”কিন্তু সবাই নয়, শুধু ওরাই। সবাই কি গাওস্কর বা কপিল হতে পারে? তবে ক্রিকেট ছেড়ে দিয়ে পৈতৃক ব্যবসায়ে এসে আমি এখন যত টাকা রোজগার করছি সেটাও কিছু কম নয়। যাকগে ওসব কথা, চলো খেতে বসি।”
ঘণ্টাখানেক পর জহর পাল যাওয়ার জন্য যখন দরজার দিকে এগিয়েছেন, ঘুনু তখন ডাকল, ”জহরদা, তোমার ছেলের জন্য একটা ছোট্ট উপহার…. না বলতে পারবে না।”
ঘুনুর হাতে একটা খাম। বিস্মিত জহর খামটা নিয়ে খুললেন। ভেতরে একটা চেক। তাঁরই নামে। পাঁচ হাজার টাকা।
হতভম্ব জহরের মুখ থেকে বেরিয়ে এল, ”এসব কী!”
”বলেছি, না বলতে পারবে না। … আর এই নাও আমার কার্ড। যখনই যা কিছুর দরকার হবে, আমার ফ্ল্যাটে কি অফিসে ফোন করবে। অফিস এই গড়িয়াহাট রোডেই। বেলা হয়ে গেছে, বাড়িতে ভাবছে। এই দুপুরে খেয়েদেয়ে আর বাসে উঠো না। নীচে ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছে, পৌঁছে দিয়ে আসবে।”
জহর পালের দু’চোখ জলে ভরে এল আর সেই জল চোখ থেকে উপচে নামল লিফটে করে নামার সময়।
.
জহর পালের সংসারে আছে স্ত্রী মীরা, এক ছেলে ও এক মেয়ে, মানিক ও মণিকা। অবনীর দেওয়া চেকটা দেখে ওরা অবাক হল, তারপর কৃতজ্ঞতায় মন ভরে গেল। মীরা বললেন, ”এই যুগে এমন মানুষ পাওয়া ভাগ্যের কথা। কত বছর আগে একটু উপকার পেয়েছিল সেটা মনে করে রেখেছে!”
মণিকা বলল, ”আর প্রাণকৃষ্ণর ব্যবহারটার কথা ভাবো? চার হাজার ন্যায্য টাকা, সেটা দিতে অস্বীকার করল! লোকটা চামার।”
”লোকটা উন্নতি করবে।” মানিক বলল। তারপর সে জহরকে বলল, ”বাবা, এটা তো অ্যাকাউন্ট পেয়ি ক্রস চেক, তোমার তো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নেই!”
শুনেই জহরের মাথায় বাজ ভেঙে পড়ল। তিনি আমতা—আমতা করে বললেন, ”এটা ব্যাঙ্কে দিলে টাকা দেবে না?”
”না, তোমার নিজের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা দিতে হবে। তুমি বরং ঘুনুবাবুকে এটা ফেরত দিয়ে একটা বেয়ারার চেক চেয়ে নাও।”
ব্যাঙ্কে বছর দশেক আগে জহরের অ্যাকাউন্ট ছিল। দোকানের জন্য খুব জরুরি প্রয়োজনে সব টাকা তুলে নিয়ে অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেন। তাঁর যে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নেই, এ—কথা ঘুনুর কাছে বলতে তাঁর মর্যাদায় বাধবে। তিনি জানেন, বাজারের মাছওয়ালারও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আছে। বাজারের গেটে ফুলের দোকানদারের হাতবাক্সের মধ্যে ব্যাঙ্কের পাশবই দেখেছেন। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নেই বললে ঘুনুর চোখে হয়তো তিনি ছোট হয়ে যাবেন। নাও ছোট হতে পারেন, ঘুনু তেমন ধরনের মানুষ নয়। জহর পালের মনে একটা খচখচানি শুরু হল।
”দরকার কী আবার ঘুনুকে বিরক্ত করে! তার থেকে একটা নতুন অ্যাকাউন্ট খুলে ফেললেই হয়।” জহর সবার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলেন, ”কখন কাজে লাগবে বলা যায় না তো!”
উত্তর কলকাতায় হাতিবাগান বাজারে জহরের হার্ডওয়্যারের দোকান। দোকানে স্ক্রু, পেরেক, কবজা, ছিটকিনি ইত্যাদি ছাড়াও, উনুন, হাতা, খুন্তি, কড়াই অ্যালুমিনিয়ামের বাসনপত্রও পাওয়া যায়। খুব চালু দোকান। দোকানের বয়স ষাট, পৈতৃক সূত্রে পাওয়া। তাঁর বাবাই দোকানে বসতেন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত। জহর স্কুল আর মাঠ করে বেড়াতেন সারাদিন। সন্ধ্যায় দোকানে এসে বাবাকে যতটা সম্ভব সাহায্য করতেন। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে তিনিই দোকান চালাচ্ছেন। ক্রিকেট খেলার জন্য তাঁকে যে দিনগুলোয় ময়দানে যেতে হয় সেই দিনগুলোয় সন্ধ্যা পর্যন্ত দোকানে থাকতে পারেন না। অগত্যা তাঁকে একটি লোক রাখতে হয়েছে। পাড়ারই গরিব একটি কিশোর ছেলে নন্দ, অর্থাৎ নাদু। ছেলেটি বুদ্ধিমান, সৎ, বিশ্বস্ত।
সে একাই প্রায় দোকান চালায়, হিসাবপত্তর রাখে।
দোকান থেকেই মোটামুটি সংসার চলে যায়। জহর ভাবলেন, ক্রিকেট আর তিনি খেলবেন না। এখন তাঁর যা বয়স তাতে এবার দোকানে মন দেওয়া উচিত। ব্রাদার্স ইউনিয়ন আর তাঁকে খেলাবে না। সেটা বোঝাই গেছে পানুর কথাবার্তা থেকে। ছোটখাটো ক্লাবে খেললে শরীর আর মনের ওপর ধকল পড়বে। দরকার কী আড়ালে—আবডাল ছেলে—ছোকরাদের টিপ্পনি শুনে। আগের মতো ছুটতে পারেন না। রানিং বিটুইন দ্য উইকেটস যথেষ্ট স্লো। রান আউট করেছেন তাঁর পার্টনারকে গত দু’বছরে চারবার। চোখটা ভাল আছে এই যা রক্ষে!
বিকেলে দোকানে যাওয়ার পথে হাতিবাগান মোড়ে পৌঁছে জহর রাস্তা পার হওয়ার জন্য দাঁড়ালেন। ভনভন করছে অটো রিকশা, তার সঙ্গে বাস, মিনিবাস আর ট্রাম। রাস্তা পার হওয়ার ফুরসত পাওয়া যায় না। হতাশ হয়ে এধার—ওধার তাকাতেই তাঁর চোখে পড়ল ফুটপাথের তেলেভাজাওলাকে। উনুন, কড়াই, বারকোশ, বেসন গোলা, গামলা ইত্যাদি নিয়ে দোকান দিয়ে বসেছে ফুটপাথের কিছুটা দখল করে, সাঞ্চায় গরম—গরম পেঁয়াজি আর বেগুনি তুলে রাখছে একটা ঝুড়িতে। তারপর সেগুলো ঢেলে রাখছে বারকোশে। কয়েকজন খদ্দের দাঁড়িয়ে, হঠাৎই জহরের চোখ পড়ল একজনের ওপর। আরে, বেজা না?
বেজা—র ভাল নাম ব্রজেন হালদার। জহরের আমলের ক্রিকেটার, বাঁ হাতে স্পিন করাত, চমৎকার ফ্লাইট ছিল, ক্লাব—ক্রিকেটে বছর—বছর প্রচুর উইকেট পেত। মোহনবাগান, স্পোর্টিং ইউনিয়নে খেলেছে। দোহারা গড়ন, লম্বা চেহারা। জহর অনেকবার লিগে ওর বল খেলেছেন। প্রায় পঁচিশ বছর আগের কথা, বেজার সঙ্গে জহরের সখ্যও ছিল। বছর দশেক আগেও এই মোড়ে তাঁদের দেখা হয়েছিল কিন্তু তখন বেজার এমন চেহারা তো ছিল না। লম্বা চেহারাটা দেখাচ্ছে হাড়গিলের মতো। সরু গলা, বুকটা চুপসে গেছে, হাত দুটো পাটকাঠির মতো। গালদুটো তোবড়ানো। অস্বাভাবিক লম্বা নাকটা দেখেই জহর চিনতে পারলেন।
