জহর এগিয়ে গেলেন সমুর দিকে, ”যেভাবে খেলছ সেইভাবে খেলো। মারতে যেয়ো না … সৌগতকে আমি দেখছি।”
সৌগতকে জহর একটু ভালভাবেই দেখলেন। প্রথম তিনটি বল লং অফ এবং একস্ট্রা কভার বাউন্ডারিতে স্বচ্ছন্দে পাঠালেন, পরেরটি গ্লান্স করে দু’রান, পরের দুটিকে স্কোয়ার ড্রাইভ করে বাউন্ডারিতে। আড়চোখে সৌগতকে একবার তিনি দেখলেন। মুখ থেকে হাসি মুখে গেছে। তার মতো বোলারের সঙ্গে এহেন আচরণ সৌগত যেন বরদাস্ত করতে পারছে না। অনুপের ওভারটা সমু কাটিয়ে দিল শুধু বলগুলো ব্যাট দিয়ে থামিয়ে। জহর তারিফ জানিয়ে মাথা হেলালেন।
সৌগতর প্রথম বলেই জহর লাফিয়ে এক—পা বেরোলেন। বোলারের মাথার ওপর দিয়ে বলটা পেলেন লং অফ বাউন্ডারি টপকে। সৌগত ঠোঁট কামড়াল। পরের বলটা ঠুকে দিল। জহর বিদ্যুৎগতিতে হুক করলেন মুখের সামনে থেকে বলটাকে। তৃতীয় বলটা গুডলেংথে থেকে আচমকা লাফিয়ে উঠে জহরের ডান চোখের ওপর কপালে ছুঁয়ে ছিটকে গেল শর্ট লেগের দিকে। মুহূর্তের জন্য তিনি চোখে অন্ধকার দেখলেন। কপাল কেটে গেছে। ফোঁটা—ফোঁটা রক্ত ঝরল। ছুটে এল ফিল্ডাররা।
”বলেছিলুম দাদা, ব্যাট আপনি করবেন না। পিচ খারাপ।”
কথাটা শোনামাত্র জহরের মাথায় রক্ত উঠে এল। জয়প্রকাশের দিকে কঠিন চোখে তাকিয়ে বললেন, ”এই খারাপ পিচেই তো তুমি সেঞ্চুরি করলে।” তাঁর মাথার মধ্যে আগুন জ্বলছে।
মাঠে ছুটে এসেছে ডাক্তার, ফার্স্টএড বক্স নিয়ে। জহরের কপালে তুলো দিয়ে প্লাসটার আটকে দিলেন। মিনিট ছয়—সাত সময় এজন্য খরচ হল। সৌগত আবার শুরু করল বল। চতুর্থ বলটা ঠিক একই জায়গা থেকে আবার লাফিয়ে উঠল। জহর মুখটা দ্রুত পেছনে সরিয়ে নিলেন। বল লাগল বাঁ কাঁধে। সৌগতর ঠোট বেঁকে উঠল। পরের বলে জহর দু’কদম বেরিয়ে এসে বলটাকে হাফভলি করে নিয়ে সোজা ড্রাইভ করলেন। ফলো থ্রুতে ডানহাত নামিয়ে সৌগত বলটা থামাতে গেল। আঙুল লেগে বল গেল মিড অন—এ। হাতটা ঝাঁকিয়ে সে আঙুলগুলো চোখের সামনে ধরল। মুখে যন্ত্রণা ফুটে উঠেছে। হাতটা সে ঝাঁকাচ্ছে। সবাই ছুটে গেল তার দিকে। জহর নিরাসক্তভাবে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলেন। সৌগত মাঠ থেকে বেরিয়ে গেল বাঁ হাত দিয়ে আঙুলগুলো চেপে ধরে।
জহরের মাথায় খুন চেপে গেছে। পঞ্চাশে পৌঁছলেন এগারো ওভারে। সমু তখন সাত রানে, ওর ধৈর্য আর মনোনিবেশ জহরকে যতটা খুশি করল, ততটাই স্বস্তি দিল। জমি ঘষড়ে আসা দুটো শুটার সমু আটকেছে ব্যাট নামিয়ে। একটা বল কাঁধে লেগেছে। কিন্তু অচঞ্চল রয়ে গেছে। কিন্তু জহর এখন যুবকের মতো চঞ্চল। কপাল টিপটিপ করছে আর সেটাই তাঁকে খুঁচিয়ে বাড়তি একটা সজাগতা দিচ্ছে। পিচের খামখেয়ালিপনা নিয়ে আর তিনি মাথা ঘামাচ্ছেন না। সারাজীবনে বহুরকম পিচে খেলেছেন, সেই অভিজ্ঞতা এখন কাজে লাগালেন। ব্যক্তিগত কত রান হল সেদিকে তাঁর খেয়াল নেই। একটা কথাই তাঁর মাথায় ঘুরছে, ”বলেছিলুম দাদা, ব্যাট আপনি করবেন না।” দেখাচ্ছি এবার ব্যাট করা কাকে বলে! হেমন্ত গুহ এবার দেখুক তার স্টার ব্যাটসম্যানই শুধু ব্যাট করতে জানে না। ভিনু মানকাদ, দুরানি আর রামচাঁদকে ঠেঙিয়ে বুড়ো সি কে পঁচাশি করে রান আউট হয়েছিলেন। আমি সি কে নই, এরাও কেউ মানকাদ, দুরানি নয়, কিন্তু আমি জহর পাল, আর এটা হাবলার মাঠে তিরিশ ওভারের ম্যাচ তো বটে!
সৌগত আর মাঠে নামেনি। অনুপের বোলিং কোটা শেষ হয়ে গেছে। জয়দেব বাঁ—হাতি স্পিনার। বড় স্পিন, ফ্লাইট করায়। জহর প্রায় তিন গজ বেরিয়ে এসে ওকে ড্রাইভ করলেন। বাউন্ডারির ধারে ফিল্ডার দাঁড়িয়ে। একটা বল কোনওক্রমে থামাল, বাকি দুটো তার মাথার ওপর দিয়ে গেল। জয়দেবের ফ্লাইট করানো বন্ধ হল। নিচু করে জোরে বল দিয়ে যেতে শুরু করল। অন্যদিকে সৌগতর জায়গায় অধিনায়ক জয়প্রকাশ নিজে লেগব্রেক বল করতে এল। এই প্রথম জহরের ব্যাট থেকে ক্যাচ উঠল। বলটা পিচ থেকে একটু বেশিরকম ঘুরে লাফিয়ে ওঠে কোমর সমান। ঝুঁকে ব্যাট পেতেছিলেন। দ্বিতীয় স্লিপ থাকলে সহজ ক্যাচ পেত। সীমায়িত ওভারের খেলায় এইরকম ক্যাচ অনেক ওঠে। বাউন্ডারিও হয়, হাততালিও পড়ে। কিন্তু জহর লজ্জা পেলেন। কেন ক্যাচ উঠবে? বলটা লাফিয়েছিল পিচে খোঁদল থাকায়। ব্যাট সরাতে পারলাম না কেন? জহর কোনও অজুহাত পছন্দ করে না। যে—ধরনেরই ম্যাচ হোক না, টেকনিক নির্ভুল থাকতে হবে।
একটা গলদ ঘটে গেছে। কেউ সেটা লক্ষ করে থাকলে নিশ্চয় ভাবছে বুড়োটা ব্যাট করতে শেখেনি, স্লিপ নেই বলে বেঁচে গেল। আবার মাথা গরম হয়ে উঠল জহরের। আবার তিনি স্টেপ আউট করতে লাগলেন জয়প্রকাশের বলে। শামিয়ানার দিক থেকে হঠাৎ হাততালির শব্দ শোনা গেল। জহর বিস্মিত চোখে তাকালেন উইকেটকিপারের দিকে। ”কী ব্যাপার?”
”আপনার তো সেঞ্চুরি হল।”
”অ।” ব্যাটটা সামান্য তুললেন। ”এখান থেকে বোর্ডটা পড়া যাচ্ছে না, টোটাল কত? দুশো এগারো হতে কত বাকি?”
”হয়ে এল। তাড়াতাড়ি শেষ করে দিন না, খিদেয় চুঁইচুঁই করছে পেট।”
”দাঁড়াও, আগে আউট হই।”
”আর হয়েছেন!” উইকেটকিপারের স্বরে হতাশা।
জহরকে অবাক করেছে সমু। এতক্ষণ খেলে তেরো রান! ব্যাট দিয়ে যত না খেলেছে তার থেকেও বেশি বল ছেড়েছে। শরীরেও লাগিয়েছে অনেক। উইকেট কামড়ে পড়ে থাকা বলতে যা বোঝায় সমু তাই করেছে। শূন্য রানে তিন উইকেট, তখন ক্রিজে এসেছে। তাঁর সেঞ্চুরি হয়ে গেল, আর ছেলেটার মাত্র তেরো! হাতে কোনও স্ট্রোক আছে কিনা বোঝা গেল না। তবে গাওস্করের মতো যে টেম্পারামেন্ট দেখাল এই বয়সী ছেলের কাছ থেকে তা আশা করা যায় না!
