”চলো, এবার যাওয়া যাক।” জহর নিচু গলায় সমুকে বললেন। ”কথা বাড়িয়ে লাভ নেই।”
ওরা এসপ্ল্যানেডে এসে বাসে উঠল। জহর দোকানে যাবেন। হাতিবাগানে বাস থেকে তাঁর সঙ্গে সমুও নামল, সে বাড়ি যাবে।
”আপনার কাছ থেকে অনেক কিছু জানলুম আজ, আরও জানতে জানতে ইচ্ছে করছে।” সমু বিদায় নেওয়ার আগে বলল।
”জানতে চাও তো আমার বাড়িতে চলে এসো যে—কোনওদিন সকালে। কাগজের পুরনো কাটিং আছে, দেখাব। ভাল কথা, তুমি কী রকম খেলো সেটা আমার জানা নেই। সিজন তো শেষ হয়ে গেল, তোমার সবুজ শিবিরের কোনও ম্যাচ আর আছে কি?”
”না, নেই। এখন তো সব মাঠে ফুটবল নেমে গেছে, সেই পুজোর পর আবার।”
”ঠিক আছে, আমাকে বোলো, দেখব কেমন খেলো।” জহর কথাটা বলে ডান হাতটা তুললেন বিদায় জানাতে। দেখলেন সমু ইতস্তত করছে। জিজ্ঞাসু চোখে তিনি তাকিয়ে রইলেন।
”আপনাকে যদি জহরদা বলি তা হলে কিছু কি মনে করবেন?”
জহর হেসে ফেললেন। সমু তাঁর ছেলে মানিকেরই বয়সী হবে। খেলার দুনিয়ায় বাবার বয়সীদেরও দাদা বলাই রেওয়াজ।
”মনে করব কেন! তবে ঠিকমতো উচ্চচারণটা কোরো। জহ—র—দা বললে ভাল লাগবে, জর্দা বোলো না, অনেকেই বলে। জহর কথাটাও অনেকে ভাল করে উচ্চচারণ করতে পারে না, বলে জর।”
”বাবাকে আপনার কথা বলব।”
জহরের ভেতরটা একবারের জন্য কুঁকড়ে গেল। অমর দত্ত তার ছেলেকে কী বলবে তাঁর সম্পর্কে! জহর পাল লোকটা খুব বাজে টাইপের, অভদ্র, আনস্পোর্টিং?
‘বোলো।”
জহর রাস্তা পার হয়েই দেখলেন ফুটপাথে পাইপের রেলিংয়ে দুই কনুই রেখে বেজা দাঁড়িয়ে। তার দৃষ্টি দূরে কোথায় যেন বিঁধে রয়েছে। জহর বেজার দৃষ্টি অনুসরণ করে আবিষ্কার করলেন প্রায় তিরিশ হাত দূরে তেলেভাজাওলাকে এবং ডালায় সদ্য ভেজে রাখা বেগুনিগুলোকে।
”ওদিকে তাকিয়ে কী দেখছিস বেজা?”
কানের কাছে ফিসফিস করে বলা কথাটা শুনে বেজা চমকে উঠে ঘুরে দাঁড়াল।
”ওহ তুই।” বেজা আশ্বস্ত হল। ”ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলি।”
”এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে?’
”অফিস থেকে আসছি। বাস থেকে নেমে ভাবলুম এখন বাড়ি গিয়ে কী আর করব, যা গরম! তাই একটু হাওয়া খেতে দাঁড়িয়ে পড়লুম।”
”হাওয়া খেতে, না পেঁয়াজি—বেগুনি খেতে?”
”পেঁয়াজি—বেগুনি!” বেজার আকাশ থেকে পড়ার মতো মুখ হল, ”তুই বলছিস কী? সেই সেদিনের পর থেকে আমি তেলেভাজা ছেড়ে দিয়েছি। এখন আমি রোজ এখানে দাঁড়িয়ে মনের জোর পরীক্ষা করি।”
”কীভাবে করিস?”
”আধঘণ্টা ধরে বেগুনিভাজা দেখি। কিনব কি কিনব না, খাব কি খাব না … খালি ফ্লাইটেড টোপ নিজের দিকে ছাড়ি। ক্রিজ ছেড়ে বেরোই কিনা সেটারই পরীক্ষা চালাই।”
”পরীক্ষার রেজাল্ট কী?”
”মেডেনের পর মেডেন। তেলেভাজাওলার দিকে এক—পাও এগোইনি।” বেজার চোখ—মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ”বেজা হালদার স্টাম্পড হয়নি। বুঝলি রে, মনের জোর কারও থেকে আমার কম নেই। এখন মনে হচ্ছে বয়সটা পঁচিশ বছর যেন কমে গেছে, মাঠে নামলে এখনও ব্যাটসম্যানকে ভ্যাবাচাকা করে দিতে পারি। লোভ সংবরণ মানে ডিসিপ্লিন। এবার এটাকে ধরে রাখতে হবে। ফুচকা, ঘুগনি, আলুকাবলি সব ছেড়েছি, এখন একটু পরিশ্রম করা দরকার। তুই কী বলিস, ডাবল সেঞ্চুরি না হোক জীবনে ভাল করে একটা ফিফটি করে যেতে না পারলে আর কী ক্রিকেটার হলুম?” বেজার স্বর মোটেই হালকা নয়। জহর খুশি হলেন। মানুষটাকে এতদিন চিনতে না পারার জন্য অবাকও হলেন।
”তোর মন ভাল লাগছে কিনা বল?”
”খুব ভাল লাগছে। আমি জানতুমই না আমার মনের জোর কতটা। আমার এখন খুব বল করতে ইচ্ছে করছে রে জহর।”
”দাঁড়া, তোর জন্য একটা কিছু করা দরকার। সামনের সিজন তো আর ক’মাস পরেই শুরু হবে। একটা ছোটখাটো ক্লাবের নেটে গিয়ে যাতে বল করতে পারিস সেই ব্যবস্থা করব।”
”শুধু নেটে!” বেজাকে হতাশ দেখাল। ”আমি ম্যাচে খেলব। তুই এখনও খেলছিস, আর আমি পারব না?”
”পারবি, পারবি।” জহর সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, ”আগে শরীরটাকে ঠিকঠাক করে তোল, রোজ সকালে দৌড়ো, ফ্রি হ্যান্ড কর, গায়ে একটু জের হোক।” বেজার পিঠে আলতো দুটো চাপড় মেরে জহর দোকানে যাওয়ার জন্য হাতিবাগান বাজারের দিকে এগোলেন।
.
দিন কয়েক পর একদিন সকালে জহরের বাড়িতে এসে হাজির হল সমু। জহর রোজ ভোরে গঙ্গার তীরে স্ট্র্যান্ড রোড ধরে দু’ মাইল মন্থর গতিতে দৌড়ন। এটা তাঁর গত তিরিশ বছরের অভ্যাস। দৌড় শেষে রথতলা ঘাটে গঙ্গাস্নান সেরে বাড়ি ফেরার পথে বাজার করেন।
সেদিন বাজারের থলি হাতে বাড়ি ঢোকার সময় দেখলেন পাশের বাড়ির রকে সমু বসে আছে তাঁর অপেক্ষায়। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ”এই সকালে কী ব্যাপার? এখন তো সবে সাতটা!”
”একটা ব্যাপারে এসেছি। আমাদের সবুজ শিবিরের প্রেসিডেন্ট রামবাবু, রামকৃষ্ণ ঘোষ প্রতি বছর তাঁর গ্রামে একটা এগজিবিশন ক্রিকেট ম্যাচ করান, এবারও—”
”দাঁড়াও, দাঁড়াও, বাড়ির ভেতরে এসো, বসে কথা বলো।”
সমুকে নিয়ে তিনি একতলায় বসার ঘরে এলেন, ঘরে তিনটি কাঠের চেয়ার, একটা টেবিল। একটা কাঠের আলমারি ছাড়া আর কোনও আসবাব নেই। দেওয়ালে দেশি—বিদেশি কয়েকজন ক্রিকেটারের ছবি।
”বোসো। এখন আমি রুটি—তরকারি খাই। দু’খানা খাবে?”
”না, না, আমি খেয়ে বেরিয়েছি …. কথাটা বলেই চলে যাব।” সমু ব্যস্তভাবে বলল, ”আমাদের প্রেসিডেন্ট রামবাবু খুব পয়সাওলা লোক। ওঁর গ্রামের নাম হাবলা, হাওড়া জেলায়, কলকাতা থেকে মাইল দশেক। ধুমধাম করে দুর্গাপুজো করেন, কলকাতা থেকে যাত্রাদল নিয়ে যান, কলকাতার ফুটবল টিম নিয়ে গিয়ে ম্যাচ খেলান। গ্রামের ক্লাবের সঙ্গে। এবার ফুলবাগানকে নিয়ে যাবেন সবুজ শিবিরের সঙ্গে খেলাতে।
