”ফুলবাগান যেতে রাজি হয়েছে?”
‘হয়েছে। হেমন্ত গুহ তো রামবাবুর সম্পর্কে শালা, রামবাবু ফুলবাগানকে মোটা টাকা ডোনেশনও দেন। … আর খেলা তো সিরিয়াসলি হয় না, পিকনিকের মতো ব্যাপারটা। খালি খাওয়া আর মাঠে নেমে ছয়, চার মারা। রামবাবুর মাছের আমদানির বিরাট ব্যবসা। ছ’—সাত রকমের মাছ—ই খাওয়ান আর হাবলার বিখ্যাত রাতাবি সন্দেশ। কলকাতা থেকে বাসে নিয়ে যান আর বাড়ি পৌঁছে দেন। গ্রামের লোককে বড় টিমের প্লেয়ার দেখানোর জন্যই ম্যাচ। হাবলার লোক জয়প্রকাশকে দেখতে চায়।”
”তা আমার কাছে কেন?”
”আপনি যদি সবুজ শিবিরের হয়ে খেলেন, রামবাবুকে আপনার কথা বলতেই তো উনি লাফিয়ে উঠলেন। বললেন খুব ভাল হয়। এখনকার ইয়ং প্লেয়ারদের সঙ্গে খেলছে পঞ্চাশের ওপর বয়সী একজন, এটাও একটা দেখার মতো ব্যাপার। উনি আপনাকে একটা চিঠিও দিয়েছেন।”
সমু পকেট থেকে ভাঁজকরা একটা চিঠি বার করে জহরকে দিল। জহর চিঠিটায় চোখ বোলালেন। অল্প কথায় অনুরোধ করেছেন খেলার জন্য। শেষে লেখা, ”যদি অনুগ্রহ করে অধমের গ্রামে আসেন তা হলে কৃতার্থ বোধ করব। আপনার দৃষ্টান্ত আমাদের মতো বুড়োদের প্রেরণা জোগাবে।”
চিঠি পড়ে জহর হাসলেন। মুখ তুলে দেওয়ালে টাঙানো তিন—চারটে ছবির একটির দিকে তাকালেন। গাওস্কর, কপিলদেবের সঙ্গে সি কে নাইডুর ছবি। তাঁর দৃষ্টি অনুসরণ করে সমুও ছবিটির দিকে তাকিয়ে আছে দেখে জহর বললেন, ”উনিই সি কে। এই ছবিটা ওঁর শেষ রনজি ট্রফি সিজনে তোলা। তখন উনি হোলকার ছেড়ে উত্তরপ্রদেশের ক্যাপ্টেন। রাজস্থানের সঙ্গে খেলায় এক ইনিংস ব্যাট করে চুরাশি রান করেন। কোনও বোলার ওঁকে আউট করতে পারেনি, রান আউট হন। আর বোলার কারা ছিলেন জানো? …. রামচাঁদ, ভিনু মানকাদ, দুরানি, সবাই টেস্ট খেলেছেন। ….. সি কে—র বয়সে তখন একষট্টি পেরিয়ে গেছে।” জহরের চোখ জ্বল জ্বল করে উঠল ছবিটার দিকে তাকিয়ে। ”ভাবতে পারো, একষট্টি বছর—! আমি আর কী খেললুম। একমাস পর বোম্বাইয়ের এগেনস্টে করেন বাইশ আর বাহান্ন, এটাই ওঁর শেষ ম্যাচ।”
”কত সালের কথা?’
”ফিফটিসেভেন। …. খেলব বললে নিশ্চয়ই খেলা যায়। মনের জোর আর ইচ্ছে, শরীর ঠিক রাখা …. ডিসিপ্লিনড লাইফ।”
‘আপনি কতদিন খেলতে চান?”
”একষট্টি বছর তো বটেই।” জহর হেসে উঠলেন, ”তুমি রামবাবুকে বোলো আমি যাব।”
”ঠিক সকাল আটটায় আমরা রওনা হব মিনিবাসে।” সমু উঠে দাঁড়াল।
.
ওরা হাবলায় পৌঁছল সাড়ে আটটায়। খেলা শুরু হবে সাড়ে ন’টায়। দু’দল তিরিশ ওভার করে ব্যাট করবে। তারপর লাঞ্চ এবং অর্থাৎ খেলা শেষ। রামবাবুর দেওয়া লাঞ্চ খেয়ে কেউ আর নড়াচড়ার মতো অবস্থায় থাকে না। হাবলা বর্ধিষ্ণু গ্রাম, প্রায় আধা—শহর। পাকাবাড়ি, টেলিফোন, পিচের রাস্তা, কেবল টিভি যেমন আছে তেমনই আছে বাঁশঝাড়, ফলের বাগান, পুকুর, সর্ষে খেত। বড় ফুটবল মাঠের সঙ্গে ক্লাবের ঘর। তার সামনে শামিয়ানা, চেয়ার, স্কোরারের জন্য টেবিল এবং স্কুল থেকে ব্ল্যাকবোর্ড এনে রাখা হয়েছে স্কোর লিখে জানাবার জন্য। আম্পায়ার দু’জন স্থানীয় লোক। অ্যামপ্লিফায়ারে হিন্দি গান বাজছে। দুটো মিনিবাসে দুটো দল আলাদাভাবে প্রায় একই সময়ে পৌঁছল এবং পৌঁছনোমাত্র ডাব কেটে হাতে—হাতে তুলে দেওয়া হল। প্রত্যেকেই দুটো—তিনটে ডাবের জল খেল। তারপর এল চাকলা করে কাটা গোটা চল্লিশ হিমসাগর আম, সেইসঙ্গে চারটে থালায় সন্দেশ, প্রায় আশিটি। সন্দেশের থালা মিনিট দশেকের মধ্যেই খালি হয়ে যায়, আমগুলোর অর্ধেক পড়ে থাকে। জহর দুটি ডাবের জল আর একটি সন্দেশ খেলেন। খাওয়ার ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত সংযত।
ফুলবাগান দলে সেইসব খেলোয়াড়ই বেশি যারা সারা সিজনে দু—তিনটির বেশি ম্যাচে খেলার সুযোগ পায় না। তবে রনজি ট্রফি খেলা দু’জন মিডিয়াম পেসার সৌগত রায় আর অনুপ ভৌমিক এসেছে। তাদের সঙ্গে শুভ্রও। জয়প্রকাশ এল হেমন্ত গুহর মোটরে, খেলা শুরুর দশ মিনিট আগে। সবুজ শিবিরের ছেলেদের কাউকেই জহর চেনেন না, শুধু সমুকে ছাড়া। বাসে আসার সময় সমু তাঁকে বলে, ”আপনি আজ আমাদের ক্যাপ্টেন, রামবাবু বলে দিয়েছেন।” জহর শুনে খুশি হন, তবু বিব্রত মুখে বলেন, ”আবার আমায় কেন, আমি তো কাউকে চিনি না। কে বোলার, কী বল করে, কে কেমন ফিল্ড করে, ব্যাট করে—”। সমু তাঁকে নিশ্চিন্ত করে বলে, ”আমি সব বলে দেব। আমাদের টিমে ওখানকার দুটো লোকাল ছেলে খেলানো হবে। তাদের অবশ্য আমি দেখিনি।”
মাঠ ঘিরে প্রায় শ’পাঁচেক দর্শক। রামবাবু এবং হাবলার গণ্যমান্যরা শামিয়ানার নীচে চেয়ারে বসে। জহরকে হাত ধরে তিনি তাদের সামনে এনে বললেন, ”দু’দলে যারা খেলছে তাদের প্রায় সবাই এঁর ছেলের বয়সী বা তার থেকেও বয়সে বড়। ইনি এখনও ফার্স্ট ডিভিশনে খেলে যাচ্ছেন। একসময় বেঙ্গল রিপ্রেজেন্ট করেছেন। এমন বুড়ো ঘোড়াকে ধরে এনেছি হাবলায়, দেখা যাক কেমন ছোটেন। বুঝলেন ছকুবাবু, উনি আমাদের অনেকের থেকে বয়সে কিন্তু বড়, দেখে কি বোঝা যায়?’
কয়েক জোড়া বিস্মিত চোখ জহরকে জরিপ করতে শুরু করল। ছকুবাবু জানতে চাইলেন, ”আপনি কোন ক্লাবে খেলেন, মোহনবাগানে, না ইস্টবেঙ্গলে?”
”কোনওটাতেই নয়। শেষ এবার খেলেছি ব্রাদার্স ইউনিয়নে।”
