দু’জনে ছোলা চিবোতে—চিবোতে ধীরগতিতে হাঁটতে শুরু করলো। জহর অন্যমনস্ক। তিনি আজকের একদিনের ম্যাচের সঙ্গে পাঁচদিনের সেই রনজি ফাইনালকে একই সারিতে ফেলে ভাবতে পারলেন কী করে যে, ‘আজও একটা হারা ম্যাচ জিততে দেখলেন!’ দুটো ম্যাচের মধ্যে কি তুলনা হয়? বাদল দত্তর সেঞ্চুরি, নির্মল চ্যাটার্জির হাফ সেঞ্চুরি, তার জবাবে নিম্বলকরের ডাবল সেঞ্চুরি, মুস্তাকের নিরানব্বুই। নাইনথ উইকেট যখন পড়ল হোলকার তখনও সতেরো রান পেছনে। কী লড়াই যে তখন! সেই টেনথ উইকেট পার্টনারশিপটা….।
সমু তাঁকে কী যেন জিজ্ঞেস করছে। তিনি ওর দিকে তাকিয়ে অবাক স্বরে বললেন, ”জানো নিম্বলকর আর ধনওয়াড়ে চল্লিশ রান তুলেছিল টেনথ উইকেটে! ধনওয়াড়ে ছিল বোলার, একদমই ব্যাট করতে পারে না কিন্তু এগারো নম্বরে দুটো ইনিংসেই মাটি কামড়ে ব্যাট করে গেল। … একেই বলে জেতার ইচ্ছে, লড়াই করা…” জহর উত্তেজনায় হাতে ঝাঁকুনি দিতেই কিছু ছোলা পড়ে যাচ্ছিল, সমু বিদ্যুৎগতিতে হাত বাড়িয়ে দিতেই কয়েকটা ছোলা তার তালুতে পড়ল। একটা কঠিন ক্যাচ ধরার সাফল্য তার মুখে ভেসে উঠল।
”গুড।” জহর হাত বাড়িয়ে ছোলাক’টা নিলেন। ”স্লিপে ফিল্ড করো?”
”হ্যাঁ।’
”ক্যারেকটার!…. ধনওয়াড়ে তার ভেতরের জিনিস বার করে এনে ব্যাট করেছিল, সেটা হল ফাইটিং স্পিরিট। এটা না থাকলে প্লেয়ার হওয়া যায় না। দু’জন ঝানু টেস্ট বোলার মন্টু ব্যানার্জি আর পুঁটু চৌধুরী, ভাল অফ স্পিনার গিরিধারী শতচেষ্টা করেও সেকেন্ড ইনিংসে ওকে আউট করতে পারেনি। দেড়ঘণ্টা ধরে ডিফেন্ড করে দু’রানে নট আউট থেকে ম্যাচ বাঁচিয়েছে।…. বাংলাও লড়েছিল সরাসরি জেতার জন্য। ফার্স্ট ইনিংসে পিছিয়ে গিয়ে আবার ব্যাট করতে নামে। হোলকার বোলারদের বেধড়ক পিটিয়ে চারজন হাফ সেঞ্চুরি করে। ফিফথ ডে সকালে উইকেটে রোল করিয়ে ক্যাপ্টেন খোকন সেন বাংলাকে দু’ ওভার ব্যাট করিয়ে, শ’তিনেক রান হাতে নিয়ে ইনিংস ছেড়ে দেয়। সকালে বাংলা দু’ওভারের জন্য ব্যাট করল কেন বলো তো?” জহর দাঁড়িয়ে পড়লেন প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার এবং রেড রোড পার হওয়ার জন্য।
”জানি না।” সমু অকপটে স্বীকার করল।
”তা না হলে উইকেট রোল করার সুযোগটা বাংলা পেত না। আর এই রোলিংটা নেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল, চারদিন খেলে উইকেট তো ভেঙে গেছল, সেটাকে আরও ভেঙে দেওয়া। এর পর ব্যাট করার আগে হোলকার আবার রোল করাল, আরও ভাঙল। তারপর তো বাংলা ঝাঁপিয়ে পড়ল।”
রেড রোডে অবিশ্রান্ত গাড়ির স্রোত। ওরা রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করল না। জহরের ভাল লাগছে একজন মনোযোগী শ্রোতা পেয়ে। তাঁর ধারণা, অতীতের কথা তরুণদের জানা দরকার। এগুলো উৎসাহ আর প্রেরণা জোগায়। যেমন সি কে নাইডু তাঁকে এই বয়সেও শক্তি জুগিয়ে মাঠে টেনে আনেন।
”পাঁচঘণ্টায় দশটা উইকেট ফেলতে হবে তিনশো রানের মধ্যে। ভাবো ব্যাপারটা! উইকেট পড়তেও লাগল। হার হচ্ছে জেনে লাঞ্চের পর সি কে তো মাঠ থেকেই কালীঘাটে পুজো দিতে গেলেন। কিন্তু বাংলা আটকে গেল ন’টা উইকেট নেওয়ার পর। বাকিটা আপ্রাণ চেষ্টা করেও আর পাওয়া হল না। যদি পেত—” জহর কথা শেষ করলেন না। শুধু হাসলেন। ”কী দারুণ একটা ভিকট্রি দুটো বোলার, হীরালাল গায়কোয়াড় আর ধনওয়াড়ে আটকে দিল ব্যাট দিয়ে। আজ আর ওদের নাম কেউ করে না, জেতার জন্য বাংলার সেই লড়াই কেউ আর আজ মনে রাখেনি। …. সি কে নাইডুর সেটাই ছিল শেষবার রনজি ট্রফি জেতা, বয়স তখন সাতান্ন পেরিয়েছে।” জহর মুচকি হেসে চোখ পিটপট করলেন।
”চলুন এবার পার হই।”
ওরা রাস্তা পার হয়ে নীরবে কিছুক্ষণ হাঁটল। জহরের এতক্ষণে মনে পড়ল মনোজকে, ব্রাদার্স ইউনিয়নের টেন্টটা চোখে পড়ায়। বেচারা নিশ্চয় ভেঙে পড়েছে দুঃখে। দুঃখ তাঁরও হচ্ছে। পানুরা যে ব্যবহারই করুক, ক্লাব তো তাঁরও!
”চলো তো একবার ব্রাদার্সের টেন্টটা ঘুরে যাই। একজন বাজি ধরেছিল ব্রাদার্স না জিতলে পঞ্চাশ টাকা দেবে। একটু লেগপুল করে আসি।”
লোহার ফেন্স ঘেরা ব্রাদার্সের টেন্ট। সামনে খানিকটা জমি। কাঠের পাটার ফটক, তার মাথায় লতাগাছের খিলেন, ক্লাবের নামলেখা বোর্ড। ফোল্ডিং লোহার চেয়ারে কয়েকজন বসে। তার মধ্যে রয়েছে কানু ভটচায, সুবল মুখুজ্যে, পানু পোদ্দার, আরও কয়েকজন। একটা কাঠের টেবিলে খালি চায়ের কাপ। টেন্টের পেছনে লম্বা ফালি জমি। ওখানে নেট প্র্যাকটিস হয়।
জহর ভেতরে না ঢুকে ফেন্সের ধারে দাঁড়ালেন। সুবল মুখ ফিরিয়ে তাকিয়ে বলল, ”খেলা দেখলে?’
”দেখলুম।”
”কী মনে হল?”
”চাবকাতে ইচ্ছে হল। … সবক’টাকে, তোদেরও।”
প্রাণকৃষ্ণ ঝটকা দিয়ে উঠে দাঁড়াল। ”কী বললে?”
”যা মনে হয়েছে তাই বললুম।” জহরের মুখে হাসি। ”ক্লাবটা যদি ইস্টবেঙ্গল কি মোহনবাগান হত তা হলে এতক্ষণে এই টেন্টটা আর দাঁড়িয়ে থাকত না, আগুন জ্বলত। … আরও দু’চারটে প্লেয়ার ভাড়া করে আন। শুধু মান্টু সিং দিয়ে কী হবে?”
প্রাণকৃষ্ণ থরথর করে কাঁপছে। কানু ভটচায তাকে হাত ধরে টেনে বসাল।
”বোসো, বোসো, ব্লাডপ্রেশার বেড়ে যাবে। …জহর এখন যাও এখান থেকে। মজা দেখার সময় এটা নয়।” কানু ভটচায হাত নেড়ে চলে যেতে বলল।
জহরের চোখে পড়ল নুরু টেন্টের ভেতরে থেকে বেরিয়ে আসতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে আবার ভেতরে ঢুকে গেল। বাসুদেব টেন্টের ভেতর থেকে একবার উঁকি দিল। জানলায় কার যেন মুখ সরে গেল। মনোজকে তিনি কোথাও দেখতে পেলেন না।
