আম্পায়ার কী একটা বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই ননীদা চিৎকার করলেন, ”আম্পায়ার, আইনে কোথাও কি বলা আছে যে, বোলারের সঙ্গে কেউ হাঁটতে পারবে না?”
মাথায় টোকা দিতে দিতে আম্পায়ার খুবই বিজ্ঞের মতো বলল, ”ঠিক ঠিক। আইনে বারণ করা নেই।”
বোলারটি বিড়বিড়িয়ে কতকগুলো অনুচ্চচার্য শব্দ মুখ থেকে নির্গত করে ছুটতে শুরু করা মাত্র ননীদাও ওর সঙ্গে সঙ্গে ছুটতে লাগলেন—”নো বল যেন না হয়। বোলিং ক্রিজের দিকে নজর রাখুন।”
তখনি বোলারটির দৌড়ের মধ্যে কী একটা গোলমাল হয়ে গেল, ফলে ডেলিভারির সময় ডান পাটি বোলিং ক্রিজের এক হাত বাইরে বেরিয়ে গেল। অঞ্জন ‘নো বল’ শোনামাত্র ননীদার নির্দেশ ভুলে গিয়ে চোখ বুজে ব্যাট চালাল। মাঠের সবাই মাথা তুলে দেখল, বলটি চমৎকারভাবে মিড উইকেট বাউন্ডারি টপকে ছটা রান সংগ্রহ করছে।
বোলারটি কটমট করে ননীদার দিকে তাকাতেই, ননীদা বিমর্ষ কণ্ঠে বললেন, ”বলেছিলুম বোলিং ক্রিজের দিকে নজর রাখুন। কথাটা শুনলেন না।”
পরের বল দেবার জন্য বোলার বোলিং মার্কে যাবার সময় ননীদা আবার তার সঙ্গ নিল।
”আম্পায়ার, দেখতে পাচ্ছেন না লোকটা কী করছে!”
”দেখেছি”, আম্পায়ার উদাসী গলায় বলল, ”সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছে। আইনে বারণ করা নেই।”
বল করার জন্য ছুটতে শুরু করামাত্র ননীদা চাপাস্বরে বললেন, ”এবার যেন নো বল না হয়, বোলিং ক্রিজে নজর রাখুন।”
এবার নো বল হল না। কিন্তু বোলিং ক্রিজে চোখ রাখার ফলেই, বল হাত থেকে বেরিয়ে যে—পথ ধরে এগোল তাতে থার্ড শ্লিপের পরলোকগমন অবশ্যম্ভাবী ছিল, যদি না সে ‘বাপরে’ বলে গালির ঘাড়ে লাফিয়ে পড়ত। আম্পায়ার ওয়াইড সঙ্কেত দেখাতে গিয়ে বাই বাউন্ডারি সঙ্কেত দেখাল।
আট উইকেটে ৪২। আর সাত রান করলেই আমাদের জিত। ননীদা ছায়ার মতো বোলারকে অনুসরণ করে চললেন। এবার বোলারটি আর সহ্য করতে না পেরে হাতা গুটিয়ে ননীদার দিকে এগোতেই, ননীদা ছুটে আম্পায়ারের কাছে এসে বললেন, ”দেখুন, মারতে আসছে।”
”ইউ ব্লাডি…(ছাপার অযোগ্য)…ইউ উল্লুক…(ছাপার অযোগ্য)…খুন করে ফেলব।”
”শুনলেন আম্পায়ার, শুনলেন!” ননীদা ঢালের মতো আম্পায়ারকে সামনে রেখে চেঁচাতে লাগলেন। ”ক্রিকেটের মতো খেলায় এই রকম অসভ্য গালাগাল!”
”নিকুচি করেছে তোর ক্রিকেটের।” বোলারটি সোজা এক রাইট হুক চালাল। ননীদা দক্ষতার সঙ্গে ঢালের আড়ালে আশ্রয় নিলেন। আম্পায়ার ”বাবা রে” আর্তনাদ করে ধীরে ধীরে বাঁ গালে হাত চেপে বসে পড়ল।
এক সপ্তাহ পরে আম্পায়ারের রিপোর্টের ভিত্তিতে সি এ বি লিগ সাব—কমিটি আমাদের পুরো পয়েন্ট দেয়। বোলারটি এক বছরের জন্য সাসপেন্ড হয়। তখন ননীদা শুধু বললেন, ”ট্যাকটিকস।”
স্বীকার করতে লজ্জা নেই, আমার দ্বারা এইরকম ট্যাকটিকস উদ্ভাবন সম্ভব নয়। কথাবার্তা ভাল করে গুছিয়ে বলতে পারি না, গায়ে পড়ে আলাপও জমাতে পারি না। অথচ ননীদার ট্যাকটিকস প্রয়োগ করতে হলে কথা বলাটাকে যে শিল্পের পর্যায়ে উঠিয়ে আনতে হবে, সেটা একবার হৃদয়ঙ্গম করেছিলাম ইস্ট সাবার্বানের সঙ্গে খেলায়।
মাঠে নামার মুখে আম্পায়ার দুজনের মধ্যে যে বয়স্ক, ননীদা তার সঙ্গে আলাপ শুরু করে দিলেন।
”আরে অনেকদিন পর দাদার সঙ্গে দেখা হল, আছেন কেমন?”
”আর থাকা। চলে যাচ্ছে একরকম করে। আপনি কেমন আছেন?” আম্পায়ার যথোচিত সৌজন্য দেখাল।
”আপনি যা বললেন, চলে যাচ্ছে একরকম করে।” ননীদা ঝট করে গলা নামিয়ে ফেলে বললেন, ”বুড়ো বয়সেও খেলতে নামতে হচ্ছে। এখনকার ছোকরার কিসসু জানে না। বোঝেও না। আমাকে এখনও ঠেকা দিয়ে যেতে হচ্ছে। স্টান্ডার্ড যে কোথায় নেমে গেছে, আপনাকে আর বোঝাব কী, নিজের চোখেই তো দেখছেন।”
আম্পায়ার অনুমোদনসূচক মাথা নাড়ল।
”ক্রিকেট খেলতে আসে অথচ ক্রিকেটের আইন জানে না। আজেবাজে অ্যাপিল করে, ঝগড়া করে, জোচ্চচুরি করে, খেলাটাকেই মাটি করে দেয়, যাকগে ওসব কথা, বাতের ব্যথাটা এখন কেমন?”
”মাঝে মাঝে চাগাড় দিচ্ছে।” আম্পায়ার যথেষ্ট অবাক হয়েই বলল। অবাক হবার কারণ, ননীদা জানল কী করে?
”আমাদের পাড়ায় এক কোবরেজের অদ্ভুত একটা তেল আছে। আমার কাকিমার পনেরো বছরের পুরনো বাত, মাত্র দু’ হপ্তা ব্যবহার করেই সেরে গেল।”
”সত্যি!” আম্পায়ার ব্যস্ত হয়ে বলল, ”ঠিকানাটা দেবেন?”
”উহুঁ ননীদা দুষ্ট দুষ্টু হেসে বললেন, ”কোবরেজের ঠিকানা নয়, আপনার ঠিকানা দিন। তৈরি করিয়ে আমি নিজে আপনাকে দিয়ে আসব। খেলার শেষে বরং আমাকে লিখে দেবেন।”
এইখান থেকেই ইস্ট সাবার্বানের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেল। ননীদা যখন বল করতে এলেন, তখন সাবার্বানের বিনা উইকেটে ৪১ রান। ওর প্রথম বলটা অনেকখানি ঘুরল, অফ স্টাম্প থেকে শর্ট ফাইন লেগে। সুইপ করতে গিয়ে ব্যাটসম্যান ফসকাল এবং প্যাডে লাগল। আম্পায়ারের দিকে ঘুরে ননীদা দু’হাত তুলেই জিভ কাটলেন। তারপর মাথা নাড়তে নাড়তে যেন নিজের মনেই বললেন, ”হয়নি হয়নি, আপিল করা চলে না। বেরিয়ে যাচ্ছিল বল।” তারপর বেশ গম্ভীর হয়ে আম্পায়ারকে বললেন, ”এখনকার ছোকরারা আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করত।”
বাতের হাত থেকে মুক্তিকামী আম্পায়ার দ্রুত ঘাড় নেড়ে ননীদাকে খুশি করল। দুটি বল পরেই অফ স্টাম্পের এক হাত বাইরে, ব্যাটসম্যান প্যাড প্লে করতেই ননীদা লাফিয়ে ”হা—আ—আ—উ” বলেই হাত দিয়ে মুখ চেপে আপিলটা আর সম্পূর্ণ করলেন না। ঘাড় বেঁকিয়ে বলের পিচের দিকে ২৫ সেকেন্ড তাকিয়ে রইলেন। তারপর প্রায় অনুনয়ের সুরে বললেন, ”ইগনোর ইট আম্পায়ার, কমপ্লিটলি ইগনোর দ্য আপিল। সরি, ভেরি সরি আপনাকে বিরক্ত করার জন্য।”
