”আমি বলছি সরাতে হবে… জানতেই পরবেন কে আমি।… আমি একজন পাবলিক, আমার বলার অধিকার আছে।”
”যান যান মশাই, পারেন তো কোর্টে গিয়ে প্রমাণ করুন যে এ জমি ইনস্টিটিউটের।”
”কোর্ট ফোর্ট কী দেখাচ্ছেন, রীতিমতো লেখাপড়া করে দান করা জমি। সবাই জানে…”
”দলিল আছে?”
”আলবাত আছে। সেক্রেটারি অনাদিবাবুর কাছে আছে।”
”মালিককে গিয়ে ওসব কথা…”
”সে ব্যাটার দেখা পেলে তো…”
”মুখ সামলে … লরি রোজ দাঁড়াবে… অ্যাই দরোয়ান, ড্রাইভারকে বলবে এখানে…”
”তুলে দোব কারখানা, আগুন জ্বালিয়ে দোব। এটা খেলার মাঠ, শিবা দত্তর কারখানার জমি নয়। দরকার হলে কোর্টেই যাব। অ্যাজিটেশন করব, আন্দোলন হবে।”
আনন্দ বোতাম টিপে বন্ধ করে দিল।
”ডগুদার ফেভারিট হবি আন্দোলন করা।” দুজনেই হাসল।
”প্রত্যেক মানুষেরই একটা না একটা হবি থাকেই। দেবুদার হল ডিটেকটিভ মেইগ্রে। তোমার কোনও হবি আছে?”
”না।”
অমল মুখ ফিরিয়ে রাখল অন্যমনস্কের মতো। আনন্দ মুখ নামিয়ে টেপরেকর্ডারে হাত বুলোতে লাগল।
”মা আর প্র্যাকটিস করতে আসবে না। এখানকার অনেকেই পছন্দ করছে না ওর হাফপ্যান্ট—”
”আমার বাবা?”
”তাছাড়া কারখানার তিন—চারটে লোক রাস্তায় কাল টিপ্পুনী কেটেচিল। বোধহয় ম্যানেজার কি মালিক পিছনে লাগতে বলে দিয়েছে। মা একজনকে চড় কষায়, আর একজনের কলার ধরে ঝাঁকিয়ে ছুড়ে ফেলে দেয়। ওরা শাসিয়েছে।”
”ছুড়ে ফেলে দিয়েছে।”
”হ্যাঁ। পারবে না কেন? মা—তো রোজ রাত্রে ঘরে ওয়েট—ট্রেনিং করে। ওজন তোলে, ওজন টানে, বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর।”
”ওজন?”
”লোহা। ইনস্টিটিউটে বারবেল, ডাম্বেল, পুলি পড়ে পড়ে নষ্ট হচ্ছিল। ডগুদা সেগুলো দিয়েছে। দিনের বেলায় কাজকর্ম ফেলে একসারসাইজ করতে দেখলে বাড়িতে রাগারাগি করবে তাই রাতে করে।”
”অদ্ভুত তো!”
”কেন? এই কি পৃথিবীতে প্রথম নাকি! মা প্রথমে রাজি হয়নি, বলেছিল এই বয়সে এসব করে তার কিছু হবে না। আমি বলেছিলুম হবে, আগে তো দৌড়ঝাঁপ করতে, আবার তুমি শুরু করো। তারপর শুনিয়েছিলাম রোমানিয়ার লিয়া মানোলিউয়ের কথা। মেকসিকো ওলিম্পিকে মেয়েদের ডিসকাস—এ সোনা জিতেছিল।”
”তুমি অনেক পড়েছ, অনেক খবর রাখো।”
”সামান্য সামান্য। কাগজে যা বেরোয় তাই একটু আধটু জানি। তা মানোলিউয়ের কথাটা শোনো, খুব ইন্টারেস্টিং। ওকে ট্রেনিং ক্যাম্পে আসতেই বারণ করেছিল ওদের ফেডারেশন, বয়স হয়ে যাওয়ার জন্য। বলেছিল, তোমার দ্বারা আর কিছু হওয়া সম্ভব নয়, সুতরাং মিছিমিছি কেন আর ট্রেনিংয়ে আসা। এর ন’মাস পরেই সে সোনা জেতে মেকসিকোয়। তখন বয়স কত জান? সাঁইত্রিশ! আমার মা—র বয়সও তাই। মাকে তো আর ওলিম্পিকে সোনা জিততে হবে না, পেতে হবে একটা চাকরি। ঘরের মধ্যে রাতের পর রাত মানোলিউ ওজন তুলেছে, তিন ঘণ্টা ধরে। সবাইকে ভুল প্রতিপন্ন করবেই করবে। ইচ্ছা থাকলে মানুষ কী না পারে? স্বামী, সন্তান সব ঘুমোচ্ছে,আর সে একা ট্রেনিং করে গেছে, সঙ্গী শুধু রেডিয়োটা, আর বিড়বিড় করে কবিতা আবৃত্তি করেছে যাতে শরীরের কষ্ট ভুলে থাকতে পারে। দৃশ্যটা ভাবতে পারো আনন্দ? কী ভয়ঙ্কর কষ্ট স্বীকার করে সোনা পেয়েছে! কী তেজ, কী রোখ।”
”তুমি ভাবতে পারো এমন দৃশ্য?”
একটুও ইতস্তত না করে অমল বলল, ”পারি। মানুষ যখন বার বার হেরে যায় তখন হাল ছেড়ে ভেঙে পড়ে। কিন্তু অনেকে পড়ে না। তারাই শেষ পর্যন্ত জেতে। মানোলিউ হেলসিঙ্কি থেকেই ওলিম্পিকে নামছে। সেখানে সিকসথ, মেলবোর্নে নাইনথ, রোমে ব্রোঞ্জ, টোকিয়োতে ব্রোঞ্জ। চারবার চেষ্টা করছে, সোনা পায়নি, তবু সে ভেঙে পড়েনি। ষোলো বছর পর মেকসিকোয় যখন ফাইনালে ছুড়তে এল, তখন ডান হাতে চোট। ডাক্তার ইনজেকশান দিয়ে বলেছে, একবার ছোড়ার পরই কিন্তু হাতের জোর কমে যাবে। শুধু একবারই জোরে ছুড়তে পারবে।”
অমলের চোখ দুটো স্থিরভাবে তাকিয়ে রয়েছে। আনন্দ বিছানায় উঠে বসল। চোখদুটো তাকে যেন চুম্বকের মতো টেনে নিচ্ছে।
”জিতল তো?”
”নিশ্চয়, প্রথমবারেই যা ছুড়েছিল তাতেই। কিন্তু তখন তার মনের অবস্থাটা কল্পনা করতে পার?”
”আমি কখনও এরকম অবস্থায় পড়িনি।”
”কল্পনা করো, একটা এইরকম অবস্থা তৈরি করো মনে মনে। ভাবো, তুমি জীবনের শেষ সুযোগের সামনে দাঁড়িয়েছ। সারা জীবন ধরে যে স্বপ্ন দেখেছ তা পূর্ণ হবে কি হবে না, সেটা তুমিই এই মুহূর্তে একমাত্র জানো। এইটাই শেষ, আর সুযোগ কখনও আসবে না তোমার কাছে। কল্পনা করো।”
”তুমি করতে পারো?”
অমল মাথা হেলাল।
”আমি ওলিম্পিকে একশো, দুশো, চারশো মিটারের সোনা জিতি।”
আনন্দ হেসে ফেলল।
”দেবুদা যেমন দারুণ জটিল খুনের মামলার আসামিকে নির্দোষ প্রমাণ করে জেতার স্বপ্ন দেখে।”
”হ্যাঁ। সবাই স্বপ্ন দেখে, ঘুমিয়ে নয় জেগে। আমার মতো সব মানুষের ভিতরেই কোনও না কোনও অঙ্গ পোলিয়োয় পঙ্গু হয়ে আছে মনে হয়। তাই আস্ত গোটা হবার জন্য স্বপ্ন দ্যাখে।”
”যাঃ কী বাজে কথা বলছ।”
”আমার যা মনে হয় তাই বললুম। সব মানুষই জিততে চায় কিন্তু পারে না এই পোলিয়োর জন্য। তুমি নিখুঁত মানুষ দেখেছ?”
আনন্দ একটু ভেবে মাথা নাড়ল।
”নিখুঁত হওয়া আর জেতা একই ব্যাপার। আসলে সবাই নিখুঁত হতে চায়।”
”তা হলে স্বপ্ন দেখে কী হবে?”
