”কি করে বুঝলি?”
”ওই তো বড় ড্রামটা থেকে জল দিচ্ছে।”
”দ্যাখ তাহলে।”
কোনি এগিয়ে গেল ড্রামের কাছে দাঁড়ানো টিচারের দিকে। ক্ষিতীশ দেখল, কোনি তাকে কিছু বলতেই তিনি কোনিকে আপাদমস্তক দেখে মুখ ফিরিয়ে কি একটা জবাব দিলেন। তাইতে কোনি অপ্রতিভ হয়ে ফিরে এল।
”দিল না তো।”
কোনির মুখটা থমথমে। শুধু বলল, ”বড়লোকদের মেয়েদের স্কুল।”
”তাই দিল না বুঝি!” ক্ষিতীশ কৌতুকের সুরে বলল।
”বড়লোকরা গরীবদের ঘেন্না করে।”
ক্ষিতীশ এবার একটু অবাক হল। এইসব ধারণা এইটুকু কোনির মাথায় ঢুকল কি করে!
”তোকে কে বলল, বড়লোকরা গরীবদের ঘেন্না করে?”
”আমি জানি। দাদা আমায় বলেছিল, টাকা থাকলেই সবাই খাতির করে।”
”চল, জল খেয়ে আসি কল থেকে।”
ওরা দু—চার পা এগিয়েছে, তখনই একটি মেয়ে ”শুনুন, শুনুন” বলতে বলতে ছুটে এল। হাতে জলভরা প্লাস্টিকের দুটি গ্লাস।
ওরা ঘুরে দাঁড়াল। এবং দুজনেই চিনতে পারল জলের গ্লাস হাতে মেয়েটি হিয়া মিত্র।
”আপনারা জলে চেয়েছিলেন না? আমাদের মিস নন্দী বড্ড কড়া মেজাজের। ওর ব্যবহারের জন্য মাপ চাইছি।”
হিয়া জলভরা একটা গ্লাস এগিয়ে ধরল কোনির সামনে। কোনি তখন অদ্ভুত আচরণ করে বসল। ধাঁ করে সে গ্লাসে আঘাত করল হাত দিয়ে। গ্লাসটা হিয়ার হাত থেকে ছিটকে ঘাসে পড়ল। হতভম্ব শুধু হিয়াই নয়, ক্ষিতীশও।
”চাই না তোমাদের জল। আমাদের কলের জলই ভাল।”
কোনি হন হন করে একাই এগিয়ে গেল। ক্ষিতীশ অপ্রতিভ হয়ে বলল, ”আমি মাপ চাইছি এবার তোমার কাছে।”
হিয়া ব্যথিত মুখে বলল, ”এই গ্লাসের জলটা তাহলে আপনি খান।”
”নিশ্চয় নিশ্চয়।”
কোনিকে দারুণ বকবে ভেবেছিল ক্ষিতীশ। কিন্তু সে কিছুই বলেনি। হিয়াই যে কোনির ভবিষ্যৎ প্রতিদ্বন্দ্বী এটা ক্ষিতীশ বুঝে গেছে। বালিগঞ্জ সুইমিং ক্লাবে চারদিন সে গেছে নিছকই পরিচিতদের সঙ্গে দেখা করার ভান করে। হিয়ার ট্রেনিং সে দেখেছে। শুধু তাই নয়, পকেটে হাত ঢুকিয়ে লুকিয়ে স্টপওয়াচে হিয়ার পুরো দমে সাঁতারের সময় নিয়েছে। ক্ষিতীশের মনে হয়েছে, হিয়ার প্রতি কোনির হিংস্র আক্রোশটা ভোঁতা করে দেওয়া ঠিক হবে না। এটা বুকের মধ্যে পুষে রাখুক। এটাই ওকে উত্তেজিত করে বোমার মতো ফাটিয়ে দেবে আসল সময়ে।
ক্ষিতীশ তাই বকুনি দেওয়ার বদলে বলেছিল, ”হিয়া তখন আমাকে কি বলল জানিস? বলল, মেয়েটা আমার কাছে মার খেয়েছে তাই জ্বলে পুড়ে মরছে।”
এরপর ক্ষিতীশ লক্ষ করল কোনি জল থেকে উঠতে দেরী করছে।
।। ১০ ।।
দুর্গা পুজোর আগেই ক্লাবগুলোর প্রতিযোগিতা একটার পর একটা হয়ে গেল। ক্ষিতীশ একটিতেও কোনিকে নামায়নি, এমনকি অ্যাপোলোর প্রতিযোগিতাতেও নয়। যদিও এখন তার সময় অমিয়ার সময়ের প্রায় সমান, তবু ক্ষিতীশের ধারণা এখনো তার প্রকাশের উপযুক্ত সময় আসেনি। হিয়ার সময় এখন কত, সেটা না জানা পর্যন্ত কোনিকে সে বার করতে চায় না। এখন অনেকেই জেনে গেছে, ক্ষিতীশ একজন সাঁতারু তৈরী করছে। বালিগঞ্জ ক্লাবে সে গেলেই প্রণবেন্দুর নির্দেশে হিয়া এমনভাবে সাঁতার কাটে কিংবা জল থেকে উঠে পড়ে, যার ফলে ক্ষিতীশ ওর সময় নিতে পারে না। হিয়াও কোন প্রতিযোগিতায় নামেনি। তাইতে ক্ষিতীশ কিছুটা ভাবনায় পড়ল। প্রত্যেক ক্লাবের, এমনকি স্টেট চ্যামপিয়নশিপের ভিকট্রি স্ট্যান্ডেও অমিয়া আর বেলাকে উঠতে দেখা গেল।
একদিন খবরের কাগজে একটা খবর দেখে ক্ষিতীশ কেটে রেখে দিল। বোম্বাইয়ে মহারাষ্ট্র স্টেট চ্যাম্পিয়নশিপে রমা যোশি নামে একটি মেয়ে ১০০ মিটার ফ্রি স্টাইলে সময় করেছে ১ মিনিট ১২ সেকেন্ড। এক—কুড়ির উপরে সময় করাই ভারতীয় মেয়েদের রেওয়াজ, সেখানে এক বারো! ক্ষিতীশ এরপর কোনির ট্রেনিং আরো কঠিন করে তুলল।
এবার জাতীয় সাঁতার চ্যাম্পিয়নশিপ দিল্লীতে। পুজোর পর বাংলা দল রওনা হয়ে গেল। অমিয়া মেয়েদের দলের অধিনায়িকা। বাংলার মেয়েরা একটি সোনা দুটি রুপো, দুটি ব্রোঞ্জ নিয়ে ফিরল। সোনাটি অমিয়ার ১০০ মিটার ব্যাক স্ট্রোকে। রমা যোশি একাই ছয়টি সোনা জিতল চারটি ব্যক্তিগত রেকর্ড করে।
শীত এসে গেছে। কমলদিঘির জলও কমে গেছে। সোয়েটার পরা লোকেরা এখন সেখানে বেড়ায়। কেউ আর জলে নামে না। কিন্তু অব্যাহত কোনির দুবেলা জলে নামা। আপত্তি করেছিল অনেকেই। ক্ষিতীশ জবাবে শুধু বলেছে, ”যদি পারে তাহলে নামবে না কেন? সারা বছরই ট্রেনিংয়ে থাকা দরকার। প্র্যাকটিশ চাই, প্র্যাকটিশ। মুভমেন্টগুলো যেন অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায়, স্বাভাবিক হয়ে আসে। তা না হলে স্পীড বাড়ান যাবে না। এদেশে মাত্র ছ’মাস সাঁতার হয়, তাই তো এই শোচনীয় দশা।”
কোনিকে বাকি তিনটি স্ট্রোকও ক্ষিতীশ ইতিমধ্যে শিখিয়ে দিয়েছে। ফ্রি স্টাইল, বাটার ফ্লাই, ব্যাক এবং ব্রেস্ট এই চার রকমের স্ট্রোক মিলিয়ে কোনি এখন দিনে দু’মাইল হাড়ভাঙ্গা সাঁতার কাটে। কঞ্চির মতো শরীরটার ওজন বেড়ে হয়েছে ৫০ কেজি।
বছর ঘুরে নতুন বছর এল।
একদিন ভেলো, প্ল্যাটফর্মের উপর দাঁড়ানো ক্ষিতীশকে বলল, ”ক্ষিদ্দা, এ বছর ওকে কম্পিটিশনে নামাবে তো?”
ক্ষিতীশ তখন কোনির দুটো পায়ের গোছ বাঁধছিল রবারের দড়ি দিয়ে। পা বাঁধা অবস্থায় শুধু মাত্র হাতের পাড়িতে ওকে ‘পুল’ করতে হবে। ক্ষিতীশ অন্যমনস্কের মতো বলল, ”সিজন শুরু হয়ে গেছে?”
