যাস, যদি ভাল সাইজের বাগদা চিংড়ির দেখা পাওয়া যায়! মাস ছয়েক আগে দেখতে পেয়েছিলেন, তিনশো টাকা কিলো! আধ কিলো কিনেছিলেন।
আজও ঘুরে এসে খবরের কাগজ হাতে নিয়ে কাউন্টারে বসেছেন। এমন সময় ভিজে ছাতা হাতে হাজির হল প্রতাপ দাস।
”জহরদা এলুম, সেই ব্যাপারটা?” ভুরু তুলে জহর তাকালেন এবং সঙ্গে—সঙ্গে মনে পড়ে গেল, ”কোচিং স্কুল?”
”হ্যাঁ।”
”নাদু টুলটা বার করে দে।”
নাদু নিজের টুলটা কাউন্টারের ওপর দিয়ে তুলে আনল। প্রতাপ বসে বলল, ”এই বৃষ্টির জন্যই কংক্রিট পিচ করছি। বাংলার ক্রিকেটকে হাতকড়া পরিয়ে রেখেছে এই বৃষ্টি। পুজো পর্যন্ত বর্ষার সিজন, তারপর পিচ তৈরি করে মাঠে নামতে—না—নামতেই রনজি ট্রফির খেলা শুরু হয়ে যায়। খেলবে কী বাংলার ছেলেরা! প্র্যাকটিস কোথায়?”
জহর চুপ করে কথাগুলো শুনলেন। বস্তাপচা কথা। সবাই জানে। তাঁর মনে হল, প্রতাপ আর পানু একই পালকের পাখি। তফাত হল, পানুর অনেক টাকা, সে বড় ব্যবসায়ী। সে শুধু নাম চায় আর কেউকেটা হতে চায়। প্রতাপ ছোট ব্যবসায়ী, যেখান থেকে পারবে টাকা কামাবে। নামটামের লোভ নেই, পানুর মতো ধুরন্ধর নয়, বাংলার ক্রিকেটের উপকার করছি, পাঁচজনকে এটাই প্রতাপ দেখাতে চায়। তা দেখাক, ক্ষতি তো করছে না।
”ঠিক বলেছ। বৃষ্টির জন্যই দ্যাখো না জষ্টিমাস পর্যন্ত খেলা গড়িয়ে আসে। প্রচণ্ড গরমে খেলে কি কিছু লাভ হয়? তখন পারফরম্যান্স দেখিয়ে কোনও কাজের কাজ তো হয় না, সবাই দায়সারা খেলা খেলে।” জহর বললেন, অবশ্যই আন্তরিকভাবে। পি সেন ট্রফি ফাইনালে ব্রাদার্সের হারটা তাঁর মনে পড়ল। আর সেইসঙ্গেই মনে পড়ল শুভ্রকে। কাজের কাজ একটা হয়েছে বইকি, ছেলেটা চোখে পড়ে গেল! কিন্তু এই ফর্ম কি সামনের সিজন পর্যন্ত থাকবে?
”আমার সব রেডি হয়ে গেছে। লক্ষ্মীপুজো পর্যন্ত মাঠ তো পাওয়া যাবে না। প্যান্ডেল খোলা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তারপরই কর্পোরেশন মাঠে রোলার চালাবে। ওখানকার যে ইনস্টিটিউট আছে তাদের ঘরেই নেটফেট, ব্যাটপ্যাড থাকবে। ওদের একটা মালি আছে সে—ই সব করবে। এখন দরকার কোচ।” প্রতাপ তাকাল জহরের মুখের দিকে।
”ঠিক করেছ?”
”চিফ কোচ হতেও রাজি হয়েছে অনীশ সেন। ওকে রাখছি, তিনটে টেস্ট খেলেছে, একবার ওয়েস্ট ইন্ডিজ ট্যুরও করেছে। তা ছাড়া কাগজে লেখেটেখে। এখন তো বেঙ্গলের সিলেক্টরও।” প্রতাপ ধূর্ত চোখে তাকিয়ে মিটমিট হাসল। ”রাজি হচ্ছিল না। বেহালায় ওর নিজেরও তো একটা কোচিং সেন্টার আছে। বললুম হপ্তায় দুটো দিন আসবেন শুধু, কিছুক্ষণ থাকবেন, একটু—আধটু ছেলেদের দেখিয়ে—টেখিয়ে দেবেন। জানতে চাইল আর কে কোচ থাকবে। বললুম—” প্রতাপ চুপ করে গেল।
