বিপিনদা সিং—দরজার কাছে উৎকণ্ঠিত হয়ে দাঁড়িয়ে, আনন্দকে দেখা মাত্র ফেটে পড়তে গিয়েও পড়ল না।
”এ কী চোখমুখের অবস্থা হয়েছে। গা পুড়ে যাচ্ছে যে!”
”বিপিনদা, আমাকে ঘরে নিয়ে চলো।”
এইটুকু বলেই আনন্দ বিপিনদার বাহু আঁকড়ে হাঁপাতে লাগল।
”কী যে এক অসুখ, চিকিচ্ছেও কিছু নেই। সন্ধে থেকে আমি খোঁজাখুঁজি করছি। মেজবাবু জানতে পারলে আমাকে আস্ত রাখবে না।”
আনন্দ সারারাত জ্বরের ঘোরের মধ্যে কাটাল। এক একবার চমকে উঠে কান পেতেছে কিছু একটা শোনার জন্য। আবার আচ্ছন্ন হয়েছে। একবার তার মনে হল, কে যেন মাথায় হাত বুলোচ্ছে।
”কে?”
রোজওয়াল।”
”উইম্বলডন পেয়েছ?”
”এখনও তো কোনর্সের সঙ্গে তোমার সেমি ফাইনাল খেলা শেষ হয়নি।”
”হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক। বাকি আছে বটে।”
”তুমি সেরে উঠলে হবে?”
আনন্দ মাথা কাত করল।
.
সকালে অরুণ গম্ভীর হয়ে গেল ওকে দেখার পর।
”ডাক্তারবাবু যা বারণ করেছিলেন, তুমি তা—ই কিন্তু করেছ। এই অসুখে সাবধানতাই কিন্তু একমাত্র চিকিৎসা, তোমায় তা বার বার বলা হয়েছিল।”
আর কিছু সে বলেনি। দুপুরে আনন্দ ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে একবার ঘুরে এল।
ইন্ডিয়া অল আউট একশো পঁয়ত্রিশ তৃতীয় দিন লাঞ্চে। ফলোঅন। চারশো পঁচাশি রান পিছনে। খেলা এখনও আড়াই দিন বাকি। হার হার, আবার ইনিংস ডিফিট। উইকেটে লাইফ নেই, অ্যান্ডি একটাও উইকেট পায়নি। সোবার্স গুগলিতে দুটো, গিবস ছ’টা, দুটো রান আউট।
হাসপাতালের কেবিনে আনন্দর কানে রেডিয়ো। স্টেডিয়ামের হট্টগোলের সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। যেন শ্মশানে খেলা হচ্ছে।
বিকেলে আনন্দর জ্বর কমে সন্ধ্যায় আবার বাড়ল, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। কবজিতে, কনুইয়ে, হাঁটুতে, পায়ের গোছে কেউ যেন হাড়গুলো চিবোচ্ছে। যন্ত্রণায় ঝনঝন করছে শরীর। কিন্তু বকুনির ভয়ে বলল না। সে যে খুব বেশি কাহিল নয়, এটা প্রমাণ করার জন্য বিপিনদা যা দিল, তাই খেয়ে ফেলল। বার বার উত্তরের জানলায় তাকাল অমলের জন্য। ডগুদার মামলার খবর তাকে জানতেই হবে।
পরদিন দুপুরে অমল এল।
”কী হল?”
”মা গেছল কোর্টে। শিবা দত্তর হয়ে সাক্ষী দিল। চাওলা দয়ানিধি, মন্দিরে কাজ করে নেপেন নামে লোকটা, কারখানার লরি ড্রাইভার আর দুটো মজুর। সবাই বলল একই কথা। ডগুদা কারখানায় আগুন লাগাবে বলে শাসিয়েছিল, ওরা শুনেছে। আর আগুন লাগার কিছু আগে ওরা ডগুদাকে কারখানার কাছাকাছি দেখেছে।”
”ওরা সবাই শিবা দত্তর অনুগ্রহ নিয়ে চলে।”
”কিন্তু সে কথাটা তো জজকে বলে দেবার মতো কেউ নেই।”
”ডগুদা বলতে পারে।”
”মা বলল, ডগুদা নাকি সারাক্ষণ কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিল।”
ইতস্তত করে অমল আরও কী যে বলতে গিয়ে থেমে গেল। আনন্দ তা লক্ষ করে খাট থেকে ঝুঁকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।
”তোমার বাবা আমার মাকে ডেকে নিয়ে বলেছে, ডগুদা যদি জমিটা নিয়ে চেঁচামেচি আর না করে তা হলে কেস তুলে নেবে আর কারখানায় একটা চাকরিও হবে। মাকে বলেছে ডগুদাকে বুঝিয়ে বলার জন্য।”
আনন্দ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে অবশেষে হেসে উঠল।
”পাগল, ডগুদা এতে রাজি হবে ভেবেছ? এভাবে ওকে কেনা যাবে না।”
”তোমার কি শরীর ভাল নেই আনন্দ? হাঁপিয়ে কথা বলছ কেন? চোখ মুখ ফুলো ফুলো!”
আবার হাসল আনন্দ।
”কোনর্সের সঙ্গে থার্ড সেটের খেলা চলছে ফাইভ গেম অল, ভীষণ টায়ার্ড এখন। রোজওয়াল ফাইনালে অপেক্ষা করছে আমার জন্য। এদিকে ইন্ডিয়া ফলোঅন খেয়েছে।”
”তুমি বেশি কথা বোলো না।”
”শুনবে আমি প্রথম ওভারে কী কাণ্ড করেছি?”
”না। তুমি শয়ে পড়ো।”
”ফ্রেডেরিকস আমাকে পিটিয়ে ছাতু করে দিয়েছে। সারা স্টেডিয়াম শুধু ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করেছে আমাকে। আমি তখন লজ্জায় ভয়ে পালাবার মতো ছুতো খুঁজছি। ওভারের শেষ বলে অসম্ভব একটা ক্যাচ ধরতে গিয়ে বলের ওপর বুক দিয়ে পড়েই দারুণ চোট। হাসপাতালে কেবিনে আছি এখন। বুঝলে অমল, এখন আমি সেই ভেতরের পৃথিবীতে।”
আনন্দ চোখ বুজল। নিঃশব্দে জানলা থেকে অমল যে সরে গেল সেটা জানতে পারল না সে। আনন্দ দেখতে পাচ্ছে সে এখন হাসপাতালে। পা টিপে টিপে বেরোচ্ছে কেবিন থেকে। হাতে তোয়ালে মোড়া বুট জোড়া। লম্বা বারান্দার শেষে সিঁড়ি একতলায় নেমে গেছে। জনমানব নেই কোথাও।
ইন্ডিয়া টি—এ চার উইকেটে পঁয়তাল্লিশ। রেডিয়োটা বন্ধ করেই সাদা জামা আর প্যান্টটা দ্রুত পরে নেয় আনন্দ। নার্স এখন ঘরে নেই। যে—কোনও মুহূর্তে এসে পড়বে। বুট পরে হাঁটলে শব্দ হবে। ওটা লুকিয়ে নিতে হবে। আনন্দ ব্যানার্জি খেলছে, অথচ ইন্ডিয়া হারবে, কী করে তা সম্ভব? বুকে চিড়িক করে উঠল একটা ব্যথা।
সে সিঁড়িতে পৌঁছে লাফিয়ে লাফিয়ে একতলায় এল। বুকের ব্যথাটা জোরে লাগছে। ব্যান্ডেজটা ভাগ্যিস দেখা যাচ্ছে না। বিশ্বনাথ কি ব্রিজেশের প্যাড, ব্যাট, গ্লাভস চেয়ে নিলেই হবে। আউট হয়ে গেছে ওরা।
”ট্যাক্সি, অ্যাই ট্যাক্সি। স্টেডিয়ামে চলো, হয়্যার দি টেস্ট ম্যাচ ইজ নাউ বিইং প্লেড। জলদি, কুইক।”
ইন্ডিয়া সিক্স ফর ফিফটিওয়ান। তিনদিনেই খেলা শেষ হয়ে যাবে। পতৌদি ফিরে আসছে। ক্লিন বোল্ড বাই রবার্টস। ওর উইকেট এই একটাই। দারুণ স্লো পিচ। রবার্টসের মতো ফাস্ট বোলারও এর থেকে লাইফ পাচ্ছে না। অথচ ইন্ডিয়া কোল্যাপস করে যাচ্ছে। আর রইল কে? ব্যানার্জি তো ব্যাট করবে না। প্রসন্ন, বেদি, চন্দ্র। টি—এর পর ঝপাঝপ গেল আবিদ আর পতৌদি। গাভাসকর চব্বিশ নট আউট।
