জহর পাল ডান হাতের বুড়ো আঙুল চোখের সামনে তুলে ধরলেন। কবেকার কথা! বাড়ি ফিরে রাতে চুন—হলুদ গরম করে মা লাগিয়ে দিয়েছিলেন। আসলে ভেঙেছিল হাড়। ব্যথা করত, আঙুলটা মুড়তে পারতেন না। ব্যাটের হ্যান্ডেলে বুড়ো আঙুলটা চেপে ধরতে গেলে লাগত, এখনও লাগে। ডাক্তার দেখিয়ে ছিলেন বহুদিন পর। অপারেশন করে হাড় সেট করতে হবে শুনে আর ডাক্তারের কাছে যাননি। ছুরি—কাঁচিতে তাঁর ভয়। এখন তাঁর মনে হল, অপারেশনটা করে নিলেই ভাল হত। তা হলে আবার আঘাত লাগার দুশ্চিন্তায় ব্যাটিংটা ভয়ে—ভয়ে করতে হত না। স্ট্রোকে জোরটাও দিতে পারতেন, খেলার ধরনটাও বদলে নিতে পারতেন। কে জানে, হয়তো স্লো ব্যাটিংয়ের জন্য রনজি টিম থেকে তা হলে বাদ পড়তেন না। ছোটখাটো ব্যাপারগুলোকে অবহেলা করলে পরে পস্তাতে হবেই।
ঘড়ি দেখলেন জহর। এক ঘণ্টার ওপর পার্কে বসে। এবার গিয়ে দেখা যাক, প্রতাপ ফিরেছে কি না। উঠে পড়লেন।
প্রতাপ কিছুক্ষণ আগেই ফিরেছে। জহরের আসার কারণ শুনে সে হাত বাড়িয়ে বলল, ”ফর্মটা দিন।” যথাস্থানে সই করে বলল, ”ব্যাঙ্কের ম্যানেজারের সঙ্গে আমার খাতির আছে, কোনও অসুবিধে হবে না।” জহর যাওয়ার জন্য উঠতেই প্রতাপ বলল, ”জহরদা, একটা কথা ছিল। আপনাদের ওদিকে রাজনারায়ণ পার্কে ছোটদের জন্য একটা ক্রিকেট কোচিং স্কুল খুলব ঠিক করেছি।”
”বলো কী!” জহর অবাক হলেন। ”ক্রিকেট শেখার স্কুল, এ তো ভাল কথা। শুনেছি কলকাতায় অনেক এরকম স্কুল হয়েছে। গাদা—গাদা ছেলে ভুলভাল টেকনিকে ব্যাট করে যাচ্ছে, ছুড়ে বল করছে ফার্স্ট ডিভিশনে, সেকেন্ড ডিভিশনে। দেখিয়ে দেওয়ার, শুধরে দেওয়ার জন্য তো ক্লাবে কেউ নেই। তোমার স্কুলে যদি … ভাল কথা, তুমি শেখাবে নাকি?”
”পাগল হয়েছেন! আমি ক্রিকেটের বুঝি কী? আমি শুধু ফিনান্স করব, অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ দিকটা দেখব, হিসেবটা বুঝে নেব। জানেন তো এখন প্রোমোটিংয়ের যুগ। খরচপত্তর করে, লোকজন রেখে স্কুল চালু করলুম, বিজ্ঞাপন দিলুম। এজন্য রিস্ক নিলুম। লাভ নাও হতে পারে। বাংলার ক্রিকেটের উন্নতির জন্য, মর্যাদা বাড়াবার জন্য, টেস্ট ক্রিকেটার তৈরি করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা তো দরকার। ভাবুন তো, বোম্বাই, পাঞ্জাব, দিল্লি, কর্ণাটক থেকে টেস্ট খেলছে অথচ বেঙ্গল থেকে, শুধু বেঙ্গল কেন, সারা ইস্টার্ন ইন্ডিয়া থেকে ইন্ডিয়া টিমে যাওয়ার মতো ছেলে পাওয়া যায় না! এটা কি লজ্জার কথা নয়?”
”অবশ্যই লজ্জার কথা।” জহর উৎসাহভরে সমর্থন করলেন।
”এজন্য দরকার বাচ্চচা বয়স থেকে ঠিকমতো ক্রিকেটটা শিখিয়ে দেওয়া, ঠিক কি না?”
”অবশ্যই।”
”কে বলতে পারে এই স্কুল থেকেই একটা গাওস্কর, একটা কপিলদেব বেরিয়ে আসবে না! … জহরদা, আপনি দাঁড়িয়ে কেন, বসুন।”
জহর বসলেন। তিনি উৎসাহে রীতিমতো ফুটছেন। প্রতাপ ব্যবসায়ী ঠিকই কিন্তু ক্রিকেট কত বছর আগে অল্প খেলেছে, অথচ এখনও ক্রিকেটের জন্য ভেবে যাচ্ছে। বাংলার জন্য কিছু একটা করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। খেলাধুলো তো এদেরই জন্য বেঁচে রয়েছে।
”ঠিক করেছি প্রফেশনাল অ্যাঙ্গেল থেকে একটা স্কুল খুলব। বুঝলেন জহরদা, আমাদের দেশে সবকিছুই ফোকটসে পেতে চায় আর সেইজন্যই সিরিয়াসলি কিছু নেয় না। কোচিং নেবে বিনি পয়সায়, তা হলে সিরিয়াসলি কেউ কি শেখে? বাপ—মা লেখাপড়ার জন্য টিউটর রাখবে তিনশো—চারশো টাকা মাইনে দিয়ে। আপনি খেলার জন্য পঞ্চাশ টাকা মাইনে দিয়ে কোচ রাখতে বলুন, অমনই দেখবেন চোখ কপালে তুলেছে। এখন ক্রিকেটই হচ্ছে মোস্ট গ্ল্যামারাস গেম। সবাই চায় তার ছেলেটি কপিলদেব হোক। টেন্ডুলকর যা দেখাচ্ছে, তার রোজগারের যা সব খবর বেরোচ্ছে, বাচ্চচাদের বাপ—মা’র আক্কেল গুড়ুম। তাতে আমাদেরই লাভ… মানে আমাদের স্কুলে ছেলে আরও বাড়বে। ছেলে তেন্ডুলকর হবে এই আশাটা তো আমাদের জাগিয়ে তুলতে হবে, ঠিক কিনা?”
”আশা জাগাও, কিন্তু টেন্ডুলকর হওয়াটা কোচ—ফোচের দ্বারা সম্ভব নয়। তবে এদের সংখ্যা তো হাতে গোনা! কিন্তু এটাও ঠিক, বাকিদের জন্য একটা প্রাথমিক শিক্ষার দরকার আছে।”
”যা বললেন!” প্রতাপ ঊরুতে চাপড় দিল। ”এই দরকারের কথা ভেবেই স্কুল করছি। কাউন্সিলরের সঙ্গে কথা হয়ে গেছে।”
”যারা কোচ করবে তাদের টাকা দেবে তো?”
”নিশ্চয় দেব। সেটা ঠিক করব কোচের ওজন বুঝে। নামটাম আছে এমন লোককে কোচ হিসেবে রাখলে তাকে তো বেশি টাকা দিতেই হবে। ছেলেদের কাছ থেকে নেব একশো টাকা।”
”অ্যা অ্যাক….শো!” জহর প্রায় আঁতকে উঠলেন।
”আপনি অবাক হচ্ছেন!” প্রতাপ চোখ সরু করে তাকাল। ”একশো, দেড়শো টাকার ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ছেলেমেয়েদের ভর্তি করাবার জন্য কী লম্বা লাইন পড়ে জানেন? যদি নামডাকওলা কাউকে পাই তাকে চিফ কোচ করব, দেখবেন তখন ভিড়টা কীরকম হয়।”
”ভিড় হলে এক—একজনকে কোচিং দেওয়ার টাইমই তো থাকবে না!” জহর বিভ্রান্ত বোধ করলেন, ব্যাপারটা তাঁর মাথায় ঢুকছে না।
”থাকবে, থাকবে।” প্রতাপ আশ্বস্ত করার জন্য বলল, ”দেখুন জহরদা, দেড়শো টাকা মাইনের স্কুলে চল্লিশ—পঞ্চাশজন ছাত্রছাত্রী প্রতি ক্লাসেই থাকে, তাদের কি লেখাপড়া হয় না? তারা কি স্টার পেয়ে পাশ করে না?”
এই অকাট্য যুক্তিতে জহর চুপ করে রইলেন। লেখাপড়ার স্কুল আর ক্রিকেটের স্কুল যে কী করে একই রকমের হতে পারে সেটা তাঁর মাথায় ঢুকছে না, স্কুলে তিনি অতি সাধারণ ছাত্র ছিলেন। অঙ্ক আর ইংরেজি গ্রামার কখনওই তাঁর মাথায় ঢোকেনি, ফলে স্কুল—ফাইনালে ব্যাক পেয়েছিলেন। কিন্তু ক্রিকেটে রনজি ট্রফিতে খেলেছেন, ছ’টা ম্যাচের দশ ইনিংসে আছে সাড়ে তিনশো রান, গড় প্রায় চল্লিশ, আর এই রেজাল্ট তো কোচিং স্কুলে শিক্ষা না নিয়েই!
