”তারপর ফিরপোয় প্রাণভরে খেলি!”
”না।” বলেই বেজা পেছন ফিরে দ্রুত হাঁটতে শুরু করল। জহর তার পিছু নিলেন। বেজার প্রাণভরে খাওয়া কেন হল না সেটা জানার জন্য কৌতূহল তাঁর ঘাড়ে ভর করেছে।
”বেজা বেজা, শোন শোন।” জহর ডাকলেন।
বেজা থমকে ঘুরে দাঁড়াল। ঠোঙা থেকে বেগুনি বার করে মুখে ঢুকিয়ে চিবোতে শুরু করল। সেটা শেষ হলে আর—একটা মুখের মধ্যে গুঁজে দিল। চোখ দুটো বড় হয়ে উঠেছে দ্রুত চিবোনোর জন্য। দ্বিতীয়টি শেষ হওয়ার আগেই তৃতীয়টি বার করে হাতে ধরে রইল। জহর আর সহ্য করতে পারলেন না। বেজার হাত থেকে বেগুনিটা তুলে নিয়ে নিজের মুখে ঢোকালেন। বেজা অবাক হয়ে জহরের বেগুনি খাওয়া দেখতে—দেখতে ঠোঙাটা বাড়িয়ে ধরল, ”নে, এটা তুই শেষ কর।”
”ব্যাপার কী! তোর হল কী!” জহর ঠোঙাটা নিলেন।
”সেদিনের কথা ভাবলে আমার মাথার ঠিক থাকে না। … আমায় বলেছিল সাতটার সময় ফিরপোর বারান্দার নীচে ফুটপাথে দাঁড়াতে। আমি ঠিক সাতটায় হাজির হয়েছি। কিন্তু কানুদা আর আসে না। দু’ঘণ্টা অপেক্ষা করলুম, তবুও এল না। খিদেয় পেটে তখন ছুঁচোয় ডন দিচ্ছে।” সেদিনের বোকা বনে যাওয়ার কথা মনে পড়ে বেজার চোখে জল এসে গেল।
”তারপর কানুদার সঙ্গে দেখা হয়নি?”
”হয়েছিল। মনুমেন্টের নীচে ফুচকা খাচ্ছিল। আমায় দেখে বলল, ”খাবি নাকি?” বোঝ কী লোক! কোথায় ফিরপো আর কোথায় ফুচকা! বললাম, ‘কানুদা, এটা কী হল? আমি দু’ঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলুম।’ কী বলল জানিস? ‘খুব কষ্ট পেয়েছিস না রে? কী করব, খবর পেলুম ভাইঝিটা পরীক্ষায় ফেল করে দোতলা থেকে উঠোনে ঝাঁপ দিয়েছে, ছুটলুম হাসপাতালে, তোকে খবর দেওয়ার টাইমও পেলুম না। যাক গে, একদিন তোকে গ্র্যান্ড হোটেলে খাইয়ে দেব।”
”খাইয়েছে?”
”আজও নয়। … পানুটা ফাঁকতালে ফিফটি করে গেল।”
জহর ঠোঙাটা বাড়িয়ে ধরলেন, ‘একটা রয়েছে খেয়ে নে।”
বেজা ঠোঙাটা নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়ে হনহন করে হাঁটা শুরু করল। একটা কুকুর ছুটে গেল ঠোঙাটার দিকে।
জহর মাথা নেড়ে আবার হাতিবাগান মোড়ে ফিরে এলেন, দোকানে যাওয়ার জন্য।
.
অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য জহর ব্যাঙ্কে গেছলেন। সেখানে তাঁকে বলা হয়, এই ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট আছে এমন কোনও লোকের সুপারিশ লাগবে। জহর তো ফাঁপরে পড়লেন চেনাশোনা কে আছে যার এই ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট আছে! ভাবতে—ভাবতে মনে পড়ল তাঁর এক খদ্দের, প্রতাপ দাস, তাঁকে একটা চেক দিয়েছিল। এই ব্যাঙ্কেই তার অ্যাকাউন্ট। সে এখান থেকেই চেকটা ভাঙিয়ে টাকা তোলে। প্রতাপ তাঁর খুবই চেনা। টালা পার্কের কাছে নতুন বাড়ি করার সময় জহরের দোকান থেকে সে প্রচুর জিনিস কিনেছিল। প্রতাপ একসময় বছর দুই ব্রাদার্সে ক্রিকেট খেলেছে। পরে খেলা ছেড়ে একটা নার্সিং হোম করে, একটা ছোট হোটেলও খোলে।
জহর ব্যাঙ্ক থেকেই সোজা প্রতাপের বাড়ি গেলেন। প্রতাপ তখন বাড়ি ছিল না, কখন ফিরবে তার ঠিক নেই। কিছুক্ষণ বসে থেকে ”আমি একটু ঘুরে আসছি,” বলে তিনি প্রতাপের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন। কাছেই টালা পার্ক। বিশাল মাঠ। একটা পুকুরও রয়েছে। এই মাঠে বহুবার খেলে গেছেন জহর। চার—পাঁচটা ক্রিকেট ক্লাব এই মাঠে খেলে, যদিও ক্লাবগুলোর কোনও টেন্ট মাঠে নেই। তবে তারা এখানেই নেট প্র্যাকটিস করে। নেট ও প্র্যাকটিসের জন্য দরকারি জিনিসগুলো রাখার জন্য একটা ঘর আছে, মালিও আছে। ক্লাবগুলোই টাকা দেয়, মালিরা পিচ তৈরি আর রক্ষণাবেক্ষণ করে।
এখন মে মাস, ক্রিকেট সিজনের শেষ দিক। সি এ বি লিগ শেষ হয়ে গেছে। নক আউট ফাইনাল এই সপ্তাহেই! জে সি মুখার্জি ট্রফির খেলা শুরু হবে। কোনও ক্লাবেরই আর এখন নেট প্র্যাকটিস হয় না। গত কয়েকদিন ধরে গনগনে গরম আবহাওয়া। ৩৮ থেকে ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে কলকাতা ভাজা—ভাজা হচ্ছে। সকাল এগারোটার পর নেহাত দায়ে না পড়লে মানুষজন বাড়ির বাইরে বেরোচ্ছে না। মাঠের পুব দিকে বড়—বড় গাছ, তাঁদের নীচে ছায়া, কয়েকটা লোক সেই ছায়ায় শুয়ে রয়েছে। প্রচণ্ড গরম সত্ত্বেও ফুরফুরে হাওয়া বইছে। ছায়ার নীচে এই হাওয়াটা খুবই আরামদায়ক, জহর একটা গাছের নীচে বসলেন।
তখন তাঁর মনে এই মাঠে খেলার নানান স্মৃতি জেগে উঠল। তিনি চোখ বন্ধ করলেন। পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে দল বেঁধে তাঁরা প্রায় দু’ মাইল হেঁটে এসে এখানে খেলতেন। খেলার জায়গা নিয়ে অন্য পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে ঝগড়া হত, মারপিটও হয়েছে। তখন তিনি হাফপ্যান্ট পরতেন। পার্চমেন্ট মোড়া কানাভাঙা একটা ব্যাট, তিনটে স্টাম্প, একজোড়া ব্যাটিং গ্লাভস আর এক জোড়া প্যাড ছিল তাঁদের সম্পত্তি। একপ্রান্তে স্টাম্প পোঁতা হত, অন্যপ্রান্তে জুতোর স্তূপ। একটা করে প্যাড দুই ব্যাটসম্যান বাঁ পায়ে পরত। গ্লাভসও ভাগাভাগি করে বাঁ হাতে পরা হত। ছালচামড়া ওঠা ক্রিকেট বল। কঠিন ছিল উইকেট কিপিং। বিনা গ্লাভসে কিপ করা যে ভয়ঙ্কর কাজ ছিল, পেছনে একটা ব্যাকস্টপার রাখতে হত। একটা রান নিলে ব্যাট দিয়ে আসতে হত স্ট্রাইকারকে। এইভাবে খেলতে গিয়ে একটা উপকার হয়েছিল। গায়ে বা পায়ে বা আঙুলে যাতে বল না লাগে সেজন্য নার্ভগুলোকে প্রখর করে হুঁশিয়ার হয়ে বলের দিকে লক্ষ রাখতে হত। নির্মল খুব ছুটে এসে জোরে বল করত। এলোমেলো বল পড়ত। কোনওটা উইকেটের দু’হাত বাইরে কোনওটা মাথার দু’হাত ওপর দিয়ে যেত, ও নিজেকে ফ্রেডি ট্রুম্যান ভাবত। তখন ট্রুম্যানের খুব নাম। একটা বল সোজা বুক লক্ষ্য করে এসেছিল। ব্যাটটা বুকের সামনে কোনওরকমে ধরতেই বলটা ডান হাতের বুড়ো আঙুলে লাগল।
