আর বড়জোর আধঘণ্টা। তারপরই ম্যাচ শেষ। তখন বাসে ওঠা, কি ট্যাক্সি পাওয়া শক্ত হবে। স্টেডিয়াম থেকে এখনই লোক বেরোতে শুরু করেছে।
পতৌদি মাথাটা বাঁ দিকে হেলিয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে ফিরছে গ্লাভস খুলতে খুলতে। প্রসন্ন ব্যাট করতে নামবে। তাকে কী বলার জন্য মুখ তুলেই পতৌদি থমকে গেল। বাঁ চোখটা বিস্ময়ে প্রায় কপালে উঠল।
”ব্যানার্জি।”
”ব্যাড লাক, প্যাট।”
ওর পাশ দিয়ে আনন্দ এগিয়ে গেল উইকেটের দিকে।
ইনজিওর্ড, তার উপর বোলার, তাই রবার্টস প্রথম বলটা অফ স্ট্যাম্পের অনেক বাইরে মিডিয়াম— পেসে দিল। সাড়ে চারশো রান হাতে নিয়ে এমন দয়া সবাই দেখাতে পারে।
শব্দ হল টকাস।
স্কোয়্যার কাট। গালিতে গিবস ভয়ে উবু হয়ে বসে পড়ল। বলটা দেখা গেল না বাউন্ডারিতে পৌঁছবার আগে পর্যন্ত।
সোবার্স হাসল হাততালি দিতে দিতে । কালীচরণও দিল। ওরা জানে, হারের মুখে ব্যাট করতে এসে এ—রকম দু—চারটে বেপরোয়া মার সবাই মারে।
নেক্সট বলটা সোজা। টক। বোলারের ওপর দিয়ে ছয়। ওভার শেষ। গাভাসকার এগিয়ে এল কথা বলতে।
”ইউ জাস্ট স্টে দেয়্যার সানি। ওনলি স্টে অ্যান্ড গিভ মি সাপোর্ট। ডোন্ট টেক শর্ট রানস বিকজ—”
আনন্দ বুকে হাত দিয়ে, ইংরেজিতে কথাগুলো অনুবাদ করতে না পেরে শুধু বলল, ”পেন।”
অবাক চোখে তাকাতে তাকাতে গাভাসকার ক্রিজে ফিরে গেল।
পনেরো মিনিটের মধ্যে লয়েডকে ফিল্ড ছড়িয়ে দিতে হল। রবার্টসের এক ওভারে কুড়ি রান। একটা সিঙ্গল নিতে পারত, নিল না। বুকে যন্ত্রণা। গিবসের এক ওভারে ছাব্বিশ, তিনটে ছয়ই স্ক্রিনের ওপর। সোবার্স এক ওভারে দিল ষোলো। কভারে জলপোকার মতো ছোটাছুটি করছে বয়েস। গোয়েন্দাদের মতো থার্ডম্যানে লরেন্স রো পায়চারি করছে। নেমন্তন্ন বাড়িতে খাওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকা বরযাত্রীর মতো উশখুশ করছে কানহাই, স্লিপে।
বন্যার মতো রানের স্রোত চলেছে ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে। ডুবে গেল কালীচরণের ইনিংস। সোবার্সের ইনিংস, কানহাইয়ের ইনিংস। বোম্বাইয়ের হাজার হাজার বাঙালি থাকে। নিশ্চয় তারা খেলা দেখতে এসেছে।
”লড়ে যা বাঙালি।”
আনন্দ স্ট্যান্ডের দিকে তাকিয়ে ব্যাট তুলল একবার।
”বেঙ্গল টাইগার, কিল দেম।”
দিনের লাস্ট ওভারের লাস্ট বলে আনন্দ ঠিক একশোয় পৌঁছল বয়েসকে লেটকাট করে। সোবার্সের মতো ঠিক আশি মিনিট লাগল। লাগত না, দারুণ ফিল্ডিং আর সানির ঠুকঠাক সময় নষ্ট করা। দুবার ফ্ল্যাশ করেছিল অফ স্ট্যাম্পের বাইরে। আনন্দ ”স্টেডি সানি, স্টেডি” বলার পর গাভাসকার আর করেনি।
ইন্ডিয়া সিক্স ফর হান্ড্রেড সিক্সটি। এখনও বাকি দুটো দিন। পুলিশ কর্ডন করে রেখেছে বাউন্ডারি তাই—নয়তো আনন্দ উচ্ছ্বাসের চাপে মারা যেত। হাজার হাজার লোক ঠেলাঠেলি করছে তাকে কিছু বলার জন্য। সব মিলিয়ে একটা বিরাট চিৎকার। লয়েড দাঁড়িয়ে গিয়ে ওকে আগে যেতে দিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ টিমের সবাই হাততালি দিচ্ছে। আনন্দ চট করে গেস্ট ব্লকের দিকে তাকাল। মেজদার মুখ গম্ভীর।
বুকের ব্যথার জন্য কেউ জড়িয়ে ধরতে পারল না। সোলকার, বেদি, আবিদ গালে চমু খেল। ডাক্তারবাবু রাগবে কি না বুঝতে পারছে না।
”জানো, পুলিশে খবর দিয়েছে হাসপাতাল থেকে। না বলে তুমি চলে এসেছ।”
”পুলিশে খবর দেওয়া কেন? হাসপাতালে কি কেউ রিলে শোনে না?”
”জানো, মারাত্মক কিছু একটা হয়ে যেতে পারে তোমার। তোমার এখন নড়াচড়া পর্যন্ত বারণ।”
”ইন্ডিয়া হারছে আর আমি শুয়ে থাকব? ব্যানার্জিকে তা হলে চেনেন না। কালও আমি ব্যাট করব।”
.
।। দশ।।
রাত্রে পাখিটা শিস দিচ্ছিল। বিছানায় উঠে টেবল থেকে টেপরেকর্ডারটা আনার মতো জোর আনন্দর ছিল না। একটু পরেই মেঘ ডেকে ওঠে। বিদ্যুৎ চমকাতে থাকে। দোতলা থেকে অরুণ নেমে এসেছিল। জানলা বন্ধ করে, থার্মোমিটারে জ্বর দ্যাখে।
”বাড়িতে তোর ঠিকমতো দেখাশোনা হচ্ছে না। ডাক্তারবাবু বলেছেন হাসপাতালে রাখতে।”
”কেন?”
”সেখানে কড়া পাহারায় থাকবি। সেইটাই তোর দরকার।”
”হাসপাতাল থেকেও তো পালিয়ে বেরোনো যায়। থার্টি টু ব্রিসবেনে এডি পেন্টার হাসপাতাল থেকে এসে ব্যাট করে ইংল্যান্ডকে ছ’ উইকেটে জিতিয়েছিল। তিরাশি রান করেছিল পেন্টার। গল্পটা তো তুমিই বলেছিলে।”
অরুণ চলে যাবার পর আনন্দ হেসেছিল। সারাদিনটা সে বিছানায় শুয়ে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে কাটিয়েছে। একবার তার মনে হয়েছিল, এইভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াই ভাল। এই পৃথিবীতে এমন কী সুন্দর ভাল জিনিস আছে যেজন্য বেঁচে থাকা যায়? আবার তার মনে হয় সারা পৃথিবী সুন্দর আর ভাল জিনিসে ভরে আছে, এই বাড়ির বাইরে বেরোলেই সেই জিনিসগুলোর সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। ভাবতে ভাবতে সে মনমরা হয়ে শুয়ে থাকে। বিকেলে ইচ্ছে হয়েছিল দোতলায় যেতে। এতদিনে একবারও ওঠেনি। জানলায় দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ দেখল দুটো ঘুড়ির লড়ালড়ি। ঘুগনিওলার ডাক শুনে লোভ হয়েছিল, কিন্তু কাছে একটা পয়সা নেই।
সন্ধ্যায় আনন্দ বাড়ি থেকে বেরোতে গিয়ে ধরা পড়ল বিপিনদার হাতে।
”না, একদম বারণ।”
কোনও ওজর, কাকুতিমিনতি বিপিনদার কানে গেল না।
”ফটকে সারাক্ষণ তালা দিয়ে রাখতে বলে গেছে মেজবাবু, তা জানো? বাবুর লোকজন সেরেস্তায় আসবে বলে এখন তালা খুলে ফটক পাহারা দিচ্ছি।”
