”ফার্স্ট গেম টু ব্যানার্জি।”
এবার কোনর্সের সারভিস। বিনীত মৃদু ভঙ্গিতে আনন্দ অতিরিক্ত বলগুলো যেভাবে নেট থেকে ব্যাট দিয়ে মেরে বোলারের কাছে ফেরত দেয় সেই ভঙ্গিতে এক এক করে র্যাকেটে মেরে ধীরে ধীরে পাঠিয়ে দিল কোনর্সের কোর্টে। কোনর্সের বন্ধু নাসতাসে হাত মুঠো করে ঝাঁকাচ্ছে। ন্যাস্টি উৎসাহ দিচ্ছে।
আনন্দ তাকাল আম্পায়ারের পিছনে স্ট্যাডের দিকে। পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চির ছোট্টখাট্ট একটা মানুষ, সঙ্গে স্ত্রী আর দুই ছেলে। বাইশ বছর আগে, আনন্দর জন্মেরও আগে প্রথম এখানে খেলেছে। আজও জিততে পারেনি। এবারের ফাইনালে কোনর্সের মুখোমুখি হলে কোনর্স ওকে খেয়ে ফেলবে। হয়তো কোনওদিনই আর জেতা হবে না।
চোখাচোখি হল। আনন্দ মাথা ঝুঁকিয়ে নমস্কার জানাল। রোজওয়াল মাথাটা সামান্য পাশে হেলাল। চোখে চাপা হাসি। অন্যদিক থেকে রোজওয়াল এবারেও ফাইনালে উঠেছে সেমি ফাইনালে নিউকোমবকে হারিয়ে। আনন্দর মনে হল, সে ওর ছেলের বয়সী।
কোনর্স সারভিস শুরু করতে যাচ্ছে—
”আগুন, আগুন, আগুন।”
.
খাটের ওপর উঠে বসল আনন্দ। পুবের জানলা দিয়ে যতটা সম্ভব দেখার চেষ্টা করল। মাঠের ওপর দিয়ে কারখানার কয়েকটা লোক ছুটে গেল। হইচইয়ের আওয়াজে মনে হচ্ছে আগুন কারখানাতেই লেগেছে।
দেখার জন্য আনন্দ ফটকের কাছে আসতেই বিপিনদার ধমক খেল।
”দেখতে হবে না। যাও, ঘরে যাও। সামান্য আগুন, নিভিয়ে ফেলেছে।”
খেলার মধ্যে হঠাৎ বাধা পড়ায়, আনন্দ আর মেজাজ পাচ্ছে না। বিছানায় শুয়ে ঘড়ি দেখল। দুপুর দেড়টা। প্রথম সেটটা সে পর পর কোনর্সের তিনটে সার্ভিস ভেঙে নিয়ে নিল ৬—০ গেমে। আধমিনিটের মধ্যেই ব্যাপারটা চুকে গেল।
এবার দ্বিতীয় সেট।
.
সময় নষ্ট করে লাভ কী! এবারে ৬—১। তিনবার ডিউস হয়েছে। একটা গেম নিশ্চয়ই কোনর্স নেবে। অতবড় প্লেয়ার … ৬—২ হতে পারে। দুটো গেম নিলে কী এসে যায় তার। লন্ডনে নিশ্চয়ই প্রচুর ইন্ডিয়ান আছে। বাঙালিও আছে। যারা লর্ডসে গিয়ে অপমানে খেপে, লজ্জায় মাথা নামিয়েছিল ৪২ রানের ইনিংস দেখে, তারা নিশ্চয় উইম্বলডনে এসেছে।
থার্ড সেট।
১—১; ২—২; ৩—৩; ৪—৪; ৪—৫। আনন্দ পিছিয়ে গেছে।
কোনর্সের সার্ভিস এবার। আগের গেমে প্রচণ্ড খেলে আনন্দর সার্ভিস ভেঙে সে এগিয়ে এসেছে ৫—৪ হয়ে। আনন্দ চারদিকে তাকাল। মুখগুলো উত্তেজনায় টসটস করছে। ঠাসাঠাসি ভিড়ে লোক উপচে পড়ছে স্ট্যান্ড থেকে।
”লড়ে যা বাঙালি।”
একটা তীক্ষ্নস্বর বাংলা শব্দগুলোকে সেন্টার কোর্টের এ—প্রান্ত থেকে ও—প্রান্তে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। আনন্দ একবার তাকাল স্ট্যান্ডের দিকে।
কোনর্স সার্ভ করছে। বলটা জমিতে ছোবল দিয়ে বেরিয়ে গেল।
”ফিফটিন—লাভ।”
মাথা ঠাণ্ডা রাখো, আনন্দ। জয় মুঠোয় আসতে এখনও অনেক পয়েন্ট বাকি। কোনর্স দারুণ লড়তে পারে। আলগা দিয়ো না।
বাঁ হাত কোমরে রেখে র্যাকেট ধরা ডান হাতটা ঝুলিয়ে আনন্দ, যেন ম্যাচ খেলছে না, খেলা দেখছে এমন উদাসীন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। ক্লাব টুর্নামেন্টের মতো যেন ব্যাপারটা। কোনর্স দুই আঙুলে ‘ভি’ দেখাল। ভিকট্রি? আনন্দর ঠোঁট তাচ্ছিল্যে মুচড়ে গেল।
সার্ভিস করেছে কোর্নস, প্রচণ্ড জোরালো। আনন্দ র্যাকেট ঠেকাতেই, থার্ডম্যানের দিকে ক্যাচ ওঠার মতো বল ছিটকে স্ট্যান্ডের দিকে চলে গেল।
”কাম অন ব্যানার্জি।”
”থার্টি—লাভ টু কোনর্স।”
”বাঙালি জা—গ—ও।’
আনন্দ হেসে ফেলল।
”হচ্ছে কী আনন্দ। স্টেডি স্টেডি।”
”প্লিজ রিফ্রেন ফ্রম এনি রিমার্কস।”
নাসতাসে ডান হাতের ঘুঁষি বাঁ হাতের তালুতে মারছে। কোনর্স ‘ভি’ দেখাল মুখ ভেঙচে। আনন্দ আড়চোখে লক্ষ করল, রোজওয়াল তার দিকে তাকিয়ে। কী বিষণ্ণ দুঃখী চাহনি। বুকটা মুচড়ে উঠল আনন্দর। ঘাবড়াচ্ছ কেন। তুমি নিশ্চিত থাকো, আমিই ফাইনালে যাব। সেখানে তুমি আমাকে হারাবে।
কোনর্সের সার্ভ। আনন্দ প্রচণ্ড ফোরহ্যান্ড মারল। নেট ঘেঁষে সাইড লাইন ছুঁয়ে বল বেরিয়ে গেল।
”থার্টি—ফিফটিন।”
কোনর্স সার্ভ করল। দুর্দান্ত ব্যাকহ্যান্ড রিটার্ন তার বাঁ দিকে।
”থার্টি—অল।”
এবারের সার্ভিসটাও দারুণ রিটার্ন করল আনন্দ। ডাউন দ্য লাইন বেরিয়ে গেল পনেরো হাজার লোককে চমকে দিয়ে। তারপর উচ্ছ্বাসের বিরাট একটা শব্দে সেন্টার কোর্ট কেঁপে উঠল। আনন্দ গেমটা জিতেছে। এখন ৫—৫।
সেটটা জিতলেই ম্যাচটাও জেতা হয়ে যাবে। ক্লান্ত বোধ করল আনন্দ। এখনি জিতে কী লাভ! আকাশ জুড়ে গনগনে কারখানার ফার্নেসের মতো তাপ ছড়িয়ে। ফার্নেসের খোলা দরজাটার মতো সূর্য। গরমে ঘামে এক ধরনের আলস্য আনন্দের চোখে জড়িয়ে এল।
ফাইনালে রোজওয়ালের কাছে কি হেরে যাব? ইন্ডিয়াকে এত বড় সম্মান থেকে বঞ্চিত করব? কৃষ্ণণ দুবার সেমিফাইনালে উঠেছে। ব্যস, তারপর এই আনন্দ ব্যানার্জি। টেনিসের সব থেকে বড় সম্মান মুঠোয় পেয়েও ছেড়ে দেব? ভারতের ষাট কোটি লোক কী দারুণ আশা নিয়ে অপেক্ষা করবে রেডিয়োয় কান পেতে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে ভিড়। পটকা—বোমা নিয়ে নেতাজি পার্কে আড্ডা দেওয়া ছেলেগুলো চেঁচাচ্ছে—”আন্দো রে আন্দো, ওই যে ফাস্ট বল করত, নেটে একদিন মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিল একটা ছেলের। শান্ত চুপচাপ থাকত। ও যে এমন টেনিস খেলে! হোক না বটতলার ছেলে, আমাদেরই পাড়ার।” পটকা ফাটাবার জন্য ওরা অধীর হয়ে অপেক্ষা করবে। মেজদা তো অফিসই যাবে না। বাবা অবশ্য ঠিকই বেরোবে, চেম্বারেও বসবে। হাবুর মা বার বার হয়তো বিপিনদাকে জ্বালাবে—”হ্যাঁ গা, আমাদের আন্দো সাহেবের সঙ্গে কীসের লড়াই করতে গেছে? ছেলেটা বড় দুবলা, পারবে তো?” আর অমল কী করবে!
