”নামটা শোনা—শোনা লাগছে। বেঁটে, ফর্সা, গোলগাল, মাথায় বোধহয় অল্প টাক?”
”হ্যাঁ। তবে এখন সারা মাথাই টাকে ভরা।”
”আচ্ছা, অনেক বেলা হল, চলি।”
জহর দ্রুতপায়ে মাঠ থেকে বেরিয়ে এলেন। হাঁটতে—হাঁটতে তাঁর মনে পড়ল অনেক বছর আগের একটা ঘটনা। লিগের শেষ ম্যাচ মোহনবাগানের সঙ্গে। ইডেনে ছিল খেলাটা। একদিকের আম্পায়ার ছিল অমর দত্ত। মোহনবাগান দু’শো পাঁচ অল আউট। জহর ব্যাট করতে নেমেছিলেন ফোর ডাউন। ব্রাদার্স তখন পঁচাশি। নেমেই তিনি পেটাতে শুরু করেছিলেন। সাত উইকেটে একশো সত্তর যখন, তিনি তখন একাত্তর রানে, তেরোটা চার মেরেছেন। ব্যাট করেছেন মাত্র পঁয়তাল্লিশ মিনিট। জেতার জন্য আর দরকার ছত্রিশ রান। যেভাবে খেলছিলেন তাতে ওই ক’টা রান পাঁচ ওভারেই তুলে নিতে পারবেন বলে তিনি ধরে নিয়েছিলেন।
জহরের চোখে ভেসে উঠল সেই সময়ের ছবি। মোহনবাগান ক্যাপ্টেন বিটু ঘোষ মরিয়া হয়ে বল দিল প্রশান্ত চৌধুরীকে, প্রশান্ত শুধু নেটে বল করে, কোনওদিন কোনও ম্যাচে বল করেনি। জহর জানতেন না ও কী ধরনের বোলার। বাউন্ডারির ধারে স্কোয়ার লেগ থেকে লং অফ পর্যন্ত পাঁচজন ফিল্ডার রাখল বিটু বাউন্ডারি বন্ধ করার জন্য। জহর হুঁশিয়ার হয়ে প্রথম বলটা খেলেছিলেন। ফ্লাইট করানো লেগ ব্রেক। লেগস্টাম্পের বাইরে শর্ট পিচ। অনায়াসে পুল করতে পারতেন। হয়তো চারটে রানও পাওয়া যেত। মাত্রাতিরিক্ত সাবধান হয়ে তিনি পা বাড়িয়ে প্যাডে খেলেছিলেন। প্রশান্তর দ্বিতীয় বলটাও একই ধরনের ছিল। পুল করবেন ভেবেও শেষ মুহূর্তে ব্যাক ফুটে এসে ডিফেন্সিভ খেলেছিলেন। তখন নিজের ওপর তাঁর রাগ ধরে। খামোখা সমীহ করছেন প্রশান্তকে, বোলারের জাতই নয়। স্রেফ ভ্যাবাচাকা খাওয়াবার জন্য বিটু ওকে ডাক দিয়েছে। বহুক্ষেত্রে এই রকম বোলাররাই উইকেট পেয়ে যায়।
তৃতীয় বলটা মারবেন ঠিক করে জহর বল ডেলিভারির আগেই এক—পা বেরিয়েছিলেন। ফ্লাইট দেখে শর্ট পিচ হচ্ছে আন্দাজ করে আরও এক—পা বেরিয়ে হাফভলি করে নিয়ে মিড উইকেট দিয়ে ছয় মারার জন্য ব্যাট চালিয়েছিলেন। কিন্তু কী যে হয়ে গেল, বলটা তিনি ফসকালেন, বলটা যে লেগস্টাম্পের সামান্য বাইরে ছিল সে—সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত ছিলেন। ফসকানো বল লাগল তাঁর ডান পায়ে। উইকেটের সামনেই ছিল পা। প্রশান্ত লাফিয়ে উঠে ঘুরে নাটকীয়ভাবে দুই মুঠো ঝাঁকিয়ে ডাকাতের মতো গলায় চিৎকার করে অ্যাপিল করেছিল। তার সঙ্গে যোগ দেয় উইকেটকিপার। কভার থেকে বিটু ‘হাউজ্যাট’ বলে চেঁচিয়ে আম্পায়ারের দিকে ছুটে এসেছিল। আম্পায়ার ডান হাতের তর্জনি আকাশের দিকে তুলে দিয়েছিলেন।
জহর হতভম্ব হয়ে প্রায় দশ সেকেন্ড তাকিয়ে থেকেছিলেন। তাঁর চোখের বজ্রাহতের চাহনিটা ধীরে—ধীরে রূপান্তরিত হয়েছিল জ্বলন্ত অঙ্গারে। বিটু চেঁচিয়ে বলেছিল, ”দাঁড়িয়ে আছিস কেন রে, অনেক খেলেছিস, এবার বাড়ি যা।” মাথা নিচু করে, চোয়াল চেপে জহর মাঠ ছেড়েছিলেন। বাকি দুটো উইকেটে আর পনেরো রান উঠেছিল। ব্রাদার্সের লিগ চ্যাম্পিয়ান হওয়া অপূর্ণ থেকে যায়। ফিরে আসতেই কানু ভটচায বলেছিল, ”শেষকালে প্রশান্তর বলে! ছ্যা ছ্যা ছ্যা … কাছেই গঙ্গা, গিয়ে ডুবে মর। … জেতা ম্যাচ—!” তখন জহর বলেছিলেন, ”বলটা লেগস্টাম্পের অন্তত এক বিঘত বাইরে পড়েছিল। লেগস্টাম্পের বাইরের বলে কি এল বি ডবলু হয়? আজ আমি আম্পায়ারের টুঁটি ছিঁড়ব।” বলেই তিনি ছুটেছিলেন আম্পায়ার্স রুমের দিকে।
টুঁটি ছেঁড়া হয়নি। কয়েকজন তাঁকে জাপটে ধরে রাখে। তিনি চিৎকার করতে থাকেন, ”জোচ্চচুরি, জোচ্চচুরি… টাকা না খেলে অমন ডিসিশান কেউ দেয়?”
কে একজন তখন বলে, ”জহরকে এই প্রথম মাথা গরম করতে দেখছি। খুবই মনে লেগেছে।”
আর—একজন বলে, ”আম্পায়ারও তো মানুষ আর মানুষমাত্রেই ভুল করে। অমর দত্ত যে এখন কলকাতার সেরা আম্পায়ার তাতে তো কোনও সন্দেহ নেই! জহর পালের এটা স্পোর্টিংলি নেওয়া উচিত।”
কথাটা শুনেই তিনি লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়েছিলেন। পরে মনে হয়েছিল, এ কী করেছেন? একটা খেলায় আউট হলে কি ভদ্রতা বিসর্জন দিতে হবে? অত লোকের মাঝে কি খারাপ ইঙ্গিত করলেন লোকটির উদ্দেশ্যে! হয়তো সত্যিই ভুল করে আউট দিয়েছে, অথচ বলে দিলেন টাকা খেয়েছে! অমর দত্ত নিশ্চয় শুনেছে তার চিৎকার। কী ভাবল তার সম্পর্কে! খেলা কি আত্মমর্যাদার থেকেও বড় জিনিস? বেশ কিছুদিন তিনি অনুশোচনায় দগ্ধ হয়েছিলেন। তারপর ধীরে—ধীরে ঘটনাটা ভুলে যান।
এত বছর পর আজ আবার মনে পড়ে গেল। অমর দত্তের ছেলের সঙ্গে দেখা না হলেই ভাল ছিল। … ছেলেটার নামটা তো জানা হল না!
.
অবনী রায়ের দেওয়া পাঁচ হাজার টাকার চেকটা ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খুলে জহর জমা দিয়েছিলেন। কয়েকদিন পর টাকাটা তুলে তিনি ছেলেকে এক দুপুরে নিয়ে গেলেন নিউ আলিপুরে এক ক্লিনিকে। সেখানে এম আর আই স্ক্যান করিয়ে বাসে ফিরছিলেন। বাস যখন পার্ক স্ট্রিটের কাছাকাছি তিনি দেখলেন ময়দানে একটা মাঠে ক্রিকেট খেলা হচ্ছে। তাঁর মন আনচান করে উঠল। অনেকদিন তিনি ঘাসের ওপর হাঁটেননি, ব্যাটের সঙ্গে বলের ধাক্কা লাগার শব্দ শোনেননি, ব্যাটের ঠিক কোথায় বল লাগল, শব্দ শুনে তা বলে দিতে পারেন। ‘হাউজ্যাট’ চিৎকার অনেকদিন শোনেননি, আউট হয়ে ফিরে আসা কোনও তরুণের হতাশ মুখ বা শরীরের নিখুঁত ব্যালান্সে ভর রেখে মারা কভার ড্রাইভ অনেকদিন দেখেননি কিংবা লংঅনে আকাশছোঁয়া বলে ক্যাচ নেওয়া।
