”জানি।”
”বলতে পারত তো আমাকে আবার টানাটানি কেন? আমি শহরের পুলিশ, গ্রামের পুলিশের এলাকায় নাক গলাবার অধিকার নেই। কিন্তু গ্রামে গেল তো সে মাস্টারের সঙ্গে! লোকটার উপর কি শুধু মায়াই পড়ে গেছল? মানবিকতা বলে একটা ব্যাপারও তো আছে।”
”তুই তো বেশ গালভরা পাকাপাকা কথা শিখেছিস। উকিল হবি নাকি বাবার মতো।”
”দেবুদা, আমার কিন্তু স্থির বিশ্বাস, ডগুদার কেসটা পেলে মেইগ্রে ঠিক নিয়ে নিত। বুদ্ধির ব্যাপার আছে যে!”
উঠে বসল দেবুদা। চশমাটা পাঞ্জাবির খোঁটায় মুছে চোখে লাগিয়ে পিটপিট করে তাকাল।
”কী বুদ্ধির ব্যাপার?”
”তা আমি কী করে জানব! একটা নিরপরাধ লোককে প্যাঁচে ফেলা হয়েছে, তাকে ছাড়িয়ে আনতে নিশ্চয় বুদ্ধি লাগবে। সাক্ষীদের জেরা করে, কি তাদের প্রমাণগুলো মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, কি ডগুদা তখন অন্য জায়গায় ছিল এইরকম কিছু প্রমাণ দিয়ে প্যাঁচটাকে খুলে ফেলতে হবে। মেইগ্রে হলে ঠিক পারত।”
দেবুদা ডান তালু দাড়িতে ঘষতে ঘষতে আড়চোখে কয়েকবার আনন্দর মুখের দিকে তাকাল।
”তবে মুশকিল কী জানেন দেবুদা, বাবার সঙ্গে আপনি পারবেন কি না তাই নিয়ে আমার বেশ—”
আনন্দ টেবলে টাইমপিসটার দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়াল। দেবুদার গাল ঘষা বন্ধ হয়ে গেছে।
”কালকেই কেস আছে বললি। খরচ—টরচ দেবে কে?”
”মেইগ্রে তো নিজের খরচেই মাস্টারের সঙ্গে গ্রামে গিয়েছিল। নিজের খরচেই হোটেলে ছিল।”
”তাই বলে আমাকেও কি পকেট থেকে টাকা বার করতে হবে? একটা পয়সাও আমি খরচ করতে পারব না।”
দমে গেল আনন্দ। দেবুদা রাজি হয়েও পিছিয়ে যাচ্ছে। বেচারা ডগুদা, বিনা দোষে জেল খাটবে। মিথ্যে মামলার ফাঁস থেকে ওকে বার করে আর কে আনতে পারে। শুকনো মুখে আনন্দ বলল, ”ডগুদা ওই মাঠটাকে পাড়ার ছেলেদের খেলার জন্য বুক দিয়ে আগলে রাখে, শিবা দত্তর লোকের সঙ্গে ঝগড়া করে, মাঠটার দলিলে কী লেখা আছে ডগুদা তা জানে, ওর জন্যই মাঠটাকে ওরা গ্রাস করতে পারছে না। একটা ভাল লোক অযথা জেলে যাবে আর আমরা কিছু করব না?”
”করতে গেলে টাকা লাগে।”
”কোথায় পাব? ডগুদার বাড়ির কেউ একটা পয়সাও দিতে রাজি নয়।”
”তাহলেই বোঝ কী রকম লোক। জেল খাটুক অভিজ্ঞতা হবে।”
আনন্দ যাবার আগে শুধু বলল, ”মেইগ্রে পড়ে আপনি কিচ্ছু বোঝেননি?”
সন্ধ্যা উতরে রাত শুরু হয়ে গেছে। এতক্ষণ বাইরে থাকার অনুমতি তার নেই। দেবুদার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আনন্দ জোরে হাঁটতে শুরু করল। পর পর কদিন রাতে বৃষ্টি হয়েছে। বাতাস জোলো। দেবুদা কাল তাহলে অ্যাপিয়ার হবে না। অন্ধকার খেলার মাঠটার মধ্য দিয়ে যাবার সময় একটা ইট পায়ে লাগতেই অভ্যাসবশত কুড়িয়ে নিল। সাইজটা ক্রিকেট বলের। নিশপিশ করে উঠল ওর ভিতরের রাগ আর দুঃখের মতোই কাঁধের পেশিগুলো। তিন আঙুলে ইটটাকে ধরে সে ছুটতে ছুটতে লাফিয়ে উঠে বল করার মতো ছুড়ল কারখানার দেয়ালে।
দেয়ালে ইট লাগার শব্দটা ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই ডান হাতে সে বুক চেপে ধরল। মনে পড়ল তার বুকে চোট। এট্রিয়াল ফাইব্রিলেশন নয়, ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ফ্রেডেরিকসের ক্যাচ ধরতে গিয়ে বলের উপর বুক দিয়ে পড়েছে। এখন সে বোম্বাইয়ে।
বুকে হেভি ব্যান্ডেজ। ডাক্তার বলেছে শুয়ে থাকতে। পুরো রেস্ট। কাল মাঠ থেকেই তাকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে। এক্স—রে হয়েছে। পাঁজরার হাড়ে ক্র্যাক দেখা গেছে। কেবিনে রাখা হয়েছে।
ট্রানজিস্টারে কান পেতে আনন্দ শুয়ে। সেকেন্ড—ডে লাঞ্চে ওয়েস্ট ইন্ডিজ—টু ফর ফোর হানড্রেড সেভেনটি। দু’ উইকেটে চারশো সত্তর। কালীচরণ ব্যাটিং দুশো চার, কানহাই ব্যাটিং হানড্রেড ফিফটি। ফ্রেডেরিকস সত্তর, আর একজন পনেরো, বাকিটা এক্সট্রা।
আউট!
লাঞ্চের পর প্রসন্নর প্রথম বলেই কালীচরণ শর্ট লেগে সোলকারের হাতে।
কে আসছে? লরেন্স রো! রিলেওলারা কী যে বলে। আনন্দ কানের কাছে সেটটা ধরল ঠিক মেজদার মতো। (ওহ, কাল মেজদাও হাসপাতালে এসেছিল, আজ সকালেও। ইন্ডিয়া টিমেরও সবাই এসেছিল।)
সোবার্স। আশ্চর্য, সোবার্সকে দেখে চিনতে পারে না? পতৌদি অ্যাটাকিং ফিল্ড সাজিয়েছে। নিউ ব্যাটসম্যান!
কানহাই সোবার্স। তিন উইকেটে চারশো সত্তর। আর কতক্ষণ ব্যাট করবে? টি—এ ডিক্লেয়ার করা উচিত। সোবার্স পনেরো মিনিটে মারল প্রথম চার, বেদিকে। নেক্সট পনেরো মিনিটে তিরিশ। আশি মিনিটে একশো এক। কানহাই ততক্ষণে মাত্র বারো।
লয়েড ডিক্লেয়ার করল। লাঞ্চের পর একশো মিনিট ব্যাট করেই। সাড়ে পাঁচশো মিনিটে থ্রি ফর সিক্স হান্ড্রেড টোয়েন্টি। টি—এর আগে দশমিনিট ইন্ডিয়াকে ব্যাট করতে দিয়ে কী এমন লাভ হবে!
অন্ধকার মাঠের ওপর দিয়ে কয়েকটা লোক কথা বলতে বলতে চলেছে আনন্দদের বাড়ির দিকে। মাঠের উপর বিকেলে কয়েকটা ড্রাম নামিয়ে রেখে গেছে কারখানার লরি। আনন্দ এতক্ষণ তারই একটার উপর বসে। লোকেদের কথার শব্দে বোম্বাই টেস্টম্যাচ থেকে সে মুহূর্তে ফিরে এল বাস্তবে।
আনন্দ ওদের পিছু পিছু বাড়ির দিকে এগোল। মাথা ভার ভার লাগছে, গাঁটে গাঁটে যন্ত্রণা।
”উকিলবাবু যা যা শিখিয়ে দেবে, মুখস্থ করে ফেলবি। ঠিক সেইভাবে বলবি।”
কথা বলতে বলতে ফটক পেরিয়ে ওরা ঢুকছে। আনন্দ দেখল দুটি অল্পবয়সী ছেলে আর শিবা দত্তর ম্যানেজার।
