”হ্যাঁ বললাম।’ জহর পাল ঘুরে দাঁড়ালেন। ”তোর অনেক টাকা, কিন্তু শুধু টাকা দিয়ে ক্রিকেটে সম্মান জেতা যায় না। যদি কখনও দিন আসে তোকে সেটা বুঝিয়ে দেব। মনে রাখিস।”
জহর পাল ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। বাইরে কুকুর দুটো ঘেউ—ঘেউ করে উঠে চুপ করে গেল।
”যত্তসব বড়—বড় কথা।” ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে কানু ভটচায বলল, ”হ্যাঁ, যা বলছিলুম, চারটে ম্যাচ খেলে দেবে মাণ্টু সিং, চল্লিশ হাজার চেয়েছে। ওকে কী বলব পানু?”
.
প্রাণকৃষ্ণর বাড়ি থেকে বেরিয়ে জহর পাল শরৎ বসু রোড ধরে হেঁটে এসে রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ে এলেন। ওপারে দেশপ্রিয় পার্ক। তিনি যখন রাস্তা পার হচ্ছেন তখন একটা মারুতি গাড়ি ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়ল তাঁর থেকে পাঁচ মিটার দূরে। জহর চমকে তাকালেন।
চোখে সানগ্লাস, ড্রাইভিং সিটে বসা লোকটা তাঁর দিকে তাকিয়ে হাসছে। জহর পালের চেনা—চেনা মনে হল, কিন্তু পুরোপুরি চিনে উঠতে পারলেন না।
জানলা দিয়ে মুখ বার করে লোকটা বলল, ”জর্দা, আমি ঘুনু, অবনী। এত বেলায় এ—পাড়ায়?”
জহর গাড়ির কাছে এগিয়ে এলেন। ”ওহ, ঘুনু…! …এই একটা কাজে এসেছিলাম। তোকে তো আর চেনাই যাচ্ছে না, কী মোটা হয়ে গেছিস!”
”উঠে এসো। বহু বছর পর…. তুমি কিন্তু একটুও বদলাওনি।”
জহর গাড়ির দরজা খুলে ঘুনুর পাশে বসলেন।
”কোথায় যাচ্ছিস?’
”বাড়ি, মানে ফ্ল্যাটে। চলো একটা ঠাণ্ডা খাবে।”
”এই দুপুরে?”
”তাতে কী হয়েছে, দুটো পুরনো দিনের কথা হবে, ভাতও খাবে।”
”আবার ভাত—টাত কেন!”
”আগে চলো তো। ক্রিকেট তো তোমার হাতেই শিখেছি, তুমিই আমার গুরু। গুরুকে দুটো ভাত খাওয়াব, এ আর এমন কী!”
কথা বলতে—বলতে ঘুনু গড়িয়াহাট মোড়ে পৌঁছে গাড়ি বাঁ দিকে ঘুরিয়ে গড়িয়াহাট রোড ধরল।
”তুই তো থাকতিস হিন্দুস্থান রোডে, এদিকে যাচ্ছিস যে?”
”বাবা মারা গেছেন। ভাইবোনেদের মধ্যে সম্পত্তি ভাগাভাগি হয়ে গেছে। বাড়ির অংশ না নিয়ে আমি চা—বাগানগুলো আর কিছু শেয়ার নিয়েছি। ফ্ল্যাট কিনেছি দু’বছর হল। এতকাল চা—বাগানেই কাটিয়েছি।”
”চায়ের ব্যবসা করছিস?”
”হ্যাঁ। এক্সপোর্ট করি। মাছের ব্যবসাও ধরেছি, চিংড়ি চালান দিচ্ছি।”
একটা সাততলা বাড়ির গেট দিয়ে ঘুনু গাড়ি ঢোকাল। জহরের মনে হল, এই বাড়ির এক—একটা ফ্ল্যাটের দাম বারো—চোদ্দো লাখ টাকার কম হবে না। পাঁচতলায় উঠে লিফট থেকে বেরিয়েই সামনে দরজা। বেল বাজাতেই দরজা খুলল পরিচ্ছন্ন প্যান্ট ও হাওয়াই শার্ট পরা ভৃত্য। জহরের মনে হল ওর পোশাক তার থেকে দামি কাপড়ের। বিশাল বসার ঘরের আসবাব, ছবি, কার্পেট ইত্যাদি দেখে জহর অবাক। ঘুনু যে রীতিমতো ধনী তাতে কোনও সন্দেহ রইল না তার। অবশ্য ঘুনু যখন ব্রাদার্সে প্রথম খেলতে আসে, তখনই সে ‘বড়লোকের ছেলে’ বলে ক্লাবে পরিচিত ছিল। ওদের বাড়িটা ছিল বাগানওলা একতলা বাংলো ধরনের। বালিগঞ্জের পুরনো বাসিন্দা। দু’খানা মোটরগাড়ি আর জনাচারেক কাজের লোক, মালি।
‘জহরদা, বাড়িতে ভাববে না তো?”
”ভাববে পানু নিশ্চয়ই ভাত খাওয়াচ্ছে, তাই দেরি হচ্ছে। পানু যে কী জিনিস সেটা আর তো বউদিকে জানাইনি।”
”তুমি পানুর বাড়িতে গেছলে? ও তো এখন ক্লাবের ভাইস—প্রেসিডেন্ট।”
”পেছলাম দায়ে পড়ে।”
এর পর জহর পাল সংক্ষেপে তাঁর যাওয়ার কারণটা বললেন। তার মধ্যেই ঠাণ্ডা নরম পানীয় এল, সব শুনে ঘুনু বলল, ”পানুটা আর বদলাল না, সেই নেমকহারামই রয়ে গেল। দু’বছর ব্রাদার্সের ক্যাপ্টেন ছিল। দেখেছি তো, মাঠে আসল ক্যাপ্টেন তো ছিলে তুমিই। কখন কাকে বল দিতে হবে, কীভাবে বল করতে হবে, বোলারকে লাইন—লেংথ বুঝিয়ে দেওয়া, ফিল্ড সাজানো, বদলানো সবই তুমি ওকে বলে—বলে দিতে। আমরা তাই নিয়ে হাসাহাসি করতাম, ওর কিন্তু গায়ে লাগত না। জহরদা, মনে আছে মোহনবাগান ম্যাচটায় ওর হাফসেঞ্চুরি করাটা?”
জহর স্মিত হেসে মাথা নাড়লেন।
”আমি এবার চান করব, তুমি করবে?”
”না, তুই করে আয়। ফ্ল্যাটটা বড় চুপচাপ, ফাঁকা—ফাঁকা লাগছে।”
”তার কারণ, আমি আর কাজের ছেলেটা ছাড়া আর কোনও বাসিন্দা নেই। বিয়ে করিনি।” বলেই ঘুনু ভেতরে চলে গেল।
একা বসে জহর পাল ঘুনুর কথা ভাবতে—ভাবতে বছর তিরিশ আগের একটা দিনে ফিরে গেলেন। ওকে প্রথম দেখেন মাঠের বাইরে চেয়ারে বসে। সঙ্গে ছিলেন ক্রিকেট সেক্রেটারি। বিরু ঘোষ। ব্যাট করছে সুদর্শন এক কিশোর। বল করছে তিনজন। জহর কথা বলায় ব্যস্ত থাকায় নেটের দিকে বিশেষ নজর দেননি। একবার মুখ ফিরিয়ে দেখেই চমকে উঠলেন। বল করল নেপাল চ্যাটার্জি, তখন বাংলার সবথেকে জোরে বোলার। ভাল লেংথে অফস্ট্যাম্পে বল পড়ল। ছেলেটা পলকের মধ্যে এক—পা বেরিয়ে এসে ব্যাট চালাল। আকাশে সোজা তারাবাজির মতো বলটা উঠে গেল। অন্তত আশি—নব্বই মিটার দূরে বলটা নেমে এল। নেপাল কোমরে হাত রেখে অবিশ্বাসভরা দৃষ্টিতে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে।
কী ফুটওয়ার্ক! কী টাইমিং! জহর তাকিয়ে রইলেন। পরের বলটা করল বাঁ হাতি স্পিনার অরুণাভ। ছেলেটা এক—পা, দু’পা এগিয়ে এসে ব্যাট চালাল। আবার তারাবাজি লং অনে। বলটা যে কোথায় গেল সেদিকে ভ্রূক্ষেপও করল না। এমন একটা ভাব ওর ভঙ্গিতে ফুটে রয়েছে, যেন ব্যাটকে দিয়ে যে কাজ করাতে হয় সেইটাই করিয়েছে এতে বাহাদুরির কিছু নেই। পর—পর ছ’টা বলে ছ’টা তারাবাজি হল। বোলারদের বিভ্রান্ত মুখ, কিছুটা অপমানিতও। বিশেষ করে নেপাল। তার চারটে বল কুড়িয়ে আনতে হয়েছে রেড রোড থেকে।
