আরও দুটো বল করতে হবে। ছ বলে একুশ রান হয়েছে। ফ্রেডেরিকসের কুড়ি, একটা ওয়াইড, এবার পালাতে হবে। মাসল পুল তো হতে পারে! ফার্স্ট ওভারেই কি হওয়াটা উচিত হবে? লোকে ঠিক ধরে ফেলবে—ব্যাটা মার খেয়ে পালাচ্ছে।
এবার লেংথে সোজা বল, একটু স্লো। ফ্রেডেরিকস এবারও মারের বল পাবে ভেবেছিল। পা বাড়িয়ে ড্রাইভ করার জন্য ব্যাট তুলে যখন বুঝল বলটা মারলে উঠে যাবে তখন ব্যস্ত হয়ে ফরোয়ার্ড ডিফেন্সিভ খেলতেই বলটা সামনে একটু উঠে গেল। আনন্দ হাত বাড়িয়ে ঝাঁপাল।
আর উঠছে না সে। ছুটে এল সবাই। বলটা মাটিতে পড়েছে, তার উপর পড়েছে ওর বুক। শরীরের চাপে বলটা পাঁজরে, ঠিক যেখানে হার্ট—সঙ্গে সঙ্গে সেন্সলেস।
.
”আনন্দ, আনন্দ।”
চোখ বুজে আনন্দ হাঁপাচ্ছে। বুকের মধ্যে ধড়ফড়ানিটা কী রকম অদ্ভুত একটা ব্যথা তৈরি করেছে। একগোছা তীক্ষ্ন ছুঁচ যেন পর পর বিঁধিয়ে যাচ্ছে। নিশ্বাস নিতে গেলে লাগছে।
”আনন্দ?”
চোখ খুলে তাকাল। জানলার বাইরে অমল।
”শুনেছ, ডগুদাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে।”
”কেন, কবে, কী করেছে?”
”কারখানায় সেদিন যে আগুন লেগেছিল, ওটা নাকি ডগুদার কাজ। পুলিশের কাছে ওরা নালিশ করেছিল তাই ওকে ধরে নিয়ে গেছে, কোর্টে কেসও উঠেছে।”
”এত ব্যাপার হয়ে গেল, আর আমি কিছুই জানি না। ডগুদা কোথায়?”
”জেলে।”
”জামিন দিয়ে ছাড়িয়ে আনা হয়নি?”
”কে জামিন দাঁড়াবে? ওর ভাইয়েরা বলেছে, আমরা কিছু পারব টারব না। মা চেয়েছিল জামিন হতে, কিন্তু আমাদের তো টাকা বা বিষয়—সম্পত্তি কিছুই নেই।”
”ডগুদা আগুন লাগিয়েছে, হতেই পারে না। মিথ্যে কথা। কে দেখেছে?”
”দু—তিনজন ডগুদাকে নাকি কারখানার পিছনে যেদিকে আগুন লাগে, সেদিক থেকে আসতে দেখেছে। কালকেই মামলা উঠবে। এছাড়াও ডগুদা নিজেই তো একদিন চিৎকার করে বলেছিল আগুন লাগিয়ে দোব।”
”রাগের মাথায় ওরকম কথা সবাই বলে। তার মানে এই নয় যে, সত্যি সত্যিই আগুন দেবে। মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে। আমি শিওর। এই মাঠটাই হচ্ছে সবকিছুর মূলে, শিবা দত্ত এটাকে গ্রাস করতে চায়। ডগুদাই হচ্ছে কাঁটা।”
”তোমার বাবা ওদের উকিল দাঁড়িয়েছে।”
আনন্দর মুখ মুহূর্তের জন্য ফ্যাকাশে হল। চোখে ফুটল অসহায়তা।
”আমি কী করতে পারি।”
”না না, এমনিই বললাম, আমি এখন চলি।”
আনন্দ কিছু বলার আগেই জানলা থেকে অমল অদৃশ্য।
বিপিনদা ঘরে ঢুকল। তাকে ট্যাবলেট খাইয়ে চলে গেল।
আমি কী করতে পারি! আনন্দ ভাবতে শুরু করল ঘরে পায়চারি করতে করতে । ডগুদা পরের উপকার করার জন্য সারাদিন ঘুরে বেড়ায়। একটা আদর্শ আছে, আদর্শবাদী লোক। তাই বিয়ে পর্যন্ত করেনি। সেকালে বিপ্লবীরাও নাকি এইরকম ছিলেন, দেবুদাই বলেছিলেন বিপ্লবীরা সংসারী হতেন না দেশের সেবা করার জন্য। ডগুদা সম্পর্কে বলেছিলেন, ইডিয়ট, লেখাপড়া করেনি, বুদ্ধিশুদ্ধি নেই, আছে শুধু গোঁয়ার্তুমি আর সারল্য। জীবনে এরাই পস্তায়। ডগুদা পরোপকার করতে গিয়ে এখন পস্তাচ্ছে। দেবুদা শুনে নিশ্চয় খুশি হবে। হঠাৎ আনন্দর মনে ভেসে উঠল একটি মুখ। পুরুলেন্সের চশমা, লম্বাটে চোয়াল, বিরাট একটা মাথা—দেবুদার মুখ। আশ্চর্য! আনন্দ মনে মনে বলল পায়চারি থামিয়ে, আশ্চর্য এতক্ষণ এটা কেন মনে আসেনি! দেবুদা তো উকিল, সেই তো ডগুদার জন্য মামলা লড়তে পারে। ছাড়িয়ে আনার জন্য প্যাঁচালো যুক্তি প্রমাণ দিয়ে বড় উকিল হবার এই তো সুযোগ দেবুদার সামনে। ফি নিশ্চয়ই চাইবে না, ব্রিফলেস উকিলকে সেধে মামলা দিলে বর্তে যাবে। মামলায় জিতলে বেকসুর ডগুদাকে খালাস করতে পারলে দেবুদার নাম হবে। তখন লাইন পড়ে যাবে ওর বাড়িতে। এটা ওর মাথায় ঢোকাতে যদি পারা যায়।
.
।। নয়।।
”তোর বাবা তো শুধু বোঝে আইন। আর, শুধু আইন মুখস্থ থাকলেই কি উকিল হওয়া যায়?”
ডান হাতের তর্জনী দিয়ে দেবুদা কপালে তিনটে টোকা দিল।
”নিশ্চয়, ব্রেনই তো আসল জিনিস। স্কুলমাস্টার কি ঔপন্যাসিক কি ডিটেকটিভের মতো উকিলেরও দরকার ব্রেন। মেইগ্রের ব্রেন আছে বলেই তো—”
আনন্দ ইচ্ছে করেই শেষ করল না। তক্তপোশে আধশোওয়া দেবুদা মুচকি মুচকি হাসছে। মেজাজটা মনে হচ্ছে ভালই রয়েছে।
”তা হলে ডগুদার কেসটা কী হবে?”
”আরে দূর, এসব ছোটখাটো ব্যাপারে আমাকে টানাটানি কেন।”
”ছোটখাটো! একটা লোক বিনা দোষে জেল খাটবে, ষড়যন্ত্রের শিকার হবে, আর একে ছোটখাটো বলছেন? ধরুন একটা লোককে মিছিমিছি খুনের সঙ্গে জড়িয়ে অকাট্য সব প্রমাণ রেখে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়া হল। ধরুন না মাইগ্রের সেই কেসটা যেটা একদিন বলেছিলেন আমাকে।”
দেবুদা ভ্রু কুঁচকে বলল, ”কোনটা?”
”সেই যে গ্রামের খিটখিটে ঝগড়ুটে বুড়িটাকে একদিন তার ঘরে মরে পড়ে থাকতে দেখা গেল। এয়ার রাইফেলের গুলিতে মরেছে। সবাই সন্দেহ করল গ্রামের পাঠশালার মাস্টারকে। তার সঙ্গে বুড়ির প্রায়ই ঝগড়া হত। মাস্টার বাইরে থেকে এসেছে, গ্রামের লোকেরা তার শহুরে হাবভাব ভাল চোখে দেখত না, তাই তাকে ভীষণ অপছন্দ করত। গ্রামের পুলিশও মাস্টারকে সন্দেহ করছে। মাস্টারের ছেলের এয়ার রাইফেল আছে, অবশ্য অন্য বাড়িতেও আছে। তাছাড়া মাস্টারের বাড়ি থেকে বুড়ির ঘরটা দেখা যায়। মাস্টার ভয়ে ছুটে এল প্যারিসে মেইগ্রের কাছে আকুল আবেদন নিয়ে—আমাকে বাঁচান। মেইগ্রে তখন কী করল?”
