”কী রে বেজা, তেলেভাজা কিনছিস?” জহর এগিয়ে গিয়ে বললেন।
বেজা চমকে ফিরে তাকাল। হাতে ঠোঙা। জহরকে দেখে একগাল হাসল। ”পেঁয়াজি। দারুণ করে। পলতার বড়াও খুব ভাল। নে ধর।”
বেজা ঠোঙাভর্তি পেঁয়াজি এগিয়ে ধরল। জহর হাত তুলে বললেন, ”রাস্তার তেলেভাজা আমি খাই না।”
”অ।” বেজা ঠোঙাধরা হাত টেনে নিল। একটা পেঁয়াজি মুখে দিয়ে চিবোতে—চিবোতে বলল, ‘আমিও আগে খেতুম না। এসব ব্যাপারে খুব স্ট্রিক ছিলুম। শরীরের যত্ন না নিলে কি ক্রিকেটার হওয়া যায়? পরিমিত আহার হচ্ছে ফিটনেসের আসল কথা।”
”তোকে তো পরিমিত আহার করতে দেখিনি। লাঞ্চে তো সবার আগে টেবিলে গিয়ে, প্লেটে আট স্লাইস পাঁউরুটি নিয়ে তোকে বসতে দেখেছি। পাঁচ—ছ’বার মাংসের ঝোল আর আলু চেয়েছিস। সবাই একটা কলা নিয়েছে, তুই নিয়েছিস তিনটে।… আমার মনে আছে।”
”কোন ম্যাচে দেখেছিস?” বেজা ভ্রূ কুঁচকে ঠোঙায় আবার আঙুল ঢোকাল।
”আমাদের সঙ্গে স্পোর্টিং ইউনিয়নের ম্যাচে। পঙ্কজ রায় যেটায় দেড়শো করল। তোকে মেরে পানু এক ওভারে বাউন্ডারি নিল চারটে, ওভার বাউন্ডারি দুটো। এক ওভারে আটাশ রান। ভুলে গেছিস! আমি ছিলাম নন স্ট্রাইকিং এন্ডে।”
বেজার পেঁয়াজি চিবনো বন্ধ হল। খুব বড় একটা মজা পাওয়া হাসি ফুটে উঠল, ”মনে আবার থাকবে না! আসল ব্যাপারটা তো তুই আর জানিস না।”
জহরকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে বেজা তাড়াতাড়ি পেঁয়াজি গিলে ফেলে ঠোঙা থেকে আর—একটা বার করল, ”দাঁড়া, বলছি।” তেলেভাজাওলার কড়াইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ”বেগুনি ছেড়েছে… ফাস ক্লাস করে… তুই খাবি না?”
”না।”
বেজা তেলেভাজাওলার কাছে গেল। ”আমার জন্য চারটে বেগুনি তুলে রেখো।” জহরের কাছে ফিরে এসে বলল, ”খেয়ে দেখতে পারতিস। একদিন খেলে তোর এমন কিছু হবে না।”
”হবে। … তোর মতো চেহারা।”
বেজার মুখ ম্লান হয়ে গেল, ‘চেহারাটা খারাপ হয়ে গেছে, না?”
জহর জবাব দিলেন না।
”অ্যালোপ্যাথি, কোবরেজি, হোমিওপ্যাথি সব করেছি, কিছুতেই কিচ্ছু হচ্ছে না… তাই শরীর নিয়ে আর মাথা ঘামাই না, যা হওয়ার হবে। … ক’দিনই বা আর বাঁচব!” বেজার স্বর করুণ শোনাল। জহর দুঃখ পেলেন।
”হাল ছেড়ে দিয়েছিস? জীবনকে ভালবাসলে কেউ হাল ছেড়ে দেয় না। একসময় কী বোলার ছিলিস! বিষেণ বেদিকে দেখে তোর কথা মনে পড়ত। তোকে খেলতে সত্যিই ভয় করত। বড় তাড়াতাড়ি তুই মাঠ ছাড়লি।”
”কী করব, পেটের ট্রাবল এত বাড়ল যে…” বেজা কথা শেষ না করে তেলেভাজাওলার দিকে তাকাল। ”দাঁড়া, আসছি।” বলেই সে বেগুনি আনতে চলে গেল। জহর মাথা নাড়লেন। বেজার পেটের রোগ কোনওদিন সারবে না।
ঠোঙা হাতে বেজা ফিরে আসতেই জহর বললেন, ”তুই বাচ্চচাছেলে নোস। ভাল করেই জানিস তোর পেটের ট্রাবলের আসল কারণ।… তোর নোলা না সামলালে কোনওদিনই তোর রোগ সারবে না।”
”ঠিকই বলেছিস, কিন্তু সামলাই কী করে?” বেজা আন্তরিক চোখে জহরের দিকে তাকাল।
”বলব? … যা বলব করবি?”
”আগে শুনি।”
”আগের মতো শরীরটাকে খাটা। … কোনও ছোট ক্লাবে গিয়ে নেটে বল কর। ম্যাচ খেলা তো সম্ভব নয় তোর পক্ষে। আমার বিশ্বাস, ইয়াং ছেলেরা এখনও তোকে খেলতে পারবে না।”
”বলছিস!” বেজার স্বরে প্রচ্ছন্ন গর্ব।
‘হ্যাঁ বলছি। আমি তো এই সিজনেও মাঠে নেমেছি। খেলার মধ্যে থাকলে, ডিসিপ্লিনের মধ্যে থাকা যায়।” কথার শেষে জহর আচমকা বেজার হাত থেকে গরম বেগুনির ঠোঙাটা খপ করে ছিনিয়ে নিলেন।
”এটা কী হল?” বেজা হতভম্ব চোখে বলল।
”এইভাবে তুই উইকেট তুলে নিতিস ব্যাটসম্যানকে বোকা বানিয়ে।” হাসতে—হাসতে জহর ঠোঙাটা ফিরিয়ে দিলেন, ”ভয় নেই, বেগুনি থেকে তোকে বঞ্চিত করব না। কেউ মরতে চাইলে তাকে আটকানো যায় না। কত উপায় রয়েছে… গলায় দড়ি, ট্রেনের সামনে ঝাঁপ, গায়ে আগুন, গলায় কলসি বেঁধে জলে ঝাঁপ, কতরকমের বিষ, তেমনই বেগুনি, পেঁয়াজি।”
”ঠাট্টা করছিস?” বেজা ঠোঙাটা নাকের কাছে এনে জোরে শ্বাস টানল। ”ঠিকই বলেছিস, নোলা আমার একটু বেশিই। ওই যে বললি এক ওভারে আটাশ রান, সেটাও ওই নোলার জন্য।” বলে বেজা মিটিমিটি হাসতে লাগল।
‘ব্যাপারটা কী, বল। হঠাৎ পানু বেধড়ক মারতে শুরু করে দিল তোর লংহপ আর শর্ট পিচ বল পেয়ে, ওভাবে বল ফেলেছিলিস কেন?” জহর জানতে চাইলেন।
”পঙ্কজদা সেঞ্চুরি করল, আমাদের রান হল ২৬০…”
”দুশো ঊনষাট … দুশো ষাট করলে জিততুম।” জহর ভুল ধরিয়ে দিলেন।
”ব্রাদার্স আট উইকেটে ১৭০ … ঠিক বলছি তো?”
”হ্যাঁ। তখন আমি ৭০ ব্যাট করছি ম্যাচ হারছি, তখন নামল পানু, সবে টিমে এসেছে। ওকে তো তুই এক বলেই তুলে নিতে পারতিস!”
”পারতুম। তুলিনি একটা ব্যাপারে। লাঞ্চের সময় যখন খাচ্ছি তখন কানুদা, ওই যে রে গাল তোবড়ানো, পাকা চুল, ধুতি—পাঞ্জাবি পরা কানু ভটচায, পানুর চামচাটা, আমার পেছনে দাঁড়িয়ে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল, ‘কী শুকনো পাউরুটি ঝোলে ডুবিয়ে চিবোচ্ছিস, ফিরপোয় খাবি?’ বললুম, ‘কে খাওয়াবে?’ বলল ‘আমি।’ অবাক হয়ে গেলুম। হঠাৎ আমাকে ফিরপোয় খাওয়াবার ইচ্ছে হল কেন এই ধূর্ত লোকটার! নিশ্চয় কোনও মতলব আছে। বলল, ‘খাওয়া শেষ হলে একটু বাইরে আয়।’ কিছুক্ষণ পর টেন্টের বাইরে এসে দেখি কানুদা আর পানু ফেন্সের কাছে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। আমাকে দেখে পানু সরে গেল। কানুদা বলল, ‘বেজা একটা কাজ করে দিতে হবে, কানুকে একটা ফিফটি পাইয়ে দে। নতুন ছেলে, খুব ইচ্ছে পঙ্কজ রায়ের সেঞ্চুরির পালটা একটা ফিফটি করার, কাগজে নাম বেরোবে… কিছুই তোকে করতে হবে না শুধু লেগ স্টাম্পের বাইরে গোটাকতক শর্ট পিচ আর ফুল টস… বাকিটা ও ম্যানেজ করে নেবে। পারবি না? আজ সন্ধেবেলায়ই তা হলে ফিরপোয়… তোর যা প্রাণে চায়।’ শুনে বলব কী, লোভে পড়ে গেলুম। অত বড় হোটেলে খাওয়া, তাও আবার যা প্রাণে চায়। ম্যাচ তো জিতবই, ফিফটিই করুক আর সেঞ্চুরিই করুক। রাজি হয়ে গেলুম। তবে এটাও বলে রাখি, ফিফটি হলেই কিন্তু আর শর্ট পিচ নয়।”
