”আরে রাখুন আপনার জয়প্রকাশ।” … হাসতে—হাসতে আমরা ম্যাচ তুলে নিয়ে যাব। বাজি ফেলুন, কত টাকা দেবেন যদি ব্রাদার্স ইউনিয়ন ম্যাচ জেতে?”
জহর আড়চোখে মনোজের উত্তেজিত মুখ দেখে নিয়ে বললেন, ”বাজি আমি ধরি না।”
”বেশ আমিই পঞ্চাশ টাকা দেব যদি ফুলবাগান জেতে।… যাই একবার ড্রেসিং রুমটা ঘুরে আসি, মান্টু সিংয়ের যা অবস্থা দেখেছি। …. ফাইভ ফর ফর্টিসিক্স, আর আপনি কিনা বলছেন জয়প্রকাশ ম্যাচ ঘুরিয়ে দেবে?” মনোজ নীচে যাওয়ার জন্য সিঁড়ির দিকে এগোল। জহর মাঠের মাঝে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন।
এক ঘণ্টা পর ফুলবাগানের স্কোর হল পাঁচ উইকেটে একশো একান্ন। গড়ে সাত রান প্রতি ওভারে এবং পনেরো ওভারে জয়প্রকাশ আর নতুন একটি ছেলে (জহর এক ফুলবাগান সাপোর্টারকে পরে জিজ্ঞেস করে জানে ওর নাম শুভ্রজ্যোতি) যোগ করেছে একশো পাঁচ রান। তার মধ্যে জয়প্রকাশেরই বাহাত্তর।
জহর এই সময় মনে—মনে বলেন, ‘একেই বলে গাছাড়া খেলা। পাঁচটা উইকেট ফেলে দিয়েই ভাবল ম্যাচ পকেটে পুরে ফেলেছি। … চাবকানো উচিত গোটা টিমটাকে। … বলের লাইন আর লেংথের মাথামুণ্ডু নেই, ফিল্ডাররা দৌড়চ্ছে যেন আধমনি বস্তা মাথায় নিয়ে। জয়প্রকাশেরই একটা ক্যাচ আর একটা স্টাম্পিং চান্স মিস করেছে, এরা আবার ম্যাচ জিতবে! অফে ছ’টা লোক রেখে বল ফেলছে লেগস্টাম্পে! এ—ম্যাচ ফুলবাগান ঠিক বার করে নিয়ে যাবে।’
এবং ফুলবাগান তাই করল। সাত উইকেটে দুশো সাতচল্লিশ করল যখন, তখনও ম্যাচের দু’ ওভার বাকি, জয়প্রকাশ আশি বলে বিরানব্বই করে লং অনে ধরা পড়ে। আর শুভ্রজ্যোতি একশো আট বলে সত্তর রান করে নট আউট। দু’জনে মিলে তুলেছে একশো পঁয়তাল্লিশ রান। ছেলেটা কঠিন সময়ে চাপের মুখে ভেঙে পড়েনি। টেকনিক ভাল, টেম্পারামেন্ট ভাল, ছেলেটা উঠবে। ওর খেলা জহরকে খুশি করেছে। সাপোর্টারদের কাঁধে চেপে শুভ্রজ্যোতি ফিরছে। গরমে লাল হয়ে যাওয়া মুখের লাজুক হাসিটা জহরের ভাল লাগল। তিনি প্রায় অন্যমনস্কের মতো মৃদু হাততালি দিলেন। হারা ম্যাচ জিতে নেওয়ার মতো ঘটনা খুব বেশি দেখা যায় না। বাস থেকে নেমে পড়ে খেলাটা দেখতে আসার জন্য জহর নিজেকে তারিফ জানালেন।
ক্লাব হাউস থেকে বেরিয়েই দেখলেন অমর দত্তর ছেলে রাস্তা পার হওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে এধার—ওধার তাকাচ্ছে। তাঁর সঙ্গে চোখাচোখি হতে ছেলেটি হাসল।
‘খেলা দেখলে?” জহর জিজ্ঞেস করলেন।
”হ্যাঁ।”
”কীরকম দেখলে?”
”শুভ্র দারুণ ব্যাট করল।” ছেলেটির চোখ—মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। ”দেখলেন একটাও তুলে মারেনি, সব জমির ওপর দিয়ে। অথচ সিক্সার মারতে ওস্তাদ।”
”তুমি ওর খেলা আগে দেখেছ?”
”ও তো দু’বছর আগে আমাদের ক্লাবেই ছিল, একসঙ্গে খেলেছি। ….এ—বছরই শুভ্র ফুলবাগানে এসেছে। যাই, ওকে কনগ্র্যাচুলেট করে আসি। … আপনার ক্লাব যে এভাবে হারবে ভাবিনি।”
আমার ক্লাব! কথাটা জহরের মনে বাজল। ব্রাদার্স ইউনিয়ন কি এখনও আমার ক্লাব! কত বছর ব্রাদার্সে খেলেছি …. আঠারো বছর? আঠারোই হবে, আট বছরই তো ক্যাপ্টেন ছিলাম! তারও আগে দুটো সিজন ফুলবাগানেও খেলেছি।
ছেলেটি রাস্তা পার হতে যাচ্ছে। জহর চেঁচিয়ে বললেন, ”শোনো, শোনো ….. তোমার নামটা কী?”
”সমর।” একটু থেমে নিয়ে জুড়ল, ”সমু।”
”চলো আমিও তোমার সঙ্গে যাব, শুভ্রর সঙ্গে আলাপ করব।”
দু’জনে মিনিট দুয়েক হেঁটে পৌঁছল ফুলবাগান টেন্টে। কলকাতার পুবে নারকেলডাঙ্গা আর বেলেঘাটার মোড়ে ফুলবাগান অঞ্চল। ক্লাবটি সেখানেই। পঁচাশি বছর আগে পাড়ার কয়েকজন ছেলে প্রতিষ্ঠা করে। কালক্রমে সেখান থেকে বড় হতে—হতে এখন ময়দানে জায়গা করে নিয়েছে। ক্রিকেট ছাড়া ফুটবলও খেলে সিনিয়ার ডিভিশনে। নামটাই ফুলবাগান অ্যাথলেটিক, জায়গার সঙ্গে এখন আর সম্পর্ক নেই। ক্লাব প্রাঙ্গণটা বেশ বড়। কাঠের বেঞ্চ আর ছোট—ছোট টেবিল ছড়ানো। বয়স্ক মেম্বাররা এই গরমের জন্য এখনও এসে পৌঁছননি। তবে যেসব সমর্থক ইডেনে খেলা দেখতে গেছল তারাই এখন উল্লাস করছে। টেন্টের মধ্যে প্রচুর লোক। প্লেয়াররা এখনও পোশাক বদলায়নি। সফট ড্রিঙ্কসের বোতল নিয়ে অনেকে খোলা প্রাঙ্গণে বেঞ্চে বসে। গরম, ঘাম আর উত্তেজনা প্রশমনের সঙ্গে চাপা উচ্ছ্বাসে তাদের মুখ গনগন করছে। সমর্থকদের স্তুতি প্রশংসা তারিয়ে—তারিয়ে উপভোগ করার সঙ্গে চুমুক দিচ্ছে বোতলে।
জহর একটা বেঞ্চে বসলেন। সমর টেন্টের ভেতর ঢুকে গেল। একটু পরেই ফিরে এল একটা বোতল হাতে, তার সঙ্গে শুভ্র।
”শুভ্র, ইনি জহর পাল, নাম শুনেছিস তো। আজ তোর ব্যাটিং দেখেছেন, ভাল লেগেছে ওঁর।” সমু পরিচয় করিয়ে দিতেই শুভ্র হাতজোড় করে নমস্কার করল। জহর প্রশংসাভরা চোখে তাকিয়ে বললেন, ”ভাল খেলেছ। তবে বাসুদেবের ফ্লাইটেড বলে তোমার ইনিশিয়াল মুভমেন্টটা পেছনদিকে হচ্ছিল, এগিয়ে গিয়ে হাফভলিতে মিট করার চেষ্টা দেখলাম না। … অ্যাটাক করবে তো বেরিয়ে এসে! এমন সহজ পিচে তো বোলিংকে তুলোধোনা করবে, দেখলে না জয়প্রকাশ তাই করল। অবশ্য ওর মতো এক্সপিরিয়ান্স তোমার নেই। …. তা হলেও খুব ভাল খেলেছ।”
শুভ্র নম্রস্বরে বলল, ”প্রকাশদাই বারণ করলেন। বললেন, ধরে খেল, তাড়াহুড়ো করিসনি। যা করার আমি করছি।”
