জহর চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। বিরু ঘোষকে জিজ্ঞেস করলেন, ”ছেলেটা কে?”
”অবনী রায়। আজই এসেছে। খুব বড়লোক, ডুয়ার্সে বাবার চা—বাগান আছে।”
”বোধ হয় বড়লোক বলেই এমন উড়নচণ্ডে, বেহিসেবি। জড়তা নেই। … কিন্তু ক্রিকেটটা তো হিসেবের খেলা, ডিসিপ্লিনের খেলা।” কথা শেষ করে তিনি এগিয়ে গেলেন নেটের দিকে।
”ন্যাপলা বলটা আমায় দে।”
নেপাল তার হাতে বলটা দিয়ে কৃতজ্ঞ চোখে তাকাল। জহর পাল স্লো অফব্রেক বল করেন। ফ্লাইটই তাঁর বলের বিশেষত্ব, স্পিন করে কম। তাঁর বল করা দেখে অনেকেই মুচকে হাসে। এত উঁচুতে লোপ্পাই করে তুলে বল করেন যে, ব্যাটসম্যান মুখ তুলে ফ্লাইটের দিকে তাকিয়ে থাকতে—থাকতে দোনামনা হয়ে যায়। ছয় মারবে না চার মারবে সেটা ঠিক করে ওঠার আগেই আবিষ্কার করে—ক্রিজ থেকে সে এক পা বেরিয়ে এসেছে এবং তার চালানো ব্যাটের কানা ঘেঁষে বলটা পেছনে চলে গিয়ে স্ট্যাম্পে লেগেছে নয়তো উইকেটকিপার তাকে স্টাম্পড করেছে। ময়দানে এই বল ‘জর্দা বল’ নামে খ্যাত। বহু বিখ্যাত ব্যাটসম্যান জর্দা বলে মুখচুন করে ক্রিজ থেকে ফিরে এসেছে।
জহর পাল তাঁর প্রথম জর্দা বলের টোপটা দিলেন থ্রি—কোয়ার্টার লেংথে। ছেলেটি লাফিয়ে দু’পা বেরিয়েই থমকে গিয়ে পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। তার চালানো ব্যাটের পাশ দিয়ে অফ স্ট্যাম্প ঘেঁষে বলটা বেরিয়ে গিয়ে জালে লাগল। ছেলেটি জালের দিকে তাকিয়ে থেকে তারপর জহর পালের মুখের দিকে তাকাল।
এগিয়ে এসে জহর পাল বলেন, ”পেছনে উইকেটকিপার থাকলে কী হত জানো?” আঙুল তুলে তিনি টেন্টটা দেখিয়ে দিলেন। কিশোরের গৌরবর্ণ মুখ লাল হয়ে উঠেছিল। এর পর তিনি বারোটা বল করেন। তিনটে তারাবাজি হয়, তিনটে ফরওয়ার্ডে ডিফেন্সিভ খেলে, বাকিগুলি কাল্পনিক সিলি পয়েন্টের, স্লিপ ফিল্ডারের ও উইকেটকিপারের কাজের আওতায় চলে যায়।
আধ ঘণ্টা পর ছেলেটি কিট ব্যাগ হাতে যখন টেন্ট থেকে বেরোচ্ছে জহর পাল মালিকে দিয়ে তাকে ডেকে পাঠান।
”ভাল আই সাইট, ভেরি গুড ফুট ওয়ার্ক অ্যান্ড টাইমিং… কিন্তু শেষপর্যন্ত হলটা কী?”
ছেলেটি বিব্রত অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকে। মুখে কথা নেই।
”চারবার স্টাম্পড আর কট! রান ছয় কি বারো। … বারো—চোদ্দোর বেশি রান জীবনে হবে না। নেটে ব্যাট করা আর মাঝখানে গিয়ে ব্যাট করায় অনেক তফাত। মাঝখানে এগারোটা লোক তোমাকে খতম করার জন্য অপেক্ষা করবে। … ক্রিকেট হল ধৈর্যের খেলা।”
জহর তীক্ষ্ন চোখে ছেলেটির মুখ লক্ষ করে সুখ বোধ করে ছিলেন। কথাগুলো মনে ভাসছে বলে তাঁর মনে হয়েছিল।
”কাল থেকে নেটে ডিফেন্স করবে। আমি থাকব। ব্যাটিংটা তোমায় শিখতে হবে। কাল ঠিক তিনটেয় এসে মাঠটা আগে দশ পাক দৌড়বে তারপর ফ্রি হ্যান্ড ব্যায়াম করবে।… মনে থাকবে?”
দিনের পর দিন অবনী তাই করেছিল। আর জহরও আকাঁড়া হীরকখণ্ডটিকে কেটেকুটে পালিশ করে উজ্জ্বল এক রত্নে পরিণত করার জন্য মনপ্রাণ ঢেলে দেন। অবনী চারটে রনজি ম্যাচে দুটো শতরান আর একটা পঞ্চাশ করে। ওকে সম্ভাব্য টেস্ট খেলোয়াড় বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে যখন তখনই আচমকা সে ক্রিকেট ছেড়ে কলকাতা ছেড়ে চলে যায় ডুয়ার্সে তাদের চা—বাগানে। জহর তখন দুঃখে, হতাশায় ভেঙে পড়েছিলেন। ছুটে গেছলেন অবনীর বাবা রজনী রায়ের কাছে।
”এ আপনি কী করলেন সার। শুধু বাংলাকে নয়, ভারতকেও বঞ্চিত করলেন, একটা দারুণ ব্যাটসম্যানকে আমরা হারাব।”
”জহরবাবু, আমাকেও তো ছেলের ভবিষ্যতের দিকটা ভাবতে হবে। আমার হাঁপানির অসুখ, আর আমি ব্যবসা দেখতে পারি না, ছোটাছুটির ধকল নেওয়ার মতো শরীরের অবস্থা নয়, ভাইদের মধ্যে ঘুনুই বড়, ওকেই বিষয়সম্পত্তি, ব্যবসা দেখতে হবে। আমি চাই এখন থেকেই ঘুনু সব বুঝেশুনে নিক। …. আর ক্রিকেট খেলে হবেটাই বা কী? একটু সম্মান, একটু পরিচিতি দু—চার বছর পর লোকে তাও ভুলে যাবে। যদি বুঝতাম অনেক টাকা পাবে, তা হলেও নয় কথা ছিল। টেস্ট খেলে ক’টাকা পায়? ম্যাচ পিছু সাড়ে সাতশো টাকা! তার থেকে ঘুনু একশোগুণ আয় করতে পারবে বছরে, যদি ব্যবসায়ে এখনই ঢোকে। … মাপ করবেন জহরবাবু, আর ক্রিকেট নয়। যা খেলেছে তাই যথেষ্ট। ক্রিকেট থেকে ঘুনুর পাওয়ার কিছু নেই।”
জহর পাল সোফায় হেলান দিয়ে চোখ বুজে। কানে বাজছে রজনী রায়ের কথাগুলো। ‘ক্রিকেট থেকে পাওয়ার কিছু নেই।’ প্রায় তিরিশ বছর আগের কথা। রজনী রায় বলতেই পারেন, সত্যিই তখন টাকা ছিল না ক্রিকেটে। ক্লাব থেকে একটা পয়সাও পাওয়া যেত না, বাংলার হয়ে খেললেও নয়, টেস্ট আর ক’টা খেলবে, কুড়ি—পঁচিশটা বড়জোর! হাজার দেড়েক রান আর তিন—চারটে সেঞ্চুরি, এমন রেকর্ড তো কত প্লেয়ারেরই আছে, লোকে তাদের মনেও রাখেনি। লোকে কি জহর পাল নামটাও মনে রেখেছে? অথচ এখনও তো তিনি ক্লাব ক্রিকেট খেলে যাচ্ছেন। ব্যাটিং অর্ডারে তলার দিকে, রান পান না।
”জহরদা কি ঘুমিয়ে পড়লেন?” তোয়ালে দিয়ে ভিজে চুল ঘষতে—ঘষতে ঘরে ঢুকল ঘুনু।
”ঘুমোইনি। ভাবছি। তোর বাবা যে কথাগুলো বলেছিলেন সেগুলো মনে পড়ে গেল।”
”কী কথা?”
”ক্রিকেট থেকে কিছুই পাওয়ার নেই। এখন হলে তিনি আর ওসব কথা বলতেন না। গাওস্কর, কপিলদেব শুনেছি কোটি টাকার ওপর ব্যবসা করছে।”
