”বেলা বেড়ে যাচ্ছে, আপনাকে তো এখন ব্যাঙ্কে যেতে হবে।” প্রতাপ উঠে দাঁড়াল, ”যদি কোচিং স্কুল শুরু করি তা হলে আপনাকে আমার দরকার হবে। অন্তত দু’জন ভেটারেন কোচ রাখব। আপনি আসবেন তো?”
”নিশ্চয় আসব। তুমি শুধু দোকানে খবর পাঠিয়ো।”
বেলগাছিয়া ডিপো থেকে ট্রামে উঠলেন জহর। ব্যাঙ্কে এসে শুনলেন, ”দেরি করে ফেলেছেন, কাল বারোটার আগে আসুন।” ব্যাঙ্ক থেকে বেরিয়ে ঠিক করলেন একটু ঘুরে রাজনারায়ণ পার্কটা দেখে বাড়ি ফিরবেন। এখন সাড়ে বারোটা বাজে।
পার্কটা রাজপথের ওপর নয়, অন্তত একশো মিটার ভেতরে। আকৃতিতে প্রস্থের থেকে দৈর্ঘ্যে বেশি। নাইন—এ—সাইড ফুটবল ম্যাচ খেলা যায়। দু’দিকে বাড়ি আর দু’দিকে রাস্তা। রাস্তার দিকের লোহার রেলিং চুরি হয়ে যাওয়ায় কোমরসমান ইটের পাঁচিল, পাঁচিল ঘেঁষে সাত—আটটা সিমেন্টের বসার জায়গা। দুর্গাপুজো, রাজনৈতিক সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা গানের জলসার ধকলে পার্কে একচিলতে ঘাসও নেই। জমি অসমান, জায়গায়—জায়গায় খোঁড়াখুড়ির চিহ্ন রয়ে গেছে। পার্কের একপ্রান্তে একতলা দুটি লম্বা ঘর, রাজনারায়ণ ইনস্টিটিউট। একদা একটা লাইব্রেরি ছিল, এখনও ছেঁড়া পুরনো কিছু বই আর কয়েকটা আলমারি রয়ে গেছে। ইনস্টিটিউটের ফুটবল আর ক্রিকেট টিমও ছিল। এখন ক্যারম আর তাস খেলা হয়।
জহর একটা বাড়ির ছায়ায় দাঁড়িয়ে মাঠের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁর ছোটবেলায় এই মাঠ ঘাসে ঢাকা ছিল। ইনস্টিটিউটের পরিচালনায় ফুটবল টুর্নামেন্ট হত। মাঠ ঘিরে দর্শকের ভিড়ের মধ্যে তিনিও হাজির থাকতেন। এখন মাঠের কী অবস্থা! হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ল খাঁ—খাঁ রোদ্দুরে মাঠের এককোনায় একটি আঠারো—উনিশ বছরের ছেলে আধভাঙা ব্যাট দিয়ে একটা রবারের বল বাড়ির দেওয়ালে মেরে যাচ্ছে, মাঠে তো বটেই, রাস্তাতেও কোনও লোক নেই। ছেলেটি একমনে গভীর অভিনিবেশে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে ব্যাকফুটে বলটা এমনভাবে মারছে যে, সেটা দেওয়ালে লেগে একটা ড্রপ পড়ে ঠিক তার ব্যাটেই ফিরে আসছে। শটের ওপর এমনই নিয়ন্ত্রণ যে, একবারের জন্যও তাকে পা দুটো ছ’ ইঞ্চির বেশি এধার—ওধার করতে হচ্ছে না। ব্যাপারটা দেখে জহর মজা পেলেন। একা—একা এই ভরদুপুরে ক্রিকেটপাগল না হলেও কি এমন কাণ্ড করে।
লক্ষ করলেন, শটের তীব্রতা বাড়াচ্ছে। বেশ জোরে—জোরে মেরে যাচ্ছে। বল দেওয়ালে লেগে মিডিয়াম পেসে হাফ ভলিতে ছেলেটির কাছে ফিরে আসছে আর সে ড্রাইভ করে যাচ্ছে। ”বাঃ,” আপনা থেকেই জহরের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল শব্দটা। তিনি মাঠের ভেতরে ঢুকে ছেলেটির পেছনে গিয়ে দাঁড়ালেন। পা মাথা, কনুই এবং শরীরের ব্যালান্স নিখুঁত না হলে শটের ওপর এমন কন্ট্রোল কি আসে? সবচেয়ে বড় কথা কনসেনট্রেশন! কত শট মারল? সত্তর—আশিটা তো বটেই, একটাও ফসকাল না! জহর যখন এইসব ভাবছেন তখনই ছেলেটি বল ফসকাল। বলটা একটা ইটের কুচির ওপর পড়ে লাফিয়ে উঠেছিল। জহর বলটা ধরে ফেললেন।
পেছন ফিরে তাঁকে দেখে ছেলেটি অবাক! তার পেছনে যে একজন দাঁড়িয়ে থাকবেন রোদ্দুর মাথায় নিয়ে, এটা সে ভাবতে পারেনি, বোকার মতো সে হাসল, শ্যামলা রং, ছিপছিপে দোহারা গড়ন, লম্বায় প্রায় পাঁচ—দশ। খয়েরি স্পোর্টস শার্ট, পায়ে হাওয়াই চটি। হাসার জন্য দেখা গেল নীচের পাটির সামনের একটা দাঁত নেই।
”করছ কী?” জহর হাসলেন।
”এমনিই, একটু পেটাচ্ছি।”
”এভাবে পিটিয়ে লাভ?”
”ভাল লাগে।” লাজুক স্বরে সংক্ষিপ্ত উত্তর।
”কোনও ক্লাবে খেলো নাকি?”
”সবুজ শিবিরে,…. পাড়ার একটা ক্লাব।”
জহর কখনও সবুজ শিবির নামটা শোনেননি, ভাবলেন, পাড়ায় পাড়ায় কত ক্লাবই তো আছে। জিজ্ঞেস করলেন, ”থাকো কোথায়?”
ছেলেটি আঙুল তুলে বলল, ”এই পাশের রাস্তায়।
জহরের ইচ্ছে করল ওর নামটা জানতে। কিন্তু জিজ্ঞেস করতে তাঁর বাধল। গায়ে পড়ে প্রথম আলাপেই নাম জানতে চাওয়াটা যেন বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে বলে মনে হল, ”এখান দিয়ে যাচ্ছিলুম। তোমাকে এইভাবে খেলতে দেখে দাঁড়িয়ে গেলুম। এই প্রচণ্ড গরমের মধ্যে, একা একা—ভাবলুম পাগল নাকি?” জহর হাসলেন। ছেলেটি আবার বোকার মতো হাসল। বলটা ছুড়ে ফেরত দিয়ে জহর ঘুরলেন যাওয়ার জন্য।
”আমি কিন্তু আপনাকে চিনি।”
জহর ঘুরে দাঁড়ালেন, কৌতূহলী চোখে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
”চেনো? আমার নাম জানো?”
”জহর পাল, গত বছর দেশবন্ধু পার্কে ভেটারেনদের ম্যাচে আপনি ব্যাট করেছিলেন। চারটে ছক্কা মেরে লং অনে ক্যাচ দিয়ে আউট হন।” ছেলেটির চোখে আলো জ্বলে উঠল। ”বাবার কাছেও আপনার কথা শুনেছি।”
”কী শুনেছ?” জহরের কৌতূহল বেড়ে গেল।
”আপনি একঘণ্টা ক্রিজে থেকে একটাও রান করেননি রনজি ট্রফিতে বিহারের সঙ্গে খেলায়। আবার আসামের এগেনস্টে দু’ঘণ্টায় সেঞ্চুরি করেছিলেন।”
জহরের মুখে হাসি ফুটে উঠল, বললেন, ”কেন রান করিনি তার কারণটা বলেছেন?”
”ম্যাচ ড্র রাখার জন্য। শেষ একঘণ্টা শুধু বল আটকেছিলেন আর ছেড়ে দিয়েছিলেন। দশজন আপনাকে ঘিরে রেখেছিল।”
”তোমার বাবা খেলাটা দেখেছিলেন?”
”হ্যাঁ। বাবা তো আম্পায়ারিং করতেন। রনজি ট্রফির ম্যাচও খেলিয়েছেন—পঞ্জাব—রেলওয়েজ।”
”তাই নাকি? কী নাম তোমার বাবার?”
”অমর দত্ত।”
শুনেই জহরের ভ্রূ বেঁকে উঠল। চোখের চাহনি পলকের জন্য কঠিন হয়েই আগের মতো কৌতূহলী হল, ছেলেটি তা লক্ষ করল না।
