আর ঠিক আধঘণ্টা বাকি ফিফথ টেস্ট ম্যাচ শুরু হতে। আনন্দ ড্রেসিংরুম থেকে নেমে এল মাঠে। নতুন ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম। ইডেনের মতো অত বড় নয়। নেট—প্র্যাকটিস করছে দুটো টিমই। গিবস, বয়েস, সোবার্স বল করছে। কালীচরণ নেটের মধ্যে।
ইন্ডিয়ান নেটে ফারুক। একটা বল নিয়ে মিডিয়াম—পেসে আনন্দ বল করল কয়েকটা। ব্রিজেশ, মাঁকড় আর সোলকর অর্ধচন্দ্রাকারে দাঁড়িয়ে, ক্যাচিং প্র্যাকটিস করাচ্ছে প্রসন্ন। আনন্দ গিয়ে দাঁড়াল ব্রিজেশের পাশে। মালীরা এসেছে নেট তোলবার জন্য। পতৌদি আর লয়েড টস করতে নামছে। গেস্ট ব্লকে মেজদা বসে। অফিস থেকে ছুটি নিয়ে বোম্বাই এসেছে। কাল রাত্রে হোটেলে দেখা করে শুধু বলেছিল, ”আনন্দ, ঘাবড়াচ্ছিস?”
”ঘাবড়াব কেন, তবে বুকের মধ্যে—”
মেজদা হাসিমুখে বলেছিল, ”সব অসুখই সারে। তুইও সেরে উঠবি।”
পতৌদি টসে জিতেছে। কিন্তু ইন্ডিয়া ব্যাট করছে না। রবার্টস, সোবার্স, বয়েসের কথা ভেবে, তাজা পিচ ওদের হাতে তুলে না দিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকেই ছেড়ে দিয়েছে আনন্দর বলের সামনে।
আনন্দর হাতে বল। জীবনের প্রথম টেস্টের প্রথম ওভার। ফ্রেডেরিকস গার্ড নিয়ে ক্রিজে আঁচড় কাটছে। পতৌদি ফিল্ড সাজাচ্ছে।
”গালিকে ফোর্থ স্লিপ করে দেব?”
আনন্দ বোকার মতো মাথা নাড়ল।
”থার্ডম্যান রাখার দরকার আছে?”
আনন্দ আবার মাথা নাড়ল।
পতৌদি আর কিছু জিজ্ঞাসা না করে ফিল্ড সাজাল। গাড়েওয়ার প্যাভিলিয়নের দিকে চব্বিশ স্টেপ নিয়ে বুটের স্পাইক দিয়ে ঘাসে আঁচড় কাটার পর আনন্দ মুখ তুলেই দেখল গ্যালারিতে দুটো টি ভি ক্যামেরা—এখন হয়তো তাকেই তাক করে আছে। আনন্দর বুক ঢিবঢিব করে উঠল। সে তাড়াতাড়ি ঘুরে গিয়ে ব্যাটসম্যানের দিকে তাকাল। তখন ফ্রেডেরিকস পিছনটা একবার দেখে নিয়ে স্টান্স নিল।
”প্লে।”
আম্পায়ার রুবেন্স পাশে তুলে রাখা বাঁ হাতটা নামিয়ে ঝুঁকে পড়ল।
আনন্দ একবুক নিশ্বাস টেনে চোখ বন্ধ করল। তারপর ছুটতে শুরু করল বল হাতে। পঞ্চাশ হাজার লোকে ভরা স্টেডিয়াম শ্বাসরুদ্ধ কৌতূহলের চাপে বোবা হয়ে গেল মুহূর্তে। এই সেই বোলার, যে একটাও ফার্স্ট ক্লাস ম্যান না খেলেই টেস্ট খেলছে। সিলেক্টাররা ওর মধ্যে কী দেখে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে নামিয়েছে? অবশ্য প্রথম চারটি টেস্টেই হেভি ইনিংস ডিফিটের পর আর একটা ডিফিটে কিছু এসে যায় না। তা হলেও সালগাঁওকর ছিল, মহীন্দর অমরনাথ ছিল, ঘাউড়ি ছিল। তা নয়, কোথাকার এক বোলার, বেঙ্গলেও যাকে কেউ চেনে না, একে টেস্ট খেলাবার কোনও মানে হয়?
ওরা উদগ্রীব হয়। কে এই ব্যানার্জি! কেমন বল করে, কত জোরে করে।
ব্যাটের ঠিক মাঝখানে বল মারার মিষ্টি একটা শব্দ। লেগ স্ট্যাম্পে ফুলটস। ল্যাটা ফ্রেডেরিকস এক জায়গায় দাঁড়িয়েই অন—ড্রাইভ করেছে। স্কোয়ার—লেগ থেকে ব্রিজেশ প্যাটেল নিয়মরক্ষার জন্য কয়েক পা ছুটে থেমে গেল। একটা পুলিশ বাউন্ডারি থেকে বলটা ছুড়ে দিল।
প্রথম বলে চার। আনন্দর কান দুটো গরম হয়ে উঠল। রাতে একবার ভেবেছিল, প্রথম বলেই স্টাম্প ছিটকে দিয়ে মাঠে হইচই ফেলে দেবে। এঞ্জিনিয়ার ফার্স্ট স্লিপ বিশ্বনাথকে কী যেন বলল। বিশ্বনাথ মাথা নাড়তে নাড়তে পাশের গাভাসকরের দিকে তাকিয়ে হাসল।
দ্বিতীয় বল। বলটা হাত থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আনন্দর বুক হিম হয়ে গেল। ইন সুইংটা এত বড় হয়ে যাবে ভাবেনি। তাও শর্ট পিচ। মাঁকড় ভয়ে মাথা নিচু করল। স্কোয়ার—কাটের শব্দটা চাবুকের মতো আনন্দর মুখে আছড়ে পড়ল। কভার থেকে পতৌদি হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে গেল পয়েন্ট বাউন্ডারির দিকে, মাঠের মধ্যে ছুড়ে দেওয়া বলটা আনতে। বলটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে আনন্দর দিকে ছুড়ে দিল।
তৃতীয় বল।
হাঁটুটা কাঁপছে। কাঁধে যেন একশো কেজির চালের বস্তা চাপানো। লেংথ আর ডিরেকশান এবার এ দুটো যেন ঠিক থাকে। স্রেফ সোজা বল। সুইং টুইংয়ে ওস্তাদি নয়। একটু শুধু ঠুকে দেওয়া।
সপাটে পুল। চার। এতটা শর্টপিচ হয়ে যাবে আনন্দ ভাবেনি।
বলটা পতৌদি কাছে এসে হাতে দেবার সময় বলল, ”ঘাবড়ো মাৎ।”
মাথা নিচু করে বোলিং মার্কে ফিরে এল আনন্দ। পিছন থেকে একটা চিৎকার এল—”গুড বোলিং ফর লেডিজ ক্রিকেট।”
দরদর ঘামছে আনন্দ। প্যান্টে হাত মুছল। একটা বাউনসার দিলে কেমন হয়? যদি ব্রিজেশের কাছে ক্যাচ ওঠে।
না হুক, না পুল ধরনের একটা শট। ফাঁকা মিড উইকেট দিয়ে বলটা বাউন্ডারিতে গেল। চার বলে ষোলো রান। চারদিকে বেশ শোরগোল। আনন্দ কিছু শুনতে পাচ্ছে না। কিছু বুঝতে পাচ্ছে না। লজ্জায় অন্ধ হয়ে গেছে, কালা হয়ে গেছে। এখন কোনওরকমে মাঠ থেকে পালানো যায় যদি।
”কিপ দ্য বল ওয়েল আউটসাইড দ্য লেগ স্টাম্প।”
পতৌদির গলাটা কেমন কঠিন। আনন্দ মাথা নাড়ল।
ফিফথ বল। রুবেন্স দুহাত মেলে ধরল। ওয়াইড—বল।
সবাই বুঝে গেছে ব্যানার্জি নার্ভাস হয়ে পড়েছে। পালাবার একমাত্র উপায় ইনজিওর্ড হয়ে যাওয়া। পা মুচকে? টেরিফিক শট আটকাতে গিয়ে আঙুল ভেঙে? বল ধরতে ঝাঁপিয়ে কাঁধের হাড়ের ডিসলোকেশন?
পরেরটা হল নো—বল, ফ্রেডেরিকস হাঁকড়েছে। আনন্দর মাথার উপর দিয়ে ছয় হতে হতেও হল না। বাউন্ডারির হাত খানেক ভিতরে পড়েছে।
