”বলব।” ক্ষিতীশ মৃদু স্বরে বলল। ”লজ্জা কখনো পুরোটা জিততে পারবি না। কাউন্টারের ওধারে বসলে খানিকটা জেতা হবে। ক্ষমতা দিয়ে জিততে হয়। তোর আসল লজ্জা জলে, আসল গর্বও জলে। যখন তোর ক্ষমতা খানিকটা বাড়াতে পারবি, শুধু তোর কেন, তখন আমারও মান তাতে বাড়বে, মানুষের মান বাড়বে।”
”মানুষেরও!” কোনি হকচকিয়ে বলল।
ক্ষিতীশ ওর পিঠে চাপড় দিয়ে ঝুঁকে ভারী গলায় বলল, ”হ্যাঁ, মানুষেরও। মানুষ শব্দের থেকে জোরে আকাশে উড়েছে, দশ সেকেন্ডের কমে ডাঙ্গায় একশো মিটার ছুটছে, জলে মেয়েরা এক মিনিটের বাধা ভেঙ্গেছে। স্বপ্নেও ভাবা যায়নি এমন সব পদ্ধতি লেবরেটরিতে, অপরেশন টেবলে মানুষ শিখেছে এই শরীরের আয়ু বাড়াতে। একদিন আসবে যখন আলোর গতিকে মানুষ হার মানাবে, ইচ্ছামত বয়সটা বাড়াবে। এই যে রেকর্ড ভেঙ্গে মানুষ জলে, স্থলে, আকাশে এগোচ্ছে, এ সবই মানুষের মুক্তির চেষ্টা, এই ঘড়িটার হাত থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা। একদিন সব ঘড়ি ভেঙ্গে চুরমার করে দেবে মানুষ, সময়কে হারিয়ে দেবে মানুষ—”
”ক্ষিদ্দা, কাঁধে লাগছে।’ কোনি অস্ফুটে কাতরে উঠল। কোনির কাঁধে উত্তেজিত আঙুলগুলো চেপে বসে গেছে। ক্ষিতীশ লজ্জা পেয়ে হাতটা নামিয়ে নিল।
”অনেক সময় আবোলতাবোল বকি। তুই এসব কথা বুঝতে পারিস?”
কোনি মাথা নাড়ল। ক্ষিতীশ যেন তাতে নিশ্চিন্ত হল, এমন স্বরে বলল, ”তোর পক্ষে এসব শক্ত কথা। তবে আরো বড়ো হ, বুঝতে পারবি।”
”ক্ষিদ্দা, তুমি কিন্তু বললে না, আমার টাইম অমিয়াদির রেকর্ডের থেকে কত পেছনে।”
”বলব বলব, একেবারে কম্পিটিশনেই দেখিয়ে দেব ব্যাটাদের, কে কার পায়ের জল খায়।”
এর তিনমাস পরই ক্ষিতীশ অ্যাপোলোর বারান্দায় দাঁড়িয়ে চীৎকার করে উঠল, ”বদমাইসি, এসব হচ্ছে ধীরেনের মদমাইসি। কোনির এন্ট্রি নেবে না কেন? অ্যাপোলোর সঙ্গে ঝগড়া, তাই বলে সুইমারদের ওপর ঝাল ঝাড়বে! প্রোটেস্ট করো, ইনজাংশন দাও… যা খুশি ইচ্ছে মতো করবে, এটা কি মগের মুল্লুক!”
নকুল মুখুজ্জে আর বিষ্টু ধর এবং আরো অনেকে সেখানে বসে। ক্ষিতীশ পায়চারি করছিল, থমকে জুপিটার ক্লাবের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, ”কোথায় নেমে গেছে—অপদার্থরা ক্লাবটাকে কোথায় নামিয়ে এনেছে! এখন ভয়ে ইতরোমো শুরু করেছে। ভেবেছে এইভাবে ক্ষিতীশ সিংগীকে আটকাবে।”
ফিসফিস করে বিষ্টু ধর বলল, ”এসব বিনোদ ভড়ের পরামর্শে হয়েছে। পাবলিককে এটা জানানো উচিত। প্রেস কনফারেন্স ডাকবো আমি।”
নকুল মুখুজ্জে ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
”এন্ট্রি রিফিউজ করার অধিকার ক্লাবের আছে! ওরা বলেছে ডেট পেরিয়ে গেছে তাই নেবে না। লাস্ট ডেট কবে সেটা তো ওরা বলে দেয়নি, সুতরাং আইনের ফাঁক রেখেছে। প্রোটেস্ট, ইনজাংশন কিছুই চলবে না।”
”এটা মরালিটির ব্যাপার।” ক্ষিতীশ অধৈর্য ভঙ্গিতে নিজের বুকে চাপড় দিল। ”এটা খেলার, এটা সাহসের, এটা চ্যালেঞ্জের ব্যাপার।”
নকুল মুখুজ্জের ঠোঁট বিদ্রূপে মুচড়ে উঠল। বিষ্টু ধর উত্তেজিত হয়ে বলল, ”তাহলে একটা ডিমনস্ট্রেশন করলে কেমন হয়। বিক্ষোভ প্রতিবাদ জুপিটারের সামনে, বিনোদ ভড়ের বাড়ির সামনে? একটা মিছিলও যদি পাড়ায় পাড়ায়—”
”ওতে অনেক ঝামেলা।” নকুল ঠাণ্ডা স্বরে বিষ্টু ধরকে মিইয়ে দিল। ”জুপিটারেরই পাবলিসিটি হবে, ওদের ইজ্জৎ একটুও তাতে কমবে না। আপনার ইলেকশন পর্যন্ত লোকে এসব মনেও রাখবে না। তার থেকে বরং অন্য কিছু ভাবা যেতে পারে। ক্ষিতীশ, তুই কি নিশ্চিত যে, কোনি এখন অমিয়াকে হারাতে পারে?”
”নিশ্চয়।” ক্ষিতীশ বলল দাঁতে দাঁত চেপে।
।। ১১ ।।
”কম্পিটিটরস ফর দ্য লেডিজ হান্ড্রেড মিটার ফ্রি স্টাইল ইভেন্ট, প্লিজ কাম টু দিয়ার স্টার্টিং ব্লকস।”
জুপিটার সুইমিং ক্লাবের কম্পিটিশন প্রতি বছরই এইরকম জাঁকালোভাবে হয়। কমলদিঘির অর্ধাংশের চারটে গেট বন্ধ করে, জুপিটারের অংশটুকু টিন দিয়ে ঘেরা হয়েছে। কাঠের গ্যালারি তৈরী করা হয় দিঘির তিন—চতুর্থাংশ ঘিরে। সাঁতার শুরু হয় যেদিকের প্ল্যাটফর্ম থেকে, তার পিছনে তিন সারি বিশিষ্ট অতিথিদের চেয়ার এবং পিছনেও গ্যালারি। প্ল্যাটফর্মের একধারে টেবিল। সেখানে মাইক্রোফোন নিয়ে ঘোষক আর জনা পাঁচেক টাইম রেকর্ডার। বুকে ব্যাজ ঝুলিয়ে, কয়েকটা স্যুভেনির হাতে ধীরেন ঘোষ বিশিষ্ট অতিথিদের তদারকিতে ব্যস্ত। কম্পিটিশনের চিফ রেফারি হরিচরণ।
ভিড়ে আজ ফেটে পড়ছে কমলদিঘি। গ্যালারি ভেঙ্গে কয়েকজন মাটিতে পড়েছে। একজনের হাত ভেঙ্গেছে। রেলিংয়ের ভিতরে পাড় ঘিরে লোক দাঁড়িয়ে। দুটি ছেলে ভিড়ের ধাক্কায় জলে পড়েছিল। অবশ্য তারা সাঁতার জানে। ডাইভিং বোর্ডে উঠেছে বহু ছেলে। জুপিটারের এলাকা যেখানে শেষ হয়েছে অর্থাৎ টিনের বেড়ার পরেই অ্যাপোলোর এলাকায় রেলিং ঘিরে হাজার দুয়েক মানুষ। তারা দূর থেকেই প্রতিযোগিতা দেখবে।
প্রতিযোগিতার আজ শেষ দিন। দুপুর আড়াইটে থেকে শুরু হয়েছে। ছেলেদের এবং ছোট মেয়েদের তিনটি বিষয়ের ফাইনাল হয়ে যাবার পর ঘোষণা শোনা গেল : ”কম্পিটিটরস ফর দ্য লেডিজ হান্ড্রেড মিটার ফ্রি স্টাইল ইভেন্ট, প্লিজ। … উইল কম্পিটিটরস কাম টু দিয়ার পোজিশনস? দিস ইজ সেকেন্ড কল…”
কমলদিঘির অ্যাপোলোর অংশে এতক্ষণ একজন, পাড়ের কাছে মন্থরভাবে সাঁতার কাটছিল। অ্যাপোলোর স্টার্টিং প্ল্যাটফর্মটা জুপিটারেরই পঞ্চাশ মিটার পাশে। সেখানে চুপচাপ বসে চোখে পুরু কাঁচের চশমা, মাথায় কাঁচাপাকা চুল একটি লোক! কেউ তাকে লক্ষ করছে না। আজ কমলদিঘির আনাচে—কানাচে সর্বত্রই লোক, সকলের চোখ জুপিটারের এলাকার দিকে।
