”কিন্তু যদি ছয় মারে?”
”তা হলে,” জহর ঠোঁট কামড়ে বললেন, ”তুমি ওর মাথা লক্ষ্য করে বল কোরো।”
স্থানীয় কপিলদেব অক্ষরে—অক্ষরে জহরের পরামর্শ মতো বল করল প্রবলবেগে ছুটে এসে। সে লেগের দিকে একটাও বল করেনি। তার ছ’টা ফুলটস বলে জয়প্রকাশ একটাও ছয় মারতে পারেনি, সবক’টাই চার।
চব্বিশ রান দিয়ে ওভার—শেষে সে দর্শকদের দিকে হাত তুলে নাড়ল। দর্শকরা হাততালি দিল। তাদের ছেলের বলে একটা ছয়ও হয়নি। জহর বললেন, ”ওয়েল বোলড।”
”আমাকে কি আবার বল দেবেন?” কপিলদেব আতঙ্কিত গলায় বলল।
”হাবলার লোককে ছ’ বলে ছ’টা ছয় দেখার সুযোগ দেব না?”
”তার মানে আমাকে আবার বল করতে হবে?”
”তুমি একটা কাজ করো, খোঁড়াতে থাকো। কভারে দাঁড়াও, তোমার সাত—আট হাত দূর দিয়ে বল গেলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে আর উঠো না। ধরাধরি করে তারপর মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দেব, কেমন?”
”আমি সার ভেরি গ্রেটফুল থাকব।”
জহর এই ধরনের এগজিবিশন ম্যাচ আগেও বহু খেলেছেন। খেলে মজা পান। আর বোলার রয়েছে সমু আর তিনি নিজে। সমুকে ডেকে বললে, ”এবার তুমি বল করবে।”
উইকেটে এখন বল যথেচ্ছ ব্যবহার করছে। কোনওটা লাফাচ্ছে, কোনওটা গড়াচ্ছে। উইকেটের বাইরের বলেও বিপদ, স্ট্রোক নিতে গিয়ে ব্যাটের ঠিক জায়গায় লাগছে না। তা সত্ত্বেও জয়প্রকাশ সত্তর বলে একশো রান করল। ফুলবাগানের হল তিরিশ ওভারে সাত উইকেটে দুশো দশ রান। এর মধ্যে শুভ্রর রান তিন। মুখের সামনে লাফিয়ে ওঠা বলে ব্যাট তুলে ক্যাচ দেয় শর্ট লেগে। ঠিক একশো রান করে শুভঙ্করের বলে মিডঅফের হাতে ক্যাচ দিয়ে জয়প্রকাশ ফিরে যায়। জহর মনে—মনে তারিফ জানালেন ওকে, পাক্কা পেশাদারই নয় তো এমন বিশ্রী উইকেটে টেকনিক্যালি নিখুঁত ব্যাটও করে গেল।
ইনিংস শুরু করার আগে জহর রোলার চাইলেন। পাওয়া গেল না। চার কিলোমিটার দূরে রাস্তা সমান করার কাজে সেটিকে আজ সকালেই নিয়ে চলে গেছে ঠিকাদারের লোক। জহরের মুখে দুশ্চিন্তা ফুটল। রোল না করিয়ে এই পিচে তো খেলা মুশকিল! একজন বলল, ”দুরমুশ করে দিলে কেমন হয়?” জহর শুনে আঁতকে উঠলেন। তার থেকে পিচ যেমন আছে তেমনই থাক। শুধু জিজ্ঞেস করলেন, ”ফার্স্টএডের ব্যবস্থা আর ডাক্তার আছে তো?”
জয়প্রকাশ মৃদুস্বরে জহরকে বলল, ‘দাদা আপনি ব্যাট না করলেই ভাল হয়। পিচ খুব খারাপ। চোট পেয়ে যেতে পারেন।”
”তুমি তো চোট পেলে না!”
”আমার কথা ছাড়ুন, আপনার বয়স আর আমার বয়স! দু’জনের রিফ্লেক্স কি সমান হবে?”
”দেখা যাক।”
হেমন্ত গুহ আশ্বাস দিলেন জহরকে, ”সৌগতকে বলেছি স্পিড কমিয়ে বল করতে, এটা ফ্রেন্ডলি ম্যাচ।”
”না, না, ও যেভাবে বল করে সেভাবেই করুক।” জহরের ভাল লাগল না এইসব কথা। তার বয়সকে সবাই যেন কৃপার দৃষ্টিতে দেখছে। ”হেমন্তদা, ব্যাট হাতে যখন নামছি তখন আমাকে ব্যাটসম্যান হিসেবেই ভাবা হোক। কেমন ফর্মে আছি সেটা তো আপনাকে দেখাতে হবে।”
”তা বটে, তোমাকে তো আবার ফুলবাগানে সই করাব বলেছি।” হেমন্ত গুহ হেসে জহরের পিঠে চাপড় মারলেন।
ফুলবাগান—ইনিংস শুরু করতে নামল জহর আর গৌতম। প্রথম স্ট্রাইক নিল গৌতম, বল করবে সৌগত।
”হাঁকপাক কোরো না। প্রথম ওভারটায় উইকেট দেখে নাও, মারতে যেয়ো না।” জহর গৌতমকে ডেকে বলে দিলেন। ওর মুখ দেখেই তিনি বুঝে গেছেন নার্ভাস হয়ে রয়েছে। সৌগতর প্রথম বল আউটসুইং করা ইয়র্কার। গৌতম এমন বল বোধ হয় কখনও খেলেনি। ব্যাটটা একটু বেশিই তুলেছিল। শেষমুহূর্তে তাড়াতাড়ি নামিয়ে সামনে ঝুঁকে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। লেগস্টাম্প ছিটকে গেল। জহর আড়চোখে সৌগতকে দেখে নিলেন। ওর ঠোটে বাঁকা হাসি।
খেলতে এল মিহির। অফস্টাম্পের ওপর ভাল লেংথে সৌগত ছাড়ল ছোট আউটসুইঙ্গার। মিহির প্রথমে পিছিয়ে খেলবে ঠিক করে তারপর ব্যাটটা তার সামনে বাড়িয়ে ধরল। ব্যাটের কানায় লেগে প্রথম স্লিপে জয়প্রকাশের হাতে বল গেল। দু’ বলে দুটি উইকেট নিল সৌগত। এখন তার সামনে হ্যাটট্রিকের সুযোগ। নবাগত ব্যাটসম্যান শুভঙ্কর সেটা জানে বলেই মুখ শুকনো, চোখে ভয়। ক্রিজের দিকে যাওয়ার সময় হোঁচট খেল। মাঠের বাইরে দর্শকদের মধ্যে উন্মুখ একটা প্রত্যাশা হ্যাটট্রিক হওয়া দেখার জন্য। সৌগত বল হাতে অপেক্ষা করছে। নিস্তব্ধ মাঠ। এই সময় হঠাৎ এক দর্শক চিৎকার করল, ”হ্যাটট্রিক চাই।”
সৌগত বল হাতে ছুটল। সাধারণ একটা মন্থর সোজা বল। শুভঙ্কর বোধ হয় আগেই ঠিক করে রেখেছিল ব্যাট চালাবে। বলটা যে এত আস্তে আসবে সেটা বোঝেনি। ব্যাট চালাবার পর বলটা এসে তার মাঝের স্টাম্পে লাগল। হ্যাটট্রিক! প্রথম ওভারের প্রথম তিন বলে তিনজন আউট। সেঞ্চুরির পর হ্যাটট্রিক দেখে হাবলার দর্শকরা খুশিতে আত্মহারা।
ব্যাট করতে এল সমু। সৌগত ওভারের বাকি তিনটি বল হেলাভরে ফেলল অফস্টাম্পের বাইরে। সমু ছেড়ে দিল ব্যাট তুলে নিয়ে। জহরের পাশ দিয়ে ফুলবাগানের উইকেটকিপার যাওয়ার সময় বলে গেল, ”একটু দেখে খেলবেন, ফাস্ট বল করে।”
কথাটা মিথ্যা নয়। অনুপ ভৌমিক জোরেই বল করে। তবে ফাস্টবোলার বললে যা বোঝায়, ওয়েস হল, টাইসন বা ডেনিস লিলি, তেমন জোরে নয়। বল দিকভ্রষ্ট হয় বেশিরভাগই। যেমন প্রথম বলটিই জহর পেলেন ফুলটস, বুকের কাছে। পুল করলেন। স্কোয়ার লেগ বাউন্ডারিতে বল গেল। পরের বলটাও একই রকম এবং একই স্ট্রোকে চার পেলেন। শুরুতেই দুটো বাউন্ডারি মেরে জহরের প্রত্যয় বেড়ে গেল। পরের বলে ফরওয়ার্ড ডিফেন্সিভ খেলে মিড অন থেকে এক রান নিলেন। সমু তিনটে বলের দুটো ছেড়ে দিয়ে একটি পিছিয়ে গিয়ে আটকাল।
