”কোথায় হরিচরণ, মুখখানা একবার দেখা।” লাফাতে লাফাতে ক্ষিতীশ চীৎকার করে চলল। ”ওলিম্পিকের গুল মেরে কি আর সুইমার তৈরী করা যায় যে পাঁটা? বুদ্ধি চাই, খাটুনি চাই, নিষ্ঠা চাই…গবেট গবেট সব।”
ব্যস্ত হয়ে প্ল্যাটফর্মের উপর ভেলো উঠে এসে ক্ষিতীশকে জড়িয়ে ধরল। ”হচ্ছে কি ক্ষিদ্দা, এত লোকের সামনে, তোমার কি মাথাটা বিগড়ে গেল নাকি! চলো চলো, ক্লাবে চলো। বিষ্টু ধর ওদিকে একসাইমেণ্টে সেন্সলেশ হয়ে পড়েছিল। অ্যাই কোনি, উঠে আয়।’
ক্লাবের বারান্দায় বেঞ্চে শুয়েছিল বিষ্টু ধর। ক্ষিতীশকে দেখে ওঠার চেষ্টা করতেই দু’জন তাকে সাহায্য করল।
”দশ কেজি রসগোল্লা আনতে পাঠিয়েছি।” ক্ষীণস্বরে বিষ্টু ধর বলল। ”ব্যান্ড পার্টি আনাবো। কোনিকে সারা নর্থ ক্যালকাটা ঘোরাবো।”
”খবরদার, ও কাজটি করবেন না। তাহলে হাজার পাঁচেক ভোট কমে যাবে।”
বিষ্টু ধর ফ্যালফ্যাল করে ক্ষিতীশের দিকে তাকিয়ে থেকে, অস্ফুটে আপন মনে বলল, ”কিন্তু আমার যে জেনুয়িন আনন্দ হচ্ছে।”
ক্ষিতীশ কোনিকে ডেকে গম্ভীর মুখে বলল, ”টার্নিংয়ে ভুল হল কেন?”
”তখন কেমন যেন সব গুলিয়ে গেল। অমিয়াদি টার্ন নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে দেখে, টাম্বল টার্নের কথা আর মনেই এল না।”
”আসলে নিজের ওপর তখন ভরসা হারিয়ে ফেলেছিলিস। মনে এলে সময় আরো কমতো।”
”আমার সময় কত হল ক্ষিদ্দা?”
বুক পকেট থেকে ঘড়ি বার করে তাকিয়েই ক্ষিতীশ ভ্রূ কুঞ্চিত করল এবং ক্রমশ মুখটা অপ্রতিভ হয়ে উঠল।
”ভুলে গেছি রে! ফিনিশের সময় এমন একসাইটমেন্ট চারদিকে…তবে বেঙ্গল রেকর্ড নিশ্চয় আজ ভেঙ্গেছিস। ইসস সময়টা যদি রাখতুম।”
”ক্ষিদ্দা, আমায় যে এখন প্রজাপতিতে যেতে হবে, দেরী হলে বৌদি রাগ করবে।”
”হ্যাঁ, হ্যাঁ, দেরী করিসনি আর।” ক্ষিতীশ ব্যস্ত হয়ে বলল। কিন্তু কোনি ইতস্তত করছে দেখে জিজ্ঞাসা করল, ”কি হল?”
”কানে কানে বলব।”
ক্ষিতীশ নিচু করল মাথাটা।
”রসগোল্লা আনতে পাঠিয়েছে না!”
”তাই তো! নিশ্চয় ভেলোটা আনতে গেছে। তাহলে আজ আর তোর বরাতে রসগোল্লা নেই।”
”কে বললে নেই।” বিষ্টু ধর গর্জন করে উঠল। ”ব্যান্ড পার্টি ঘোরান গেল না, রসগোল্লার হাঁড়িটাই তার বদলে প্রজাপতি ঘুরে আসবে।”
”তাহলে তোর বৌদির রাগও জল হয়ে যাবে।”
সেদিন রাত্রে বাড়ি ফিরে ক্ষিতীশের প্রতি লীলাবতীর প্রথম উক্তি হল : ”অত লোকের সামনে এই বুড়ো বয়সে ধেই ধেই করে নাচছিলে কেন? লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছিল। সবার সামনে অসভ্যতা, দোকানের মেয়েরাও দেখল তো!”
ক্ষিতীশ মাথা চুলকোতে চুলকোতে কোনির দিকে তাকাল। ”তোর বৌদি জানল কি করে?”
ফিসফিস করে কোনি বলল, ”বৌদি দেখতে গেছল। আমি বলেছিলুম আজকের সাঁতারের কথাটা, নইলে ছুটি পেতুম না যে।” তারপর হেসে বলল, ”বৌদি আমার মাপ নিয়েছে, একটা ফ্রক করে দেবে।” লাজুক স্বরে আবার বলল, ” বৌদি বলেছে, ইন্ডিয়া রেকর্ড করলে সিল্কের শাড়ি দেবে।”
কোনিকে বাড়ি পৌঁছে দেবার পথে ক্ষিতীশ জিজ্ঞাসা করল, ”কি মনে হচ্ছিল রে তোর, যখন সাঁতরাচ্ছিলিস।”
কোনি অনেকক্ষণ চুপ করে হাঁটল, তারপর স্বপ্নের ঘোরে যেন কথা বলছে, এমনভাবে বলল,”জানো ক্ষিদ্দা, রোজ যখন প্র্যাকটিস করি, তখন জলের মধ্যে নিচের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, আমার সঙ্গে সঙ্গে একটা মুখও এগিয়ে চলছে। বড্ড ভয় করে তখন।”
”মুখটা কেমন দেখতে রে?”
”দাদার মতন। আজও ছিল আমার সঙ্গে।”
।। ১২ ।।
অবশেষে কোনি বাংলা সাঁতার দলে জায়গা পেল।
এবারে জাতীয় সাঁতার চ্যাম্পিয়নশিপ হচ্ছে মাদ্রাজে। বি এ এস এ নির্বাচন সভায় ধীরেন ঘোষ, বদু চাটুজ্জেরা প্রবল বিরোধিতা করেছিল অ্যাপোলোর কাউকে দলে নেওয়ায়। শুধু তাই নয়, জুপিটারের কম্পিটিশনে অ্যাপোলোর তরফ থেকে ‘অমার্জনীয় অখেলোয়াড়ি আচরণ করার জন্য” ওই ক্লাবকে সাসপেন্ড করা হোক দাবীও তোলে।
জুপিটার দলে ভারি ছিল, তাদের প্রস্তাব গৃহীতও হচ্ছিল। এমন সময় আচমকা বালিগঞ্জ ক্লাবের প্রণবেন্দু বিশ্বাস অর্থাৎ হিয়ার কোচ প্রস্তাব দিল, ”অ্যাপোলোকে সতর্ক করে দিয়ে বলা হোক, ভবিষ্যতে এই ধরনের আচরণ সম্পর্কে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” প্রণবেন্দু তারপর বলল, ”বেঙ্গলের স্বার্থেই কনকচাঁপা পালকে টিমে রাখতে হবে।”
তুমুল হৈচৈ পড়ে গেল প্রণবেন্দুর এই কথায়। অ্যাপোলোর কোন প্রতিনিধি সভায় নেই। ওরা ভেবেছিল প্রস্তাবটা বিনা বাধায় পাশ হয়ে যাবে। কেউ ভাবতেই পারেনি হিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বীর পক্ষ নিয়ে প্রণবেন্দুই কিনা লড়াই শুরু করবে। ধীরেন ঘোষ ক্ষুব্ধ হয়ে বলল, ”স্টেট চ্যাম্পিয়নশিপে কি হল সেটা তো তুমি নিজেই দেখেছ।”
”হ্যাঁ দেখেছি।” প্রণবেন্দু স্থির চোখে ধীরেনের পাংশু মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে আবার বলল, ”কি হয়েছিল আমি দেখেছি।”
শুধু প্রণবেন্দু নয়, আরো অনেকেই দেখেছে।
কোনির প্রতিদ্বন্দ্বিতা অমিয়ার সঙ্গে নয়, হয়েছিল হিয়ার সঙ্গে। ব্রেস্টস্ট্রোকের ১০০ মিটারে ছিল কোনি, অমিয়া, হিয়া। চ্যাম্পিয়নশিপের অন্যতম রেফারি ছিল ধীরেন ঘোষ। স্ট্রোক জাজদের মধ্যে ছিল হরিচরণ ইনসপেক্টর অফ টার্নস এবং টাইম কীপারদের মধ্যে কার্তিক সাহা, বদু চাটুজ্জে, যজ্ঞেশ্বর ভটচাজ ছাড়াও জুপিটারের গোষ্ঠিভুক্ত কয়েকটি ক্লাবের লোকেরা ছিল।
