একই সঙ্গে কোনি আর হিয়া ৫০ মিটার থেকে টার্ন নেয়। সঙ্গে সঙ্গে বদু চাটুজ্জে লাল ফ্ল্যাগ নাড়তে শুরু করে। রেফারী ধীরেন ঘোষ ছুটে গিয়ে ফ্ল্যাগ দেখাবার কারণটা জেনে, বলল, ”কনকচাঁপা পাল ডিসকোয়ালিফাই হয়েছে। টার্ন করেই আন্ডারওয়াটার ডাবল—কিক নিয়েছে।”
শুনে অবাক হয়ে গেল ক্ষিতীশ। শুধু বলল, ”এরকম ভুল করার কথা তো নয়।”
হিয়া প্রথম এবং তার থেকে ৬ মিটার পিছনে কোনি, ৭ মিটার পিছনে অমিয়া সাঁতার শেষ করে। কোনিকে ২০০ মিটারে নামতে দেয়নি ক্ষিতীশ। ব্রেস্ট স্ট্রোকে পায়ের উপর অত্যধিক খাটুনি পড়ে, অথচ তার পরেই রয়েছে ২০০ মিটার ফ্রি স্টাইল ইভেন্ট। কোনি মূলতঃ ফ্রি স্টাইলার। কিন্তু এতেও কোনি পারল না। সাঁতার শেষ করে ফিনিশিং বোর্ড ছুঁয়েই সে মুখ ঘুরিয়ে দেখল অমিয়া হাতে ছোঁয়াল। কোনি একগাল হেসে মুখ তুলে ক্ষিতীশের দিকে তাকাল। ঘড়িটা উঁচু করে ধরে গ্যালারি থেকে ক্ষিতীশ হাত নাড়ল। ঘোষণায় শোনা গেল অমিয়া প্রথম হয়েছে।
ক্ষিতীশ প্রথমে থ হয়ে গেল, তারপর ধীরেনের কাছে ছুটে গিয়ে বলল, ”এসব কি হচ্ছে?”
”কি আবার হবে!” ধীরেন অগ্রাহ্য করে এগিয়ে যাচ্ছিল, ক্ষিতীশ ওর হাত টেনে ধরল।
”আমিও টাইম রাখছি। কোনি আগে টাচ করেছে, ওর টাইম—”
”তোমার জাপানী ঘড়ির টাইম তোমার কাছেই রাখ।”
নকুল মুখুজ্জে প্রতিবাদ জানাল জুরি অফ অ্যাপীলের কাছে। প্রতিবাদ নাকচ হয়ে গেল। পনেরো মিনিট পরেই ছিল ২০০ মিটার ব্যক্তিগত মেডলি। কোনি বাটারফ্লাইয়ে হিয়া এবং অমিয়ার কাছে পিছিয়ে পড়ল, ব্যাক স্ট্রোকে অমিয়াকে ধরে ফেলে টার্ন নিতেই দেখা গেল যজ্ঞেশ্বর ভটচার্য লাল ফ্ল্যাগ তুলে রয়েছে।
”ব্যাপার কি!” ক্ষিতীশ গ্যালারি থেকে নেমে এল। ”ধীরেন জোচ্চচুরির একটা সীমা আছে। জগু তো আগে থেকেই ফ্ল্যাগ তুলেছিল।”
”কে বলল আগে থেকে! তোমার মেয়েটা ফলটি টার্ন নিয়েছে, তারপর ফ্ল্যাগ দেখিয়েছে। শেখাও শেখাও, টেকনিক্যাল ব্যাপারগুলো শেখাও। জুপিটারকে অপদস্থ করা ছাড়া আর কিছু তো শেখাওনি।” ধীরেন উত্তেজিতভাব হাত নেড়ে বকের মতো গলাটা লম্বা করে বলতে লাগল, ”আইনটাও শিখো যে, ব্যাক স্ট্রোকে টার্ন নেবার জন্য বোর্ডে হাত ছোঁয়াবার আগে নরম্যাল পজিশন অন দি ব্যাক থাকতে হবে। কনকচাঁপা ঘুরে গিয়ে হাত ছুঁইয়েছে, নরম্যাল পজিশনে থেকে ছোঁয়ায়নি। যাও যাও, গিয়ে বোসো এখন।”
হিয়ার কাছে অমিয়া হেরে গেল এক সেকেন্ডের তফাতে। কোনি আড়ষ্ট হয়ে গেল দু’বার বাতিল হয়ে এবং প্রথম হয়েও দ্বিতীয় হয়ে যাওয়ায়। বাড়ি ফেরার সময় ক্ষিতীশ বাসে সারা পথ গজরাল এবং অবশেষে বলল, ”কাল হানন্ড্রেড মিটার, দেখি ধীরেনরা কি করে তোকে আটকায়।”
কিন্তু আটকাবার যে অনেক পন্থা আছে ক্ষিতীশ তা ভেবে দেখেনি।
পরদিন স্টার্টিং ব্লকে যখন প্রতিযোগীরা এসে দাঁড়াল ক্ষিতীশ একটু অবাকই হল। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিযোগীদের মধ্যে যারা সেরা তাদের মাঝখানে রাখা হয়,—৩, ৪, ৫ নম্বর লেনে। হিয়া ৩ নম্বরে, কোনি ৪ নম্বরে, অমিয়া ৬ নম্বরে আর তাদের মাঝে জুপিটারের ইলা ৫ নম্বর লেনে। হিটে কোনক্রমে তৃতীয় হয়ে ইলা ফাইনালে উঠেছে। দু’ বছর আগে প্রি—ইউ পরীক্ষায় টোকার সময় ধরা পড়ে ইলা গার্ডকে কামড়ে দিয়েছিল।
ক্ষিতীশ এগিয়ে যাচ্ছিল ধীরেনের দিকে। একজন ভলান্টিয়ার তাকে আটকে দিয়ে বলল ”প্ল্যাটফর্মে কম্পিটিটাররা আর অফিসিয়ালরা ছাড়া কেউ যেতে পারবে না।”
ফিরে এসে ক্ষিতীশ ঘড়ি হাতে নিয়ে বসল। শুরু থেকেই প্রচণ্ড রেস। অমিয়া বদ্ধপরিকর চ্যাম্পিয়নশিপ বজায় রেখে সাঁতার থেকে বিদায় নিতে। হিয়া মসৃণ ছন্দোবদ্ধ এবং দ্রুততালে নিখুঁত ভঙ্গিতে ভেসে যাচ্ছে। কোনি যেন তাড়া খাওয়া ব্যস্ত উদ্বিগ্ন জলকন্যা। জল তোলপাড় করে সে যেন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে চলেছে। বাকিরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছে ওই তিনজনের পিছনে অন্তত ২০ মিটারের মধ্যে থাকতে। ইলার ব্যস্ততাটা একটু কম, সে বারবার মুখ তুলে তাকাচ্ছে আর ক্রমশই সরে যাচেছ কোনির লেনের দিকে।
বোর্ড ছুঁয়ে সবার আগে টার্ন নিল কোনি। তারপর অমিয়া। ব্রেস্ট স্ট্রোকাররা ভাল ফ্রি স্টাইলরা হয় না—হিয়া প্রায় দু মিটার পিছিয়ে পড়েছে। বাকিরা তখনো ৪০ মিটারেও পৌঁছয়নি। টার্ন নিয়ে কোনি সবে মাত্র দু—তিনটি স্ট্রোক দিয়েছে, তখনই ব্যাপারটা ঘটল।
ইলা ঢুকে পড়েছে কোনির লেনে। দুজনে মুখোমুখি সঙ্ঘর্ষ! উঃ” বলে কোনি চেঁচিয়ে উঠল একবার, দেখা গেল ওরা জড়াজড়ি অবস্থায় এবং হাঁকপাক করে সে যেন নিজেকে ছাড়াবার চেষ্টা করছে। কয়েক সেকেন্ড এভাবেই কাটল। ততক্ষণে অমিয়া এবং হিয়া ওদের অতিক্রম করে বেরিয়ে গেছে। বদু চাটুজ্জে লাল ফ্ল্যাগ উঁচিয়ে ইলার দিকে তাকিয়ে বলল, ”ইউ ডিসকোয়ালিফায়েড।” ইলা আবার নিজের লেনে সরে গিয়ে চিত সাঁতার কেটে স্টার্টিং প্ল্যাটফর্মের দিকে ফিরে যেতে লাগল।
কোনি শুধু একবার সামনে তাকিয়ে দেখল। তারপরই বড় হাঁ করে অনেকখানি বাতাস বুকে ভরে নিয়ে তাড়া করল সামনের দুজনকে। অনেক দেরী হয়ে গেছে, তবু শেষ চেষ্টা এঞ্জিনের পিস্টনের মতো ওঠানামা করছে দুটো হাত, পায়ের কাছে টগবগিয়ে ফুটছে জল।
