”তোমার কথাবার্তাও এবার যন্তাোরে ধরে রাখব যখন হাবুর মার সঙ্গে ঝগড়া করবে।”
”ভয় দেখাচ্ছ?”
আনন্দ জবাব না দিয়ে পাশ ফিরে শুল। অমলের সঙ্গে কথা বলার সময় মাঝে মাঝে খেলাচ্ছলে বোতাম টিপে টিপে রেকর্ড করেছে। রেকর্ডার চালিয়ে তাদের দুজনের সেই কথাগুলো শুনতে শুনতে সে জানলার বাইরে তাকিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে গেল। একসময় তার কানে এল অমলের গলা।
”ভাবো তুমি জীবনের শেষ সুযোগের সামনে দাঁড়িয়েছ। সারা জীবন ধরে যে স্বপ্ন দেখেছ—”
আনন্দ বন্ধ করে দিল। মনে মনে বলল:
কোনওদিনই শেষ সুযোগের সামনে আমার দাঁড়ানো হবে না।… কিন্তু ইচ্ছা থাকলে মানুষ কী না পারে। সে এই পৃথিবীর মধ্যেই আর একটি পৃথিবী বানিয়ে সেখানে জিততে পারে হারতেও পারে।
.
।। সাত।।
”প্লে।”
প্রায় পনেরো হাজার লোক মুহূর্তে কথা বন্ধ করল। নিশ্বাস নেওয়া ও ছাড়া হচ্ছে চুপিচুপি। উইম্বলডন সেন্টার কোর্টে সেমিফাইনাল ম্যাচ—কোর্নসের সঙ্গে ব্যানার্জির।
আনন্দর সার্ভিস।
শান্ত চাহনিতে দেখে নিল, বেসলাইনের মাঝামাঝি কুঁজো হয়ে শিকারি চিতাবাঘের মতো জিমি। সার্ভিসের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য ডাইনে—বাঁয়ে দুলছে। বাঁ হাতে ধরা র্যাকেট তীক্ষ্ন নখের মতো। এখনও কানে বাজছে জিমির কথাগুলো। ছোট্ট ড্রেসিংরুমে তারা দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আয়নায় চুল আঁচড়াচ্ছে। জিমি তার লম্বা চুলগুলে সমান ভাবে কান ঢেকে দুপাশ দিয়ে নামিয়ে দিতে দিতে মহম্মদ আলির ঢঙে বলেছিল, ‘আই অ্যাম দ্য চ্যাম্পিয়ন—জাস্ট ট্রাই অ্যান্ড টেক মাই টাইটল অ্যাওয়ে।’
ঘাসের ওপর বল ড্রপ দিল আনন্দ। সার্ভিসের আগে তিনবার বল ড্রপ দেওয়াটা তার অভ্যাস। জিমি সেমি ফাইনাল পর্যন্ত সেট হারায়নি এখনও। কোয়ার্টার ফাইনালে দেখেছে ট্যানারের ঘণ্টায় একশো চল্লিশ মাইলের সারভকে জিমি কী অবহেলায় তাচ্ছিল্যে পালটা মার দিয়ে খুন করেছে। যত জোরে সারভ আসে ততই যেন জিমির সুবিধে হয়।
আনন্দ আপন মনে হাসল। জিম্বো, তোমার নাকি ছোটাছুটির স্পিড অকল্পনীয়, তোমার রিফ্লেক্স নাকি তুলনাহীন। দেখা যাক।
বলটা শূন্যে ছুড়ে র্যাকেটের ঘা দিল আনন্দ। সাইড লাইন আর সার্ভিস লাইনের কোনায় পড়ে কোর্নসের ব্যাকহ্যান্ডের নাগালের বাইরে দিয়ে বল বেরিয়ে গেল।
”ফিফটিন—লাভ।”
বাঁ দিকের কোর্টে সরে এল আনন্দ। ধীর মন্থর অলস তার হাঁটার ভঙ্গি। যেন ক্লাব টুর্নামেন্টে প্রথম রাউন্ড ম্যাচ খেলছে কোনও শিক্ষার্থীর সঙ্গে।
সার্ভ করল আনন্দ।
সেই একই জায়গায় বল পড়ল। মসৃণ অথচ তীব্রবেগে। জিমি ডান দিকে ঝাঁপিয়ে ব্যাক হ্যান্ডে কোনওরকমে র্যাকেট ছোঁয়াল। উঁচু হয়ে বলটা উঠল। হঠাৎ গুডলেংথ থেকে লাফিয়ে ওঠা বলে ব্যাট পাতলে সিলি মিড অনের মাথার ওপর যেরকম ক্যাচ ওঠে। সার্ভিস করেই আনন্দ ছুটে এসেছিল নেটের দিকে। জিমি বেস লাইনের ওপর অসহায় ভাবে দাঁড়িয়ে দেখছে বলটা নেটের ওপর আলতোভাবে নামছে। বাঁ হাত কোমরে রেখে অতি অবহেলায় আনন্দ ফাঁকা কোর্টের আর এক প্রান্তে ভলি মারল। খুব আস্তে টুং করে। ফিরে তাকালও না আর। যেন, এ তো জানা কথাই পয়েন্ট পাব! তারপর আবার সারভ করার জন্য আলস্যভরে বেস লাইনের দিকে যেতে যেতে বলবয়ের ছুড়ে দেওয়া বল থেকে একটা লুফে নিল।
মাইক্রোফোনে আম্পায়ারের গলা : ”থার্টি—লাভ।”
আবার প্রচণ্ড সার্ভিস। সেন্টার লাইনে খড়ির দাগ একটা জায়গায় হালকা ধোঁয়ার মতো উড়তে দেখা গেল। ‘এস’! দাগের ওপর বল পড়েছে। চারদিকের স্ট্যান্ডে গুঞ্জন উঠেই মিলিয়ে গেল। জিমি লাইনের দিকে তাকিয়ে দুহাত মুঠো করে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে বিড়বিড় করল। সয়্যার করছে। গালাগাল দিচ্ছে। দিক। দিতেই হবে। জবাব দেবে কী করে এইরকম সার্ভিসের!”
”ফর্টি—লাভ।”
কী যেন বলেছিল জিমি রিপোর্টারের কাছে?—আই অ্যাম গেটিং বেটার। আই নাউ হ্যাভ মোর শটস। দেয়ার ইজ নো প্রেশার অন মি। আত্মম্ভরিতা। ঠাণ্ডা মেজাজে, আনন্দ, ঠাণ্ডা মেজাজে খেলে যাও। পৃথিবীর একনম্বর তোমার সামনে। কাল রাত্রে যেমনই ছকে রেখেছ, ঠিক সেইভাবে বরফের মতো মাথা ঠাণ্ডা রেখে খেলে যাও। মন্থর করো খেলাটাকে। জিমিকে নেটে আসতে দিয়ো না, তা হলে তোমায় খুন করে ফেলবে। বেস লাইনে ঠেলে রাখো ওকে। তুমি যত মারবে, ততই ওর সুবিধা, যে ব্যাটসম্যানের হাতে স্ট্রোক আছে, ফাস্ট পিচ তাকে খুশি করে। কোনর্সের হাতে সবরকম মার আছে। মনে আছে উইম্বলডন—বিজয়ীদের নাম লেখা বিরাট বোর্ডটার ওপরে কিপলিংয়ের লাইনটা? যখন সবাই তোমার সম্পর্কে সন্দিহান তখন যদি নিজের উপর বিশ্বাস রাখতে পারো…
বিশ্বাস রাখো, আনন্দ। তুমি পারবে। পারবে। পারতেই হবে, কেননা—
সার্ভ করল আনন্দ।
বলটাকে ফোরহ্যান্ডে কোনর্স পেয়ে গেছে। আনন্দর ডান দিকে রিটার্নটা এল। সাইড লাইন বরাবর সে ফোরহ্যান্ডে মারল। কী অবিশ্বাস্য কোনর্সের ছোটা। নিমেষে বলের কাছে পৌঁছেছে। বিদ্যুৎগতি ক্রসকোর্ট শট এল আনন্দর ব্যাকহ্যান্ডে। বলটা সে কোনর্সের কোর্টের মাঝামাঝি মারল। এইবার দুহাতে র্যাকেট ধরে ভয়ঙ্কর ব্যাকহ্যান্ড মারবে ও।
কোনর্স মারল, এবং আনন্দ ঠিক সেইখানেই, যেখানে বল এল। যেন ও আগে থেকে জানত। স্টপ—ভলি করল আনন্দ সামান্য ঝুঁকে। কোনর্স ছুটে এসে চেষ্টা করল পাসিং শট। আনন্দর লম্বা হাতে বাড়ানো র্যাকেট বিদ্যুৎগতিতে বলটাকে মাঝপথে আটকে দিয়ে ফেরত পাঠাল কোনর্সের কোর্টে। নেটের কাছে দাঁড়ানো কোনর্স অসহায়ভাবে পিছনে তাকিয়ে ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের মতো মাটিতে পা ঠুকল।
