”মানিক আমি এখানে নামব, একটু কাজ আছে। তুই বাড়ি চলে যা।”
জহর এই বলে বাস থেকে নেমেই হনহনিয়ে ইডেন মাঠের দিকে রওনা হলেন। তিনি কাগজে দেখেছেন পি সেন ট্রফির খেলা শুরু হয়েছে। আজ ব্রাদার্সের সঙ্গে ফুলবাগানের ফাইনাল। ঘড়ি দেখে আন্দাজ করলেন লাঞ্চ হয়ে আবার খেলা শুরু হয়েছে।
কাঠফাটা রোদ্দুর। দর্শক বড়জোর শ’দুই। ক্লাব হাউসের সিঁড়ি ভেঙে ওপরতলায় উঠে এসে সিমেন্টের চেয়ারে বসলেন জহর। দু’ধারে তাকিয়ে একজন চেনা লোককে দেখলেন। মনোজ, ব্রাদার্স ইউনিয়নের পুরনো সাপোর্টার, জহর তার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। মাঠে ফিল্ড করছে ব্রাদার্স।
”খবর কী?” জহর জিজ্ঞেস করলেন।
”ভালই। চুয়াল্লিশ ওভারে দুশো ছেচল্লিশ। … দারুণ ব্যাট করল মান্টু সিং, এই একটা ভাল প্লেয়ার এনেছে পানু পোদ্দার। সাতাত্তরটা রান করল, কী মার যে মারল কী বলব! ইজিলি সেঞ্চুরিটা করতে পারত।’
”পারল না কেন?”
”বমি করতে শুরু করল। এই গরমে আর দাঁড়াতে পারছিল না।”
”এগারোটা ফিল্ডার কী করে তা হলে দাঁড়াল?”
এমন এক বিদঘুটে কথা শুনে মনোজকে বিব্রত দেখাল। জহর ঠোঁট টিপে হাসলেন। বললেন, ”খুব দামি প্লেয়ার বোধ হয়!”
”চারটে ম্যাচ খেলে চল্লিশ হাজার নেবে। … আজকাল ক্রিকেটেও ফুটবলের মতো টাকা! … জহরদা আপনারা আর কী করলেন? শুধু বুড়ো আঙুল চুষে গেলেন।”
জহর হাসতে গিয়ে থমকে গেলেন। মাঠে একটা উইকেট পড়েছে।
‘থার্ড উইকেট পড়ল।” মনোজ উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ”থ্রি ফর থার্টি, মাত্র সাত ওভার খেলা হল। জহরদা, পি সেন ট্রফি এবার ব্রাদার্সের ঘরে উঠল। … তিনটেই ভাল ব্যাট, মাত্র তিরিশ রানে চলে গেল!”
”হ্যাঁ চলে গেল। গাড়োলের মতো ব্যাট করলে তো চলে যেতেই হবে। ওরা কি ভেবেছে পঁচিশ ওভারেই আড়াই শো রান তুলে নেবে? কীভাবে ছেলেটা ব্যাট চালাল দেখেছ? একটা থার্ড ক্লাস বলে শর্ট লেগের হাতে আলুগপ্পা!” জহর তিক্তবিরক্ত স্বরে বললেন।
”দিক না আলুগপ্পা, তাতে তো ব্রাদার্সেরই লাভ।”
”তা বটে, তবে এরকম ব্যাটিং বসে দেখা যায় না।”
”আপনারা, পুরনো লোকেরা সবসময় কেতাবি ব্যাটিং দেখতে চান।” মনোজের গলায় সামান্য তাচ্ছিল্য। ”রান পেলেই হল, ব্যাটের কোথায় লেগে কোথা দিয়ে রান এল তাই নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ কী?”
জহর চুপ করে মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। নতুন ব্যাটসম্যান প্রথম বলটা ফরওয়ার্ড ডিফেন্সিভ খেলল। বলটা গেল স্লিপের দিকে। জহরের ভুরু কুঁচকে উঠল। মনোজকে জিজ্ঞেস করলেন, ”নুরু ক’টা উইকেট পেয়েছে?”
”এই একটাই, বাকি দুটো অলোক।”
”জয়প্রকাশ ব্যাট করেনি?” জহর খোঁজ নিলেন।
ফুলবাগানের সেরা ব্যাট এবং সবথেকে অভিজ্ঞ জয়প্রকাশ চার বছর আগে বাঙ্গালোর থেকে কলকাতায় চাকরি নিয়ে আসে। তিনটে টেস্ট খেলেছে। রনজি ট্রফিতে কর্নাটক আর বাংলার হয়ে মোট তেরোটা সেঞ্চুরি, দলিপ ট্রফিতে দুটো সেঞ্চুরি আছে। টেকনিক্যালি নিখুঁত এবং বুদ্ধিমান।
”এখনও নামেনি। …. ও আর করবে কী….. আরে, আরে—” মনোজ লাফিয়ে উঠল, ”ফোর্থ উইকেট গন… জহরদা কট অ্যান্ড বোল্ড। ফুলবাগান ফোর ডাউন ফর থার্টি টু!… গেল, ফুলবাগান আজ গেল। দশ ওভারে বত্রিশ … আলোকের থার্ড উইকেট!”
জহর কথা বললেন না। তীক্ষ্ন চোখে তাকিয়ে রইলেন উইকেটের দিকে মন্থর পায়ে যাওয়া জয়প্রকাশের দিকে। মাথায় হেলমেট, বছর পঁয়ত্রিশের শীর্ণ লম্বা চেহারা। চার উইকেটে বত্রিশের মতো পরিস্থিতিতে জয়প্রকাশ বহুবার ব্যাট করতে নেমেছে। এটা লিমিটেড ওভারের ম্যাচ, খুটখাট করে ব্যাট করলে চলবে না। উইকেট বাঁচিয়ে দ্রুত রানও তুলতে হবে। পঁয়ত্রিশ ওভার বাকি, হাতে ছ’টা উইকেট, এখন তুলতে হবে আরও দুশো পনেরো রান। জহর নড়েচড়ে বসলেন। কাজটা সহজ নয়।
জয়প্রকাশ তিনটে বল খেলল। সবক’টাই ফিরিয়ে দিল বোলারকে। ওভারশেষে নন স্ট্রাইকার কিঙ্করের সঙ্গে কথা বলল। নুরুর প্রথম বলেই থার্ডম্যান থেকে একটা রান নিয়ে কিঙ্কর স্ট্রাইক দিল জয়প্রকাশকে।
জয়প্রকাশ প্রথম বলটাতেই ব্যাট চালাল। ‘কড়াত’ শব্দ হল। নিমেষে পয়েন্ট বাউন্ডারিতে বল। জহর শিরদাঁড়ায় শিহরন বোধ করলেন। দারুণ স্কোয়্যার কাটটা! পরের বলটা ওভারপিচ। স্ট্রেট ড্রাইভ। চার রান। নুরুর চতুর্থ বল ফুলটস, অফ স্টাম্পের বাইরে, জয়প্রকাশ পুল করল মিড উইকেটে। আবার চার রান। পঞ্চম বলটা দেখে জহরের মনে হল নুরু ঘাবড়ে গেছে। লেগ স্টাম্পের প্রায় এক হাত বাইরে ছিল। জয়প্রকাশ ছেড়ে দিল। আম্পায়ার ওয়াইড সঙ্কেত দেখালেন। পরের বল ডেলিভারির আগেই কিঙ্কর ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে এল দ্রুত শর্ট রান নেওয়ার আশায়। নুরু সেটা লক্ষ করেই ডেলিভারি না করে বল হাতে বেল তুলে নিয়ে, ”হাউজ দ্যাট” বলে চিৎকার করল।
আম্পায়ার আঙুল তুলে দিতেই মনোজ লাফিয়ে উঠল। মাঠে প্লেয়াররা দু’হাত তুলে নুরুর দিকে ছুটে এসে হাতে হাত চাপড়াচ্ছে। ”ফিফথ উইকেট….. জহরদা, ভাবা যায়! ছেচল্লিশ রানে পাঁচটা উইকেট! … ওহহ!” মনোজ দু’হাতে মুখ ঢাকল। ”আমরা জিতছি। ফুলবাগান আজ যা ডিফিট খাবে!”
”মনোজ, খেলার এখনও অনেক বাকি।” শান্ত স্বরে জহর বললেন, ”উইকেট পাচ্ছে নিজেদের বোলিংয়ের জন্য নয়, ব্যাটসম্যানদের ভুলে। ক্রিজে জয়প্রকাশ রয়েছে। ও কিন্তু ভুল করে না। একটা লোকই ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পারে।”
