”বল করেন, না ব্যাট করেন?”
‘দুটোই।”
”অ, অলরাউন্ডার, কপিলদেবের মতো।”
জহর কোনওক্রমে হাসি চাপলেন।
জয়প্রকাশই প্রধান আকর্ষণ। নানান বয়সী ছেলেরা তাকে ঘিরে অটোগ্রাফ নিচ্ছে। হাসিমুখে সে কাউকেই নিরাশ করছে না। জহর লক্ষ করেছেন, একগ্লাস ডাবের জল ছাড়া জয়প্রকাশ আর কিছু মুখে দেয়নি।
”জহর, তোমায় যে এখানে দেখব ভাবিনি।” হেমন্ত গুহ এগিয়ে এলেন হাসিমুখে।
”রামবাবু চাইলেন বুড়োটাকে মাঠে নামাতে, তাই এলুম। ছেলে—ছোকরাদের সঙ্গে খেলতে আমার ভাল লাগে।”
”ব্রাদার্স ছেড়ে এবার তা হলে কোথায় যাবে?”
”ভাবছি তো আপনার ফুলবাগানে সই করব।” জহর মজা করে বললেন।
হেমন্ত গুহ পালটা মজা করেই বললেন, ”তোমায় পেলে তো লুফে নেব। আজ দেখি তুমি কেমন ফর্মে আছ।”
শুনে জহর শুধু হাসলেন। একটু পরেই তিনি টস করতে মাঠের মাঝে পিচের কাছে গেলেন, সঙ্গে ফুলবাগানের অধিনায়ক সৌগত বিশ্বাস। এবার বাংলার রনজি ট্রফি দলে তিনটে ম্যাচ খেলেছে। মিডিয়াম পেসার, আউট—সুইংটা ভালই করায়। হাতে মোক্ষম ইয়র্কারও আছে।
পিচ দেখে জহরের ভ্রূ কুঁচকে গেল। ঘাস নেই। বোধ হয় কাল বিকেলে প্রচুর জল ঢেলে রোলার টানা হয়েছে। পিচ এখনও ভিজে। সৌগত ঝুঁকে বুড়ো আঙুল দিয়ে মাটি টিপে বলল, ”জহরদা আঙুল বসে যাচ্ছে।”
”আট ওভার খেলার পর বলও ডন—বৈঠক দেবে। পরে ব্যাট করলে মুশকিলে পড়তে হবে।” জহর চিন্তিত স্বরে জানালেন।
টসে জহর হেরে গেলেন। সৌগত একগাল হেসে বলল, ”আমি আগে ব্যাট নিচ্ছি দাদা।”
দল নিয়ে মাঠে নামার আগে জহর কানে—কানে সমুকে জিজ্ঞেস করলেন, ”কারা—কারা বল করবে?”
”নিয়ম করা হয়েছে কোনও বোলারই পাঁচ ওভারের বেশি বল করতে পারবে না। তিরিশ ওভারে ক’জনকে কত ওভার বল করাবেন সেটা আপনিই ঠিক করবেন। আমাদের টিমে ওপেন করে ওই যে লম্বা ছেলেটা, কালু ওর নাম। আর ওই ছেলেটা সোমেন। তারপর শুভঙ্কর। তিনজনই মিডিয়াম পেসার। আমি আর সত্যজিৎ অফস্পিন করাই। এখানকার একটা ছেলে, শুনেছি জোরে বল করে, তাকে দিয়েও বল করাতে হবে।”
ফুলবাগানের ব্যাটিং ওপেন করতে নামল যে দু’জন তারা সাধারণত রিজার্ভে থাকে। জহর বল দিলেন কালুকে। ষোলো কদম ছুটে এসে কালু বেশ জোরেই বল ফেলল অফস্টাম্পের একহাত বাইরে, ওভারপিচ বল, উইকেটকিপার ফসকাল। প্রথম বলেই চার বাইরান। দ্বিতীয় বল ফুলটস। পুল করে চার রান নিল। তৃতীয় বল স্টাম্পে ভাল লেংথে, রান হল না। প্রথম ওভারে আট রানই রইল। জহর খুশি হলেন। পরের ওভারে সোমেন রান দিল তিনটি। কালুর তৃতীয় ওভারে পড়ল প্রথম উইকেট। ওভারপিচ বল কভারে ঠেলে দিতে গিয়ে ক্যাচ উঠে যায়। বলটা লাফিয়ে ব্যাটের ওপরদিকে লাগায়। কালুই ক্যাচটা ধরে। প্রথম স্লিপে দাঁড়ানো জহর মাথা নাড়লেন। মনে—মনে বললেন, ‘আট ওভার নয়, পাঁচ ওভার থেকেই দেখছি শুরু হল।’
মাঠ ঘিরে গুঞ্জন আর হাততালি। জয়প্রকাশ খেলতে নামছে। দীর্ঘদেহী, ঘোরকৃষ্ণবর্ণ, মাথায় কালো ক্যাপ। হেলমেট পরেই কলকাতায় ওকে পেসারদের খেলতে দেখা যায়। এখানে তেমন কোনও বোলার নেই বলেই সে বোধ হয় হেলমেট আনেনি। জহরের মনে হল, বোলার নেই ঠিকই, তবে ওর বোঝা উচিত ছিল হাবলার পিচ ইডেনের পিচ নয়।
জয়প্রকাশকে কালুর প্রথম বলটা ছিল মিডল স্টাম্পে একটু শর্ট পিচ। জয়প্রকাশ ডান পা অফস্টাম্পের দিকে নিয়ে গেছে পুল করবে বলে, আচমকা বলটা লাফিয়ে উঠল। চকিতে মাথা নামিয়ে নিল জয়প্রকাশ। উইকেটকিপার তার মাথার ওপর বলটা ধরল। বিস্মিত জয়প্রকাশ বোলারের দিকে একবার তাকিয়ে বলটা যেখানে পড়েছিল সেখানে গিয়ে পিচ দেখল। মাথা নাড়ল, ফিরে এসে পপিং ক্রিজের প্রায় দশ ইঞ্চি বাইরে স্টান্স নিল। ওভারের পঞ্চম বল করল কালু। ভাল লেংথে। জয়প্রকাশ বিদ্যুৎগতিতে এক—পা বেরিয়ে এসে ব্যাট চালাল। … সোজা ছয়। মাঠ ঘিরে দর্শকরা হাততালি দিয়ে উঠল। জয়প্রকাশের ব্যাটিংই তারা দেখতে এসেছে। ওভারে কালুর শেষ বলটিকেও সে একই ভাবে অভ্যর্থনা জানাল। দু’ বলে দুটো ছয়। দর্শকরা উদ্বেল হয়ে উঠল। যা দেখতে এসেছে সেটাই তারা পেয়েছে। জহর বুঝে গেলেন জয়প্রকাশ আজ বোলারদের খুন করবে। তিনি সমুর দিকে তাকালেন। কালুর বদলে অন্য কাকে দিয়ে বল করাবেন সেটাই জানতে চান।
”ওই যে ফর্সা মোটামতন, ওকে দেবেন। রামবাবু অনেক করে বলে দিয়েছেন। ওকে এখানকার লোক কপিলদেব বলে।” সমু জানিয়ে দিল।
সোমেনের প্রথম বলে একটা রান হল মিড উইকেট থেকে। এবার জয়প্রকাশের স্ট্রাইক। পাঁচটা বল থেকে চারটে বাউন্ডারি মেরে সে নিল একটা সিঙ্গল।
দর্শকদের চিৎকার শোনা গেল, ”উই ওয়ান্ট সিক্সার … উই ওয়ান্ট—”
জহর এই ব্যাপারে খুশি হলেন। রামবাবুর এত টাকা খরচ করা সার্থক হয়েছে। হাবলার জনগণের প্রত্যাশা জয়প্রকাশ পূরণ করে দিল। এবার তিনি হাবলার কপিলদেবকে আঙুল নেড়ে ডাকলেন।
হাবলার কপিলদেব প্রথমে না দেখার ভান করে থার্ডম্যান বাউন্ডারির দিকে হাঁটা দিয়েছিল। সমুই তাকে চেঁচিয়ে ডেকে আনল।
”জয়প্রকাশ এমন কিছু ব্যাটসম্যান নয়।” জহর হাবলার কপিলদেবের কাঁধে হাত রেখে তার মনে সাহস আর ভরসা জোগাবার জন্য বললেন। ”লেগের দিকে একদম বল ফেলবে না। অফস্টাম্পের ওপর বল রাখো, ঠিক স্লিপে ক্যাচ তুলে দেবে।” জহর তিন—চারবার চাপড় দিলেন ওর পিঠে।
