প্রাণকৃষ্ণ ঠিক করে ফেলেছে কলকাতার সব ক্রিকেট সম্মান ব্রাদার্স ইউনিয়নকে এনে দেবে, দেবেই। এজন্য দু’লাখ টাকা পর্যন্ত সে খরচ করবে। কেমন টিম হবে, কাকে কত টাকা দিয়ে দলে আনবে, অন্য রাজ্য থেকে বর্তমান ও প্রাক্তন কোন টেস্ট প্লেয়ারকে আনা হবে—এইসব নিয়েই প্রাণকৃষ্ণ বসার ঘরে তার পারিষদদের সঙ্গে আলোচনায় যখন ব্যস্ত, তখনই বাইরে থেকে বোজো, লিজা ঘেউ—ঘেউ করে ওঠে।
”দ্যাখ তো সুবলা, কে এল?” প্রাণকৃষ্ণ সোফায় এলিয়ে সেন্টার টেবিলে পা দুটো ছড়িয়ে দিল।
সুবলা অর্থাৎ সুবল মুখুজ্যে, লম্বা, ছিপছিপে, গলাটি ঈষৎ লম্বা, চোখদুটি সর্বদাই ঢুলুঢুলু, উঠে দরজার দিকে এগোল।
তখন দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন জহর পাল। খয়েরি ট্রাউজার্সে ভাঁজ নেই, একই অবস্থা ফিকে হলুদ রঙের হাওয়াই শার্টের। হাতে একটা বড় খাম। জহর পালের বয়স পঞ্চাশ থেকে পঞ্চান্নর মধ্যে। চোয়ালদুটো ছড়ানো, থুতনিটা চাপা। ফলে একধরনের দৃঢ়তা সবসময়ই ওঁর গালদুটিতে চেপে থাকে। মনে হয় একগুঁয়ে স্বভাবের মানুষ। মাথার সামনের দিকের চুল পাতলা, টাক পড়তে শুরু করেছে। ভুরু ঘন ঝোপের মতো, চোখদুটো তার মধ্যে জ্বলজ্বল করে। গায়ের রং দুধ না দেওয়া চায়ের মতো। শরীরের কোথাও চর্বির আধিক্য নেই। কনুই থেকে কবজি পর্যন্ত হাত দুটোয় জড়িয়ে আছে তিন—চারটি শিরা। উচ্চতায় নাতিদীর্ঘ। ওঁকে দেখলেই মনে হয়, খাটিয়ে লোক এবং আজীবন খেটেছেন। কথা বলেন মৃদুস্বরে কিন্তু তাতে ফুটে ওঠে চাপা মর্যাদাবোধ ও ব্যক্তিত্ব। তিনি নিজেকে একজন পেশাদার ক্রিকেটার হিসাবে পরিচয় দিতে ভালবাসেন।
বসার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে জহর পাল গলাখাঁকারি দিয়ে ঘরের লোকেদের ওপর চোখ বোলালেন। সবাই তাঁর দিকে তাকিয়ে, কারও চোখে আমন্ত্রণের আভাস নেই।
”একটা দরকারে এসেছি পানু।”
”কী দরকার?” প্রাণকৃষ্ণ সোফায় দেহটা মোচড়াল।
”আমার ছেলের সাঙ্ঘাতিক একটা রোগ হয়েছে। মাথার ব্রেনের মধ্যে পোকা। সিটি স্ক্যান করিয়েছি, এই যে তার রিপোর্ট আর ছবি।” জহর হাতের খামটা থেকে সেগুলো বের করতে যেতেই প্রাণকৃষ্ণ হাত তুলে বলল, ”থাক, থাক, ওসব ডাক্তারি রিপোর্ট এমন ভাষায় লেখা হয়, পড়ে বুঝতে পারব না।”
”ব্রেনের মধ্যে পোকা!” কানু ভট্টাচার্য বিশালভাবে অবাক হওয়ার চেষ্টা করে বলল, ”বাপের জন্মে এমন কখনও শুনিনি।”
”আমিও শুনিনি।” জহর বললেন। ”এখন দু—চারজনের কাছে শুনলাম তাদের আত্মীয়স্বজনের এমন ব্যাপার ঘটেছে। খাওয়ার সঙ্গে বা জলের সঙ্গে রিং ওয়ার্ম, হুক ওয়ার্ম শরীরে ঢুকে ব্রেনেও চলে যায়, ডিম পাড়ে, বংশবৃদ্ধি করে।”
”তা হলে তো দেখেশুনে এবার থেকে খেতে হবে পানুদা। বাইরে যা—তা দোকানের খাবার খাওয়া এবার থেকে তা হলে তো বন্ধ করা দরকার। ছেলের বয়স কত?” সুবল জানতে চাইল।
”আঠারো। হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম মৃগি বোধ হয়। নিওরোলজিস্ট করুণা ভটচায সিটি স্ক্যান করাতে বলেন।”
”কত খরচ হল?” কানু ভটচায জানতে চাইল।
‘ষোলো শো টাকা।”
”বাব্বা! আজকাল চিকিচ্ছের কী খরচ! বুঝলে পানু, সেদিন ডাক্তার ব্লাড প্রেশারের একটা ওষুধ লিখে দিল। দোকানে গিয়ে প্রেসক্রিপশনটা দেখাতে বলল, দশটার দাম দুশো কুড়ি টাকা। বললাম, ওষুধের পায়ে দণ্ডবত, দরকার নেই আমার অমন ওষুধে। ব্রাদার্স ইউনিয়ন করে—করেই তো ব্লাড প্রেশার চড়েছে, ঠিক আছে, সামনের বছর থেকে ক্লাব আর করব না। ওতেই প্রেশার কমে যাবে। পানু বললেও করব না।”
প্রাণকৃষ্ণর মুখে মুচকি হাসি খেলে গেল। ”পারবে কানুদা ক্লাব না করে? তোমার রক্তে লেখা আছে ব্রাদার্স ইউনিয়ন। ক্লাব না করলেই রক্ত মাথায় চড়ে যাবে।”
”যায় যাবে।” পঁয়ষট্টি বছর বয়সী কানুদা বাচ্চচাদের মতো অভিমান দেখিয়ে ঠোঁট ফোলাল। তোবড়ানো গাল দুটো ভেতরে বসে গিয়ে মুখটা চুপসে গেল।
সবাই মজা পাওয়ার দৃষ্টি নিয়ে কানুদার দিকে তাকিয়ে। জহরের চোখে মজা নেই। তিনি উদ্বিগ্ন চোখে প্রাণকৃষ্ণর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁকে কেউ বসতে বলেনি।
”ডাক্তার একমাস খাবার জন্য ওষুধ দিয়েছিলেন।” জহর বললেন।
”কত টাকা দামের?” কানুদা কথাটা বলে হাঁ করল। তার সামনের চারটে দাঁত নেই। জিভটা বেরিয়ে এল ফাঁকা জায়গাটা দিয়ে।
”দিনে কুড়ি টাকা। যাদব ঘোষ খুব বড় ডাক্তার, তিনি নিশ্চিত হওয়ার জন্য বললেন, মাথার এম আর আই স্ক্যান করতে হবে। তার জন্য পড়বে পাঁচ হাজার টাকা। তাই পানুর কাছে এসেছি।” জহরকে কুণ্ঠিত দেখাল।
”আমার কাছে, কেন?” প্রাণকৃষ্ণ টেবিল থেকে পা নামিয়ে সোজা হয়ে বসল।
”চার হাজার এখনও বাকি আছে।” মৃদুস্বরে জহর বললেন।
”কিসের চার হাজার?”
”কথা ছিল পাঁচ হাজার, অ্যাডভান্স পেয়েছি এক হাজার… বাকি টাকাটা এখন পেলে—।”
”টাকাফাকা কিছু বাকি নেই।” প্রাণকৃষ্ণ বিরক্ত স্বরে বলল। ”খেলেছেন তো মোটে তিনটে ম্যাচ। স্কোর কত করেছেন?’
সুবল বলে উঠল, ”জিরো নট আউট, আট নট আউট, আর একুশ রান আউট।”
”তবে?” প্রাণকৃষ্ণ জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন জহরের দিকে। ”ওইক’টা রানের জন্য এক হাজার টাকা তো পেয়েই গেছেন, আবার কী?”
”ঊনত্রিশ রান এক হাজার টাকায়! পানু তো দানছত্তর খুলে বসেছে।” কানুদা বলে উঠল। ”রান পিছু তেত্রিশ টাকারও বেশি!”
