”তা ছাড়া আপনাকে একটা ব্যাট দিয়েছি, সামান্য পুরনো হলেও ইংলিশ উইলোর ব্যাট। ওটারই দাম এখন চার হাজার টাকা তো হবেই। ওটা বিক্রি করুন।”
”না।” জহরের গলা দিয়ে আতঙ্কিত আর্ত চাপা স্বর বেরিয়ে এল।
”ব্যাট বেচতে পারব না।”
”তা হলে আর আমি কী করতে পারি। আপনার সঙ্গে লিখিত চুক্তি হয়েছিল কি?” প্রাণকৃষ্ণ এক চোখ বন্ধ করে অন্য চোখে তির্যক দৃষ্টিতে তাকাল।
”সুবলের সঙ্গে মুখে কথা হয়েছিল।” জহর তাকালেন সুবলের দিকে।
”কী জানি মনে পড়ছে না কত টাকার কথা বলেছিলুম। … পাঁচ হাজার কি?” সুবল ভুরু কুঁচকে মনে করার চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
”পানু, শুধু ঊনত্রিশটা রানই দেখলে? কোন সিচুয়েশনে ক’ নম্বরে নেমে রানগুলো করেছি, সেসবও ভাবো। ইস্টবেঙ্গল ম্যাচে সাতটা উইকেট পড়ে যাওয়ার পর নামি, তখন মাত্র তিন ওভার বাকি। জিততে হলে দরকার সত্তর রান। আদার এন্ডে পর পর দুটো উইকেট পড়ে গেল। বাকি উইকেটটা নিলেই ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ জিতে যায়। দু’দিকে বল করছে টেস্ট বোলার দিল্লির রঞ্জিত শর্মা আর বাংলার রনজি বোলার সুধীর দত্ত। হাবলা ব্যাট করতে এল, দেখি ওর হাত কাঁপছে। এইসময় তুমি কী আশা করো?”
জহর পাল থেমে গিয়ে সবার মুখের দিকে তাকালেন। তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে সুবল গাল চুলকোল। প্রাণকৃষ্ণ বুকের কাছে দুই করতল জড়ো করে নিঃশব্দে তালি দিচ্ছে। কানুদা ধুতির কোঁচা পাট করছেন গভীর মনোযোগে। কেউ জহরের প্রশ্নের জবাব দিল না।
”লাকিলি হাবলা ব্যাট করতে আসে ওভারের ফার্স্ট বলে উইকেট পড়তে, ওকে আর একটাও বল ফেস করতে হয়নি। শর্মার ওভারের লাস্ট বলে একটা রান নিয়ে ওধারে যাই। তারপর ম্যাচের লাস্ট ওভার। সবক’টা বল আমিই খেলে দিই। ওই আটটা রানের দাম কি সংখ্যা দিয়ে কষা যায়? ব্রাদার্সের মান তো বেঁচেছিল। তারপর….।”
জহর পাল প্রাণকৃষ্ণর দিকে তাকালেন জিজ্ঞাসু চোখে।
প্রাণকৃষ্ণ বুকের কাছ থেকে হাতদুটো নামিয়ে বলল, ”ব্যাটটা আমি সেদিন আপনাকে দিয়েছিলুম। তবে ম্যাচটা হেরেছি।”
”কিন্তু জহর, এবার পানু যা টিম করছে, তাতে তোর জায়গা নেই। ম্যাচ ড্র করার জন্য প্লেয়ার এবার আর ব্রাদার্সে পানু রাখবে না।” কানু ভটচায ধীর গলায় কথাটা বলে প্রাণকৃষ্ণর দিকে তাকাল। ”তাই কি না?”
প্রাণকৃষ্ণ সম্মতিসূচক মাথা হেলাল।
”যাদের সঙ্গে লিখিত চুক্তি হয়েছিল তাদের সবাইয়ের পাইপয়সা পর্যন্ত মিটিয়ে দিয়েছি। মৌখিক চুক্তি যাদের সঙ্গে তাদেরও যা দেওয়ার দেওয়া হয়ে গেছে। জহরদা আপনি এবার আসতে পারেন।” প্রাণকৃষ্ণ মাপা স্বরে কথাগুলো বলল।
জহর পালের কালো মুখটা শুকিয়ে গেল। আঙুলে ধরা খামটা কেঁপে উঠল।
”তা হলে টাকা পাব না? আমার যে ভীষণ দরকার।”
”জহরদা, অন্য কোথাও থেকে বরং জোগাড় করে নাও।” সুবল বলল।
জহর পালের বুক থেকে উঠে এল হতাশার দীর্ঘশ্বাস। আপন মনেই বললেন, ”কোথায় জোগাড় করব। …. পানু, তোর দুটো হাত ধরে বলছি টাকাটা আমায় দে। চার হাজার টাকা তোর কাছে তো হাতের ময়লা।” কথাটা বলে জহর পাল এগিয়ে এলেন প্রাণকৃষ্ণর দিকে দু’হাত বাড়িয়ে।
”থাক থাক, আর হাত—পা ধরতে হবে না। ব্রাদার্সের জন্য আমি দানছত্তর খুলে বসিনি। আপনি আসুন। আপনার জন্য আমি অনেক করেছি। এখনও যে ময়দানে ব্যাট হাতে নামার সুযোগ পাচ্ছেন সে তো আমারই জন্য। আপনার সময়ের ক্রিকেটাররা কবে মাঠে আসা ছেড়ে দিয়েছে আর আপনি আজও চালিয়ে যাচ্ছেন।” প্রাণকৃষ্ণ তিক্ত স্বরে বলল। ”এখন যা করছেন, সেই দোকান মন দিয়ে করুন, ভজন কেত্তন করুন, ছেলেকে মানুষ করুন।”
”আচ্ছা জহরদা, তুমি তো রনজি ট্রফিতে পাঁচ—ছ’টা ম্যাচ খেলেছ, একটা হান্ড্রেড, দুটো ফিফটিও আছে। তুমি তো ক্রিকেটটা বোঝো?” সুবল সামনে ঝুঁকে সিরিয়াস গলায় বলল। ”কিন্তু এটা কি বোঝো না, ক্রিকেট এখন একদম বদলে গেছে। ঘণ্টা ধরে খেলার বদলে এখন ওভার ধরে খেলা হয়। এখন আর ঠুকুস—ঠুকুস করে ব্যাটা করা চলে না, এখন ‘ধর তক্তা মার পেরেক’ করে খেলতে হয়? এখন তোমার মতো কপিবুক ক্রিকেটার দিয়ে আর ম্যাচ জেতা যাবে না।”
”সুবল, আমার সময়ের কপিবুক ক্রিকেট দিয়েই সেদিন ইস্টবেঙ্গলের এগেনস্টে ম্যাচটা ড্র করিয়েছিলাম। কিছুমাত্র ক্রিকেট যদি বুঝতিস তা হলে যে বারোটা বল সেদিন খেলেছিলাম সেগুলো মনে করার চেষ্টা কর। ধর তক্তা মার পেরেকরা ওই বারোটার দুটোও সামলাতে পারত না। ব্যাটিংটা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে শিখেছিলাম। আজ দিল্লি—বম্বে থেকে প্লেয়ার ভাড়া করে আনতে হয়, কেন?” জহর পাল উত্তেজিত হয়ে ঘরের সবার মুখের ওপর দিয়ে চোখ বুলিয়ে প্রাণকৃষ্ণর ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন।
”তোরাই বাঙালি ছেলেদের শিখতে দিলি না ক্রিকেট কাকে বলে। … দরকার নেই আমার চার হাজার টাকার, মরুক আমার ছেলে… কিন্তু পেনো তোকে আজ বলে যাচ্ছি, ভুল জায়গায় টাকা ছড়াচ্ছিস। ক’টা ট্রফি জিতলেই কেউকেটা হওয়া যায় না। বাংলার ক্রিকেটের জন্য পাকাপোক্ত কিছু কাজ কর। তোর সম্মান অনেক বাড়বে যদি ব্রাদার্সের দুটো ছেলে ইন্ডিয়া টিমে ঢুকতে পারে।”
উত্তেজনায় থরথরে গলায় কথাগুলো বলে জহর পাল ঘুরে দাঁড়াল বেরিয়ে যাওয়ার জন্য।
”খুব বড়—বড় কথা বললেন।” প্রাণকৃষ্ণ বিদ্রূপের স্বরে বলল।
