ব্লাউজের মতো জামা আর হাফপ্যান্ট পরে কোমরে হাত দিয়ে গীতা হাঁফাচ্ছে। সকালের রোদে চিকচিক করছে ঘামে ভেজা শরীর। জমিতে আঁচড় কেটেই অমল চেঁচিয়ে উঠল।
”এক বিঘৎ বেশি!”
গীতা হাসল। চোখে অবিশ্বাস।
”সত্যি বলছি, তুমি এসে দেখে যাও।”
এগিয়ে এসে গীতা ঝুঁকে দেখল। অবিশ্বাস বদলে হল বিস্ময়।
”তুমি তো আমায় বিশ্বাসই করো না।”
”কেন করব? কাল তুই তো কমিয়ে দাগ কেটেছিলি। এক বিঘৎ না আর—কিছু, ইঞ্চি চারেক হবে।”
”আমার বিঘতের মাপে বলেছি।”
অমল হাসতে হাসতে কাছে এসে দাঁড়ানো আনন্দকে বলল, ”মায়ের আঙুলগুলো কত লম্বা দেখেছ?”
গীতার হাতটা সে তুলে ধরল আনন্দর দিকে। ছাড়িয়ে নিয়ে গীতা লোহার শটটা কুড়িয়ে সার্কলে ফিরে গেল।
”কাল বিকেলে তুমি চেঁচামেচি করেছিলে লরি দাঁড়ানোর জন্য?”
মাথা নেড়ে আনন্দ তাকাল লাইব্রেরির দিকে। দরজা বন্ধ।
”ডগুদা আজ সকালে শুনেই তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেছে শিবা দত্তর বাড়িতে যাবার জন্য। আমাকে দেখতে বলে গেছে লাইব্রেরি। দারুণ রেগেছে।”
একটি লোক বই হাতে আসছে। দেখেই অমল তার নিজস্ব ভঙ্গিতে ছুটল লাইব্রেরির দিকে।
লেডি সোবার্স শট গালে ঠেকিয়ে কুঁজো হয়ে তৈরি। আনন্দ পিছিয়ে এল। মাথাটা আরও ভার লাগছে। শরীরটা দুর্বল, কনুই আর হাঁটুতে ব্যথা। অন্তত একশো জ্বর।
”আ আ আহ… আঁ্যাঁক।”
ধপ শব্দ করে লোহার গোলাটা ভিজে মাটিতে বসে গেল। আনন্দ আপনা থেকেই দু তিন পা এগিয়ে থেমে পড়ল। হাতে করে গোলাটা ওর কাছে পৌঁছে দেবে কি না ইতস্তত করে ভাবছে। ততক্ষণে গীতা এগিয়ে এল। ভ্রূ কুঁচকে মাটির দিকে ঝুঁকে ইটের টুকরোটা দিয়ে দাগ কেটে, গোলাটা তুলে নিয়ে ফিরে গেল। আনন্দকে ধর্তব্যের মধ্যেই আনল না। আনন্দ কেমন যেন অপ্রতিভ বোধ করল।
আবার গোলাটা পড়ল। ইটে সাজানো সার্কলের কিনারে দেহের টলমলে ভারসাম্য সোজা করে রাখতে রাখতে গীতা তীক্ষ্নচোখে তাকাল যেখানে গোলাটা পড়েছে। আনন্দ হাত তুলে ওকে অপেক্ষা করতে ইঙ্গিত করল।
এগিয়ে এসে গোলাটা তুলে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আনন্দর মনে হল, এখান থেকে সার্কলটা মাত্র পনেরো—ষোলো হাত তো দূরত্ব! বোলার অ্যান্ডি কি হাতে করে পৌঁছে দিয়ে আসবে? একজন মেয়ে যদি ছুড়তে পারে এতটা তাহলে আমিই বা পারব না কেন, অমল কি সবাই? ভারী জিনিস তোলা বারণ, কিন্তু একবার তুললে এমন কী আর হবে! কিছু হয় কি না দেখাই যাক না।
ডান গালের কাছে গোলাটা ধরে আনন্দ ঠিক গীতার নকল করে কুঁজো হল। কনুইয়ে যন্ত্রণা, কবজি বেঁকে যাচ্ছে। গীতার মুখে হাসি খেলে গেল, তাই দেখে আনন্দর মুখেও হাসি ফুটল, শরীরে কী রকম একটা রোখ ঝাঁঝিয়ে উঠল। শরীরটা দোলাতে দোলাতে হাঁ করে নিশ্বাস নিয়ে ডান পায়ে ভর দিয়ে গীতার মতো ছোট ছোট দ্রুত লাফে গোলাটা ছোঁড়ার জন্য একধাপ লাফিয়েই হঠাৎ তার মনে হল সে অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে। চোখে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। চাপা চিৎকার করে সে পড়ে গেল মাটিতে। গোলাটা পড়ল তার ডান পায়ের পাতা ঘেঁষে।
যখন সংবিৎ ফিরল, আনন্দর মনে হল, সে যেন ঢেউয়ের উপর ভাসছে। চোখ খুলেই লজ্জায় চোখ বন্ধ করল। লেডি সোবার্স তাকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে চলেছে বাড়ির দিকে। পাশে হাঁটছে অমল!
”আমায় নামিয়ে দিন, এভাবে আমায় নিয়ে যাবেন না বাড়িতে।”
আনন্দর করুণ ক্ষীণ স্বর অগ্রাহ্য করেই ওরা ফটকের কাছে পৌঁছল।
”আর যাবেন না, নামিয়ে দিন এখানে।”
ওকে নামিয়ে দিল গীতা। এইরকম পোশাকে অচেনা বাড়িতে যেতে তারও সঙ্কোচবোধ হচ্ছে।
”পারবে হেঁটে যেতে? আর কখনও কিন্তু এমন কাণ্ড করবে না, অল্পের জন্য পা—টা বেঁচে গেছে। অমল, তুই ওকে ভিতরে পৌঁছে দিয়ে আয়। গা—টা বেশ গরম লাগছিল। বোধহয় জ্বর হয়েছে।”
গীতা তালুটা আনন্দর কপালে রাখল। তাড়াতাড়ি আনন্দ ফটক পেরিয়ে বাড়ির দিকে এগোল। হাঁটু কাঁপছে, হাঁ করে নিশ্বাস নিচ্ছে। দাঁড়িয়ে পড়ল সে।
”তুমি আমার কাঁধে হাত রেখে আস্তে আস্তে চলো। মা জানে না তোমার হার্টের অসুখ।”
পিছন থেকে এগিয়ে এল আনন্দ। আনন্দর ডান হাতটা ধরে নিজের কাঁধে রেখে বলল, ”চলো।”
আনন্দ ভয় পেল। অবশেষে এক বিকলাঙ্গের উপর ভর করতে হচ্ছে! অসম্ভব একটা রাগে ঝাঁঝরা হতে হতে অমলের কাঁধে চাপ দিয়ে বলল, ”আমার মরে যাওয়া উচিত, যাবও।”
”কেন?”
আনন্দ জবাব দিল না।
”রাগ করছ কেন? মানুষ মানুষের সাহায্য কি নেয় না বিপদে পড়লে? এতে লজ্জার কী আছে?”
”সে তুমি বুঝবে না।”
অমল হাসল। হাসিটা ম্লান দুঃখভরা। আনন্দ ইতস্তত করে বলল, ”তোমাকে সাহায্য নিয়ে চলতে হয়—”
”নিশ্চয়। তাই তো আমি ভাল করে জানি মানুষের কাছে মানুষ কত দরকারি।”
”কিন্তু আমারও মানুষকে দরকার। একা একা হাঁপিয়ে গেছি।”
”ঠিক আছে, মাঝে মাঝে আসব।”
বিপিনদার গলার শব্দ এগিয়ে আসছে। আনন্দ ভিতরে ঢুকে গেল।
.
”আজ কেমন আছ?”
আনন্দ বিছানার উপর গড়িয়ে জানলার ধারে সরে এসে মাথা হেলিয়ে হাসল, ”ভাল।”
উত্তরের জানলার শিক ধরে অমল কনুই দুটো জানলার পাটায় রেখে ঝুঁকে দাঁড়াল।
”কী করছিলে?”
আনন্দ টেপরেকর্ডারটা দেখাল।
”ভীষণ মজার জিনিস। কাল বিকেলে ডগুদার মাঠের ঝগড়ার ঘর থেকে যা শুনতে পাচ্ছিলাম, টেপ করেছি।”
আনন্দ ‘প্লে’ লেখা বোতামটা টিপল। প্রথমে খরখর শব্দ হয়ে দূরে মোটরগাড়ি চলার, উঠোনে বাসনের, দোতলায় বিপিনদার গলার, ট্রেনের ভেঁপুর আওয়াজের মধ্য দিয়ে প্রকট হতে লাগল ডগুদার সঙ্গে কারখানার ম্যানেজারের ঝগড়া।
