”নুরুর বলে দুটো ড্রাইভ উঠে গেছল। শর্ট কভারে লোক থাকলে পেয়ে যেত তোমায়।”
”আমি লোক নেই দেখেই চালিয়েছিলুম।”
”তোমার দরকার টার্নিং পিচে ভাল স্পিনারের বলে খেলা। মুশকিল হচ্ছে এখন তো তেমন স্পিনার নেই।” জহর চিন্তিত মুখে কথা শেষ করলেন। ”এমন বাজে বোলিং তো সব ম্যাচে পাবে না।”
এই সময় ফুলবাগানের ক্রিকেট সচিব হেমন্ত গুহ তাঁদের কাছে এসে দাঁড়ালেন। বেঁটেখাটো, ধুতি—পাঞ্জাবিপরা, হাসিখুশি মুখ, ষাটের কাছাকাছি বয়সী লোকটি দিলদরিয়া মেজাজের জন্য খেলোয়াড়দের প্রিয়। ব্যবসা করেন, দু’ হাতে খরচও করেন। জহর ওকে চেনেন।
”ভাবতেই পারছি না জহরকে ফুলবাগান টেন্টে আজ দেখব।” দু হাত বাড়িয়ে হেমন্ত বললেন, জহর দাঁড়িয়ে উঠে ওর হাত দুটি ধরলেন।
”যেভাবে ম্যাচটা আপনারা জিতলেন, বিশেষ করে এই ছেলেটি যেরকম ব্যাট করল, তাতে ভাবলাম, যাই, ছেলেটিকে অভিনন্দন জানিয়ে আসি।”
”আপনি কি ব্রাদার্স ইউনিয়ন ছেড়ে দিয়েছেন?… এ—বছরও তো খেলেছেন!” হেমন্তর চোখেমুখে বিস্ময়।
‘বলতে পারেন ছেড়ে দিয়েছি।” একটু থেমে হাসিমুখে ম্লান কণ্ঠে জহর বললেন, ”বুড়ো ঘোড়া আর কত টানব, ওরাই ছাড়িয়ে দিল। … ওয়ানডে ক্রিকেটের সঙ্গে তাল দিয়ে চলা আর আমার পক্ষে সম্ভব নয়। বয়স তো কম হল না! এবার সরে যাওয়াই তো উচিত।”
”কত বছর খেললেন?” হেমন্ত জানতে চাইলেন।
”খেলছি তো বাচ্চচা বয়স থেকে। ময়দানেই তো কাটল পঁয়ত্রিশ বছর।”
একটি লোক এসে হেমন্তর কানে মুখ লাগিয়ে ফিসফিস করে কী বলতেই হেমন্ত তাকে বললেন, ”আরে বাবা, হবে হবে, কথা দিয়েছি যখন ঠিকই খাওয়াব।” তারপর জহরের দিকে তাকিয়ে হেমন্ত একগাল হেসে বললেন, ”জিতলে ওয়ালডর্ফে ডিনার খাওয়াব বলেছি। যাই টেলিফোন করে টেবিল বুক করে আসি। … শুভ্র বাড়ি চলে যেয়ো না যেন।”
ব্যস্ত হয়ে হেমন্ত টেন্টের দিকে চলে গেলেন। জহর বললেন ”আমিও যাই। সমু, তুমি তো এখন থাকবে।”
”আমি আর এখানে থেকে কী করব, শুভ্র তো আজ ভি আই পি, কত লোক এখন ওর সঙ্গে কথা বলতে চাইবে।” সমু হাসতে হাসতে হুল ফোটাল।
‘এই একটা লোকাল ট্রফির একটা ম্যাচে ভাল খেলেই ভি আই পি? জয়প্রকাশ না খেললে কী হত অবস্থাটা?” জহর শুভ্রর পিঠে হাত রেখে গাঢ়স্বরে বললেন, ”অনেক শেখার আছে, অনেক পথ যেতে হবে। ধরে নাও এখনও তুমি কিছু জানো না। ক্রিকেটে একটা ভুল মানেই তুমি আর ক্রিজে নেই। ভাবো আর নিজেই একটা—একটা করে ভুল শুধরে নিয়ে নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা করো, এভাবেই গাওস্কর অতবড় হয়েছে।”
ওর পিঠে একটা চাপড় দিয়ে জহর গেটের দিকে এগোলেন। তাঁর কানে এল শুভ্র রেগে সমুকে বলছে, ”কেন আমাকে ভি আই পি বলে লজ্জায় ফেলে দিলি!”
জহর মনে—মনে হাসলেন বেজার কথা মনে পড়ায়। কানু ভটচায ওকে বলেছিল ‘আজ সন্ধ্যেবেলায়ই তা হলে ফিরপোয়, …. তোর যা প্রাণে চায়।’ —বেচারা বেজা! ফিরপো হোটেল এখন উঠে গেছে। নিজেকে নিজে নষ্ট করল, স্রেফ খাওয়ার লোভে পড়ে—পড়ে শরীরটা শেষ করে দিল। মন দিয়ে খেলায় যত্ন নিলে অনেকদূর উঠত। বিষেণ বেদির মতো বল করত। বেজার সঙ্গে দেখা হলে বলতে হবে ফুলবাগানের পুরো টিম পার্ক স্ট্রিটের হোটেলে ডিনার খেয়েছে। শুনে এত বছর পরেও কানু ভট্টাচার্যের বাপান্ত করবে আর কষ্ট পাবে, তা পাক। এটাই হবে ওর লোভের শাস্তি।
জহরের থেকে অল্প পেছনে আসছে সমু। গরম এখন সামান্য কমেছে, সূর্য একটু পরেই অস্তে যাবে। পথে লোকের ভিড় শুরু হয়েছে। অধিকাংশই চলেছে গঙ্গার দিকে। ছ’টা বাজলেও সন্ধ্যা নামেনি। ভেজা ছোলা বিক্রি হচ্ছে দেখে জহর দাঁড়িয়ে পড়লেন। ময়দানে এটা তাঁর প্রিয় খাদ্য। পেঁয়াজ কুচি, বিটনুন আর লেবুর রস দেওয়া ভেজানো ছোলা খেতে—খেতে এসপ্ল্যানেডে ট্রাম ধরতে যাওয়ার দরকার আর বোধ হয় হবে না কোন দিন।
সমুকে দেখে জহর বললেন, ”এসো, ছোলা খাওয়া যাক।”
”না, না, আমার খিদে নেই।” সমু এড়িয়ে যাওয়ার জন্য বলল।
”আরে, খিদে মেটাবার জন্য কি কেউ ছোলা খায়? এটা সময় কাটাবার জন্য জাবর কাটা। আমার হাতে এখন অঢেল সময়। … দু’পাতা দাও তো।” জহর ছোলাওলাকে বললেন।
”আপনি এত বছর ধরে খেললেন কী করে? আমি তো ভাবতেই পারি না! ফার্স্ট ডিভিশনে আপনার থেকে সিনিয়ার আর কেউ আছে?”
‘না, নেই।” জহর নিশ্চিত গলায় বললেন, ”কিন্তু এতে অবাক হওয়ার কী আছে? তুমি সি কে নাইডুর নাম শুনেছ? …. বোধহয় শোনোনি।”
”শুনেছি, বাবা একদিন বলেছিল ভারতের প্রথম টেস্ট ক্যাপ্টেন ছিলেন সি কে নাইডু।”
”আমার ছোটবেলার হিরো ছিল মুস্তাক আলি, তোমাদের যেমন গাওস্কর, কপিলদেব … মুস্তাকের গুরু ছিলেন সি কে। কালো রং, ছ’ফুটের ওপর লম্বা, তেমনই স্টাউট ফিগার, চলাফেরার ভঙ্গি ছিল রাজার মতো। দেখলেই মনে হত, হ্যাঁ একটা ক্রিকেটার বটে!”
”আপনি ওঁকে দেখেছেন?”
জহর কথাটার জবাব না দিয়ে বললেন, ‘নাও, পাতাটা ধরো।”
সি কে নাইডুকে তিনি চোখে দেখেননি। সি কে শেষবার যখন ইডেনে খেলেন তখন জহরের বয়স তেরো। বাংলার বিরুদ্ধে রনজি ট্রফির সেই ফাইনাল খেলা দেখা তাঁর হয়ে ওঠেনি। হাম তাঁকে বিছানায় শুইয়ে রেখেছিল। কিন্তু খবরের কাগজ থেকে তিনি খেলাটির বিবরণ পড়ে যে রোমাঞ্চ বোধ করেছিলেন সেই রোমাঞ্চ স্মৃতিতে আজও জ্বলজ্বলে তাজা হয়ে রয়েছে। সতেরো রানের ফার্স্ট ইনিংস লিডের জন্য হোলকার অবধারিত হারা ম্যাচটা জিতে যায়। আজও তিনি একটা হারা ম্যাচ জিততে দেখলেন।
