”সিজন কি তোমার জন্য বসে থাকবে নাকি। কর্পোরেশন তো অনেকদিন কমলদিঘিতে জল ছেড়েছে, হুঁশ নেই—”
ভেলো কথা থামিয়ে ফেলল। ক্ষিতীশ হাত তুলে রয়েছে। কোনি স্টার্টিং পজিশ্যনে।
”অন ইওর মার্ক… গেট সেট….” ক্ষিতীশ হাতটা নামাল। কোনি ঝাঁপাবার সঙ্গে সঙ্গে একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে নিয়ে পিছন ফিরে বলল, ”কি বলছিলিস?”
”হরিচরণরা ভয় পেয়ে গেছে।”
ভেলোর ধারেকাছে কেউ নেই, তবু সে এধার ওধার তাকিয়ে গলা নামিয়ে বলল, ”অমিয়া ও বেলা জুপিটারে আবার চলে এসেছে তো, সে খবর রাখো কি? ওদের ট্রেনিং চার্ট তৈরী করছে হরিচরণ। অমিয়া বলছে অতো ট্রেনিং লোড নিতে পারবো না। তাই নিয়ে হরির সঙ্গে তক্কাতক্কি হয়েছে। হরি বলছে, ”যদি ক্ষিদ্দার মেয়েটার হাতে মার না খেতে চাস তো হার্ড ট্রেনিং আরম্ভ কর।”
”করেও কোন লাভ নেই। কোনি এখন যে টাইম করছে, অমিয়ার পক্ষে সেখানে পৌঁছন সম্ভব হবে না।”
”তা হলে এবার ওকে জুপিটারের চ্যাম্পিয়নশিপে নামিয়ে, অমিয়াকে মার খাওয়াও। মনে আছে কি বলে অপমান করেছিল!”
জলে কোনির দিকে চোখ রেখে ক্ষিতীশ জবাব দিতে ভুলে গেল। ভেলো ধড়মড়িয়ে বলল, ”যা বলতে এসেছিলুম সেটাই বলা হয়নি। আর একটা দরজির দোকান ঠিক করেছি। দিনে প্রায় হাপ কেজি মাল হয়। ওরা তোমার জন্য রেখে দেবে, তুমি কালই যেও। এই নাও ঠিকানাটা।”
ভেলো চলে যাবার পর ক্ষিতীশ স্টার্টিং ব্লকের উপর বসে ওর কথাগুলো মনের মধ্যে নাড়াচাড়া করছিল। তখনই দেখল ধীরেন ঘোষ আর বদু চাটুজ্জে কমলদিঘির পশ্চিম গেট নিয়ে ঢুকে কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে আসছে তার দিকেই।
”ক্ষিদ্দা দেখছি উঠে—পড়ে লেগেছে। কদ্দুর হল?”
ক্ষিতীশকে যথাসম্ভব নিরাসক্ত হবার চেষ্টা করে ধীরেনকে বলল, ”কিসের কদ্দুর!”
”এই তোমার চ্যামপিয়ন তৈরী করার। এবার দিল্লীতে দেখলুম বোমবাইয়ের রমা যোশিকে। অসাধারণ, ফ্যান্টাস্টিক। ইন্ডিয়ায় এ রকম মেয়ে সুইমার কখনো হয়নি।”
”হ্যাঁ, ভালোই টাইম করেছে।” ক্ষিতীশ নিষ্প্রাণস্বরে বলল।
”তোমার এই গঙ্গা থেকে কুড়োনো মেয়েটা কেমন টাইম করছে?” বদু চাটুজ্জে নস্যির ডিবেটা রেলিংয়ে ঠুকে ঢাকনিটা খুলতে খুলতে বলল, ”ডন ফ্রেজারের টাইম ধরে ফেলেছে?”
”আর একটু বাকি আছে। কাল পরশুই ধরে ফেলবে।” ক্ষিতীশের চোখজোড়া মিটমিট করে উঠল।
কোনি তখন কিকিং বোর্ড ধরে স্প্রিন্ট করে যাচ্ছে। বদু চাটুজ্জে সেদিকে তাকিয়ে বলল, ”ঠাট্টা করলে আমার সঙ্গে!”
”ঠাট্টা! জলে নেমে এক বছরেই ডনের টাইম ধরে ফেলেছে কিনা জিজ্ঞাসা করলেন। এমন সিরিয়াস কথার পর কি ঠাট্টা চলে? আগে অমিয়াকে বিট করুক, তারপর বড় বড় ব্যাপার ভাবা যাবে।”
”তা বটে।” ধীরেন ঘোষ বিজ্ঞের মতো বলল। ”তবে অমিয়াকে বিট করা আর সম্ভব হলো না। এইটেই ওর লাস্ট সিজন। বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে, বিয়ের পরই চলে যাবে কানাডায়।”
ক্ষিতীশ সচকিত হয়ে উঠল। কোনি যদি অমিয়াকে না হারায়, তাহলে বিরাট একটা অপূর্ণতা ক্ষিতীশের জীবনে যেন রয়ে যাবে। চিরকাল যেন তাকে অতৃপ্ত থেকে যেতে হবে।
”তাহলে কোনিকে এবার তো নামিয়ে জানতে হয় বেঙ্গল চ্যাম্পিয়নের থেকে কত পিছনে রয়েছে।”
”না না, তা করতে যেওনা।” বদু চাটুজ্জে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ”সবে শুরু করছে। বাচ্চচা মেয়ে এখুনি বড় রকমের মার খেয়ে গেলে সেটব্যাক হবে। তাতে ওর ক্ষতিই হবে।”
”হোক। তবু তো পরে বলতে পারবে, অমিয়ার পা ধোয়া জল খেয়েছি।”
সেইদিনই নকুল মুখুজ্জেকে ক্ষিতীশ জানাল, এবার জুপিটারের কম্পিটিশনে কোনির এন্ট্রি অবশ্যই যেন দেওয়া হয়।
ক্ষিতীশ এবার আরো সতর্ক, আরো হিসেবী, আরো কঠিন হল কোনির ট্রেনিং সম্পর্কে। তীক্ষ্ন নজর রাখল কোনির হাবভাব, শোয়া, খাওয়া এবং বিশ্রামের দিকে। প্রতিমাসে একবার রক্তে হেমোগ্লোবিনের মাত্রা পরীক্ষা করে পরিশ্রমের ভার বাড়িয়ে যেতে লাগল। অ্যাপোলের ছেলেদের সঙ্গে এখন তাকে প্রতিযোগিতা করিয়ে সময় নেয়। ক্ষিতীশ একদিন কাগজে বড় অক্ষরে লাল কালিতে ‘৭০’ লিখে ক্লাবের বারান্দায় দেয়ালে সেঁটে দিল। কৌতূহলী প্রশ্নের উত্তরে সে হেসে বলল, ”অত বছর আমায় বাঁচতে হবে কিনা, সেটা যাতে মনে থাকে তাই চোখের সামনে রাখলাম রোজ দেখার জন্য।”
আসলে ওটা হচেছ ৭০ সেকেন্ড। সময়টা কোনির চোখে প্রতিদিন ভাসিয়ে রাখার জন্য শুধু ক্লাবেই নয়, বাড়িতেও দেয়ালে লিখে রেখেছে। রমা যোশি এখন লক্ষ্যের পাত্রী। এক মিনিট ১০ সেকেন্ডে কোনিকে এই বছরই সাঁতরাতে হবে।
”অসম্ভব বলে কিছুই নেই রে।” কোনিকে রাত্রে খাওয়ার পর বাড়ি পৌঁছে দেবার সময় ক্ষিতীশ বলে, ”বুঝলি, আমাদের শত্রু হচ্ছে সময়। এই ঘড়িটা।”
ক্ষিতীশ পকেট থেকে স্টপ ওয়াচটা বার করে কোনির চোখের সামনে ধরে। কোনি সেটা হাতে নিয়ে গভীর মনোযোগে দেখতে থাকে। বারবার চাবি টিপে দেখে কাঁটাটা থরথরিয়ে কেমন এগোচ্ছে।
”ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের দিকে এগোতে হলে, ছোটখাট রেকর্ডগুলো ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে এগোতে হবে।”
”ক্ষিদ্দা, অমিয়াদির রেকর্ড কবে ভাঙ্গবো?”
ঘড়িটা কানে লাগিয়ে কোনি হঠাৎ প্রশ্নটা করল।
ক্ষিতীশ হেসে বলল, ”কেন!”
”আজ দোকানে এসেছিল ব্লাউজ করাতে। আমাকে সকলের সামনে বলল, তুই এখানে ঝিয়ের কাজ করিস? জানো ক্ষিদ্দা, আমার খুব লজ্জা করল। আমার হাতের লেখাটা এতো খারাপ, নইলে খাতায় মাপ লেখার কাজ করতে পারতুম। তুমি বৌদিকে একটু বলবে? আমি রোজ তাহলে হাতের লেখা প্র্যাকটিস করব।”
