দিন চারেক আগে সেই পাখির ডাকটা সে অনেকদিন পর শুনতে পেয়েছিল। গভীর রাতে শিসটা লণ্ঠনের মতো দুলতে দুলতে জানলার বাইরে দিয়ে চলে যায়। ভাগ্যিস টেপরেকর্ডারে ধরে রাখেনি? রাখলে, এমন করে অবাক হওয়ার মজাটা ফুরিয়ে যেত।
তন্দ্রা আসছে আনন্দর। চোখের পাতা জুড়ে আসছে ঘুমে। এমন সময় একটা স্বর ফিসফিস করল:
”ব্যানার্জি আমি তোমার সঙ্গে ফাইনালে খেলার জন্য অপেক্ষা করছি।”
”কিন্তু আমি যে কোনর্সের সঙ্গে খেলাটা শেষ করতে পারছি না। ওকে হারাবার পরই তোমার কাছে আমায় তো হার মানতেই হবে, তখন যে আমার খেলাও ফুরিয়ে যাবে। আমি যে অনেকদিন খেলতে চাই।”
”ব্যানার্জি তুমি আমাকেও হারিয়ো।”
”না না, তোমাকে আমি হারাতে পারব না।”
”তুমি হেরে গেলে তোমার দেশের লোক দুঃখ পাবে।”
”পাক পাক। আমার ইচ্ছেয় আমি হারব আমার ইচ্ছেয় আমি জিতব। আমি একটা দরুণ পৃথিবীতে চলে যাব যেখানে আমায় কেউ হারাতে পারবে না। কিন্তু মুশকিল কী জানো, জিতে ফেললেই সেই পৃথিবীটা থেকে আমায় বেরিয়ে আসতে হবে তাই কোনর্সের কাছে আমি জিতছি না। তুমি কি অধৈর্য হয়ে পড়ছ?”
”আমি ভয় পাচ্ছি ব্যানার্জি। কোনর্সের সঙ্গে খেলতে খেলতে ক্লান্ত হয়ে পড়বে, তখন তুমি যে ম্যাচ ছেড়ে দেবে।”
”না, মোটেই না। উইম্বলডন থেকে চলে যাবার পর ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে। ইন্ডিয়াকে ইনিংস ডিফিট থেকে বাঁচাবার জন্য আমি ব্যাট করব। এখন আমি একশো নট আউট, দুটো দিন ব্যাট করতে হবে। রেকগনাইজড ব্যাটসম্যান বলতে আছে শুধু গাভাসকার। আমি একটার পর একটা রেকর্ড ভাঙতে ভাঙতে যাব। পঞ্চাশ রানে ইন্ডিয়াকে এগিয়ে দিয়ে আউট হব। শেষদিন টি—এর পর ওয়েস্ট ইন্ডিজ ব্যাট করতে নামবে আধঘণ্টার ওই রানটা তুলে নিয়ে ম্যাচ জিততে। কিন্তু ফাস্ট বোলার ব্যানার্জি যে কী জিনিস এইবার ওরা তা দেখতে পাবে, কখনও দেখিনি এমন বোলিং করব।”
”সেই ম্যাচও তো শেষ হবে একদিন।”
”হোক। সারা পৃথিবী জুড়ে খেলা চলেছে রোজওয়াল, তুমি কি কাগজ পড়ো না? দ্যাখো না রোজ কত জায়গায় কত খেলা? অফুরন্ত অগুন্তি। আমি এই বিছানায় শুয়ে একটার পর একটা খেলা খেলে যাব। শেষ সুযোগ সব সময় আমার সামনে থাকবে—চিরকাল। সারা পৃথিবী গ্যালারিতে বসে অপেক্ষা করে থাকবে আমাদের ফাইনাল খেলাটার জন্য।”
দোতলার ঘরে, দুপুরে, জানলা দিয়ে তাকিয়ে মেঘেদের ভেসে বেড়ানো দেখার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে আনন্দর মুখের ওপর হালকা মেঘের মতো একটা হাসি ভেসে বেড়াতে লাগল। চোখদুটো জলে ভরে আসছে। তার উপরই ঝলমল করে উঠল নরম আভা নিয়ে বুকের মধ্য থেকে ফুটে ওঠা মিষ্টি রোদ। মনে মনে সে তখন বলল : এত খেলা, চারদিকে এত খেলা!
বুড়ো ঘোড়া
বুড়ো ঘোড়া – মতি নন্দী – কিশোর উপন্যাস
দক্ষিণ কলকতায় রবীন্দ্র সরোবর স্টেডিয়ামের সামনে বাস থেকে নামলেন জহর পাল। সাদার্ন অ্যাভিনিউ পার হয়ে শরৎ বসু রোড ধরে মিনিট দুই হেঁটে বাঁ দিকের একটা রাস্তা নিলেন। তিনটে বাড়ির পর থেমে গেলেন। লোহার ফটকে সাঁটা টিনের পাতে লেখা ‘কুকুর হইতে সাবধান’। তার নীচে হুঁশিয়ারিটা ইংরেজিতেও লেখা।
জহর পাল এই বাড়িতে দু—তিনবার এসেছেন। দুটো ডোবারম্যান কুকুরকে তিনি দেখেছেন। দিনের বেলা সে—দুটো বাঁধা থাকে সদর দরজার পাশে। রাত্রে ওরা সারা বাড়ি ঘুরে বেড়ায়। এখন সকাল এগারোটা, তাই চেন দিয়ে বাঁধা। চেনের দৈর্ঘ্যটা এমনই যে, তেড়ে এসে কামড়াতে পারবে না, তবে খুব কাছে এসে ভয় দেখাতে পারবে।
একতলার দরজায় পৌঁছতে দুটো কুকুরই গম্ভীর স্বরে ডেকে উঠে জহরের দিকে এগিয়ে এল। ভয় আর অস্বস্তি তাঁকে দাঁড় করিয়ে দিল। ভেতরের ঘর থেকে ধমকে—ওঠা গলার স্বর শোনা গেল, ”বোজো… লিজা… কোয়ায়েট, কোয়ায়েট।”
এই কণ্ঠস্বরের মালিক এবং বোজো ও লিজার প্রভু হল প্রাণকৃষ্ণ পোদ্দার। আত্মীয়স্বজনের কাছে যে পানু, খেলার মাঠের লোকদের কাছে পানুদা বা পানুবাবু। আগে তাকে যারা পেনো বলত, তারা গত চার বছর ডাকছে পানু, এমনকী আড়ালেও আর পেনো বলে না।
বাংলার ক্রিকেটে প্রাণকৃষ্ণ গত চার বছর ধরে প্রতিপত্তি বিস্তারের জন্য কাজ করে চলেছে। ব্রাদার্স ইউনিয়ন কলকাতার নামি ক্রিকেট ক্লাব, ফুটবলও খেলে। এই ক্লাবটির ক্রিকেট দল চালাবার দায়িত্ব সে চার বছর আগে নিয়েছে। বিস্তর টাকাও খরচ করেছে। প্রাণকৃষ্ণর ঠাকুর্দা ছিলেন পাটের আড়তদার; থাকতেন উত্তর কলকাতায় কুমারটুলিতে। পাটের সঙ্গে তিনি যোগ করেন কাঠের ব্যবসা। যথেষ্ট ধনী হয়ে ওঠেন।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় প্রাণকৃষ্ণর বাবা মিলিটারি কন্ট্রাক্টরি ও সিমেন্টে ভেজাল দিয়ে লক্ষ—লক্ষ টাকা কামান। যুদ্ধের পরই পৈতৃক বাসস্থান ছেড়ে তাঁরা দক্ষিণ কলকাতায় এই বাড়িটা তৈরি করে উঠে আসেন। এই বাড়িতেই প্রাণকৃষ্ণ ও তার ভাইবোনেরা জন্মেছে। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর তাদের সম্পত্তির সঙ্গে যুক্ত হয় হুগলি জেলার একটা রাইস মিল আর দুটো কোল্ড স্টোরেজ। প্রাণকৃষ্ণ এখন প্রসাধনী সামগ্রী প্রস্তুতের ব্যবসায়ে নামার তোড়জোড় করছে। নিউ মার্কেটে পশম সামগ্রীর বিরাট দোকানটা তো আছেই।
প্রাণকৃষ্ণর প্রচুর টাকা আছে বটে, কিন্তু দেশের লোকের কাছে সে একজন কেউকেটা নয়। কেউ তাকে চেনে না, সম্মানও দেয় না। একবার সে ভেবেছিল রাজনীতিতে নেমে নেতা হবে, তার পর মন্ত্রী। ইচ্ছাটা তার মোসায়েব ও পরামর্শদাতা কানাই ভট্টাচার্যকে জানায়। কানাই অর্থাৎ কানুদা অতঃপর প্রাণকৃষ্ণকে একটা দুর্গাপুজো কমিটির প্রেসিডেন্ট করে দেয়। তিনটে ফুটবল প্রতিযোগিতার ফাইনালে তাকে দিয়ে পুরস্কার বিতরণ করায়। পরিবেশদূষণ প্রতিরোধ সেমিনারে বক্তৃতা দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়। কিন্তু প্রাণকৃষ্ণকে লোক চিনল না। সে বক্তৃতা দিতে গেলেই তোতলায়। শ্রোতারা হাসে। সে রাজনীতির লাইন ছেড়ে দেয়। অতঃপর সে স্থির করে কেউকেটা হতে গেলে তাকে খেলার লাইন ধরতে হবে। আর খেলা বলতে তো একটাই, ক্রিকেট। এ—খেলায় গ্ল্যামার আছে, নামডাক আছে, বছর—বছর টেস্টম্যাচ হয়, টিকিটের জন্য লোকে পাগল হয়ে ওঠে। তা ছাড়া ক্রিকেট তার কাছে অপরিচিত নয়। যে ব্রাদার্স ইউনিয়নের সে এখন ক্রিকেট সেক্রেটারি, একদা সেই ক্লাবে ক্রিকেট খেলেছে। তার সেক্রেটারিত্বে ব্রাদার্স ইউনিয়ন, কলকাতা গড়ের মাঠে যে ক্লাবটি শুধুই ব্রাদার্স নামে পরিচিত, দু’বার সি এ বি নক আউটে আর লিগে রানার্স হয়েছে। জে সি মুখার্জি ট্রফি জিতেছে কিন্তু পি সেন ট্রফি এখনও জেতা হয়নি।
