”ওইভাবেই ইচ্ছাটা পূরণ করে। স্বপ্নে তুমি যা খুশি হতে পারো। স্বপ্ন দেখে তারাই যাদের মন আছে, ইচ্ছে আছে। দুর্বল লোকে স্বপ্ন দেখতে পারে না, আমার অনেক ইচ্ছে আছে, জানি সেগুলো পূরণ হওয়া সম্ভব নয় তাই স্বপ্নে পূরণ করি, সেখানে আর একটা পৃথিবী আর এক অমল, সে সব জেতে—সব সব। ইচ্ছে করলে হারতেও পারি, এত ক্ষমতা আমার। নিজেকে বিরাট মনে হয় সেই পৃথিবীতে, তাই সারাক্ষণ সেখানেই থাকি।”
”সারাক্ষণ স্বপ্ন দেখো!”
”চমৎকার সময় কাটে। একটা পাঁচ বছরের বাচ্চচাকেও আমি দৌড়ে হারাতে পারব না। কিন্তু আমি সাড়ে ন’ সেকেন্ডে ওয়ার্লড রেকর্ড করে বোরজভকে হারিয়েছি মিউনিখে। বিকিলাকে হারিয়েছি ম্যারাথনে।”
”আকি—বুয়াকে?”
”চেষ্টা করিনি।”
”মার্ক স্পিজকে?”
”সাঁতার ভাল লাগে না।”
”কী ভাল লাগে তোমার?”
অমল কাঁধে গাল ঘষল। ওর চোখে আর চুম্বক নেই। একপায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার কষ্টটা চোখে ধরা পড়ছে। আনন্দ ভাবল ওকে বলে ভিতরে এসে বিছানায় তুমি শোও। কিন্তু ও আসবে না। প্রথমদিন ভিতরে আসতে বলেছিল, তখনও বলে ঘরের মধ্যে কিছুক্ষণ থাকলেই নাকি ওর মাথার মধ্যে কেমন করে। সব কিছু মনে হয় তার পায়ের মতো সরু দোমড়ানো এমন কী মানুষের মুখ চোখও ভাঙাচোরা বাঁকানো মনে হয়। তাই বাড়ির বাইরেই সারাক্ষণ কাটায়। আনন্দর কাছে এটা অদ্ভুত লেগেছিল। সে চেষ্টা করেও মানুষকে সরু যা দোমড়ানো চেহারা করতে পারে না। এজন্য মনের মধ্যে তা হলে দয়ানিধির দোকানের অদ্ভুত আয়নাটার মতো একটা আয়না দরকার যেখানে তাকালেই মুখটা লম্বা চ্যাপ্টা তোবড়ানো দেখাবে।
”কাল রাতে আমি ডাক্তার হয়েছিলাম। বিরাট কেউ নয় খুব অখ্যাত সার্জন। কেউ সাহস পাচ্ছে না… একটা হার্টবদল করার অপারেশন, পি জি হাসপাতালে। আমি গিয়ে বললাম, আমি করে দেব। ওরা বিশ্বাসই করতে চাইছিল না। যাই হোক শেষকালে রাজি হল, কেননা…”
”কেননা, ছেলেটা এমনিই তো মারা যাবে।”
”ছেলেটা! কে বলল?”
”আমি জানি। তারপর?”
”আটঘণ্টা ধরে করলাম।”
”সাকসেসফুল?”
”নিশ্চয়। এখন আবার সে নেটে প্র্যাকটিস শুরু করেছে। আমি দাঁড়িয়ে দেখছিলাম, সে কাছে এসে বলল…”
”জানি। সে বলল অমল তোমার জন্য আমিও স্বপ্ন দেখব। তোমার পোলিও সেরে গেছে, তুমি ছুটছ, ভীষণ জোরে ছুটছ, সবাইকে হারিয়ে দিচ্ছ, ট্রফি জিতছ। তোমার জন্য ওলিম্পিকে ভারতের পতাকা উঠছে, জনগণমন সুর বাজছে।”
নীলচে আকাশে যেন সোনালি রোদের আভা ছড়িয়ে পড়েছে। গভীর ঝকঝকে চাহনি আনন্দর মুখের উপর বোলাতে বোলাতে অমল ঠোঁট টিপে মাথা নাড়তে লাগল।
”না না না, তার থেকে বরং তুমি এক কাজ করো, রোজওয়ালাকে উইম্বলডন জেতাও। মানোলিউ তবু ষোলো বছর পর জিতেছিল, কিন্তু রোজওয়াল সেই কবে একুশ বছর আগে প্রথম উইম্বলডনে খেলেছে কিন্তু এবারও হেরে গেল। ভাবলে কষ্ট হয় না? বছরের পর বছর চেষ্টা করে যাচ্ছে কিন্তু তার জিততে পারবে মনে হয় না, বয়স তো হয়েছে। চারবার ফাইনালে উঠে হেরেছে, বুড়ো হয়ে গেছে, আর কবে জিতবে বলতে পারো?”
হালকা বিষণ্ণ মেঘে অমলের চোখ ঢেকে গেল। আনন্দ ফিসফিস করে বলল, ”জিতবে। কোনর্সকেই হারাবে।”
”বলছ কী? সিক্স—ওয়ান, সিক্স—ওয়ান, সিক্স—ফোর, বিশ্রীভাবে কোর্নস এবার জিতেছে। ওকে হারানো রোজওয়ালের পক্ষে আর সম্ভব?”
”ইন্ডিয়ার আনন্দ ওকে হারাবে।” তারপরই নিজেকে শুধরে বলল, ”আনন্দ মানে কিন্তু অমৃতরাজ নয়।”
”জানি। এ আনন্দ আমাদের।”
পিছনে শব্দ হতেই আনন্দ ফিরে তাকাল। বিপিনদা বিরক্ত মুখে দাঁড়িয়ে।
”দুপুরে তোমার ঘুমোবার কথা, আর তুমি গপ্পো করে যাচ্ছ? ডাক্তারবাবু কী বলে গেলেন সেদিন মনে নেই? কার সঙ্গে গপ্পো করছিলে?”
আনন্দ জানলার দিকে তাকাল। অমল নেই।
”কার সঙ্গে আবার গল্প করব। টেপ রেকর্ডার চালাচ্ছিলাম তো। শুনবে?”
আনন্দ বোতাম টিপল টেপ উলটোদিকে গোটাবার জন্য। থামিয়ে এবার ‘প্লে’ বোতাম টিপল।
”উকিলবাবু, আপনার কাছেই আছে হীরা দত্তর দানপত্রটা। আপনি সেক্রেটারি, আপনার উচিত নয় কি ইনস্টিটিউটের স্বার্থ দেখা?”
আনন্দ তাকাল বিপিনদার দিকে। ডগুদার সঙ্গে অনাদিপ্রসাদের কথার টেপ। চেম্বার থেকে ডগুদার গলার শব্দ পেয়েই রেকর্ডার চালিয়ে দিয়ে ঘরের ভিতরের জানলাটার উপর রেখেছিল। বিপিনদা অবাক হয়ে শুনছে।
”দানপত্র আমার কাছে আছে, কে বলল? তাছাড়া জমিটা দানই করে দিয়েছে, এটাই বা তোমার মাথায় এল কী করে? ওটায় খেলতে দিয়েছিল শিবার বাবা, দান করে দেয়নি।”
”বাজে কথা, আপনি ওর উকিল, ওর কাছ থেকে টাকা পান, তাই শিবা দত্তর হয়ে বলছেন।”
”ডগু, ভদ্রভাবে কথা বলো।”
”আমরা সবাই জানি, এ জমির মালিক ইনস্টিটিউট। কারখানার সুবিধে হয় বলে জমিটা গাপ করতে চাইছে। আপনি তাকে সাহায্য করছেন।”
”তুমি বেরিয়ে যাও, নয়তো ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বার করে দেব, আর মাঠে যদি ওইরকম অসভ্যর মতো পোশাক পরা মেয়েছেলে দেখি, তোমাকে—”
”কী আমাকে? মারবেন! কাটবেন!”
”যাতে ভালমতো শিক্ষা পাও, সেই ব্যবস্থাই করব।”
আনন্দ বন্ধ করে দিল রেকর্ডার।
”কারোর সঙ্গে গল্প করিনি, এবার বুঝলে?”
”সেইদিন রাতে ডগুবাবু যে ঝামেলা করে গেল, সেই সব কথা। কী আশ্চর্য, অদ্ভুত যন্তাোর বার করেছে তো!”
