সপরিবারে শ্রীমানীকে গাড়িতে তুলে ননীদা পি জি হাসপাতালে রওনা হলেন। আমরা মুহ্যমান হয়ে নিচু গলায় কথা বলছি। দুর্যোধন এসে বলল, ”পাতা পাতি দিব কি?”
আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম। এরপর আর খেলার দরকার কী! রঞ্জনবাবু ক্যামেরার ভাঙা টুকরোগুলো হাতে নিয়ে আমার কাছে এসে বলল, ”মতিবাবু, আমার দামি ক্যামেরাটা আপনার জন্য ভাঙল।”
”আমার জন্য!”
”নিশ্চয়। আপনিই তো বলেছিলেন হোঁদল—কুতকুতটার ছবি তুলতে।” রঞ্জনবাবুর গলা ভারী হয়ে এল। কয়েক ফোঁটা জল চোখ থেকে নেমে গোঁফ ভিজিয়ে দিল। আমার তখন একটা কথাই মনে হল, অফিসের দরজা দিয়ে হাতি ঢুকে গেলে রঞ্জন সেনগুপ্ত তাকাবে না, কিন্তু আমার পরিচিত একটি মাছিকেও আর গলতে দেবে না।
ভবানী ভীষণ মনমরা হয়ে বলল,, ”এখুনি লাঞ্চ করার দরকার কী, আমার ব্যাটিংটা হয়ে গেলেই তো হতে পারত। মিনুর আবার কবে মাঠে আসার সময় হবে কে জানে।”
লাঞ্চের সময় তন্ময় বলল, ”সরি, আই অ্যাম রিয়েলি সরি। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দই সন্দেশ লেবুও গাড়ি করে চলে যাবে এটা একদম ভাবিনি। লাঞ্চটা আমিই মাটি করে দিলুম।”
কিন্তু সি সি এইচ—এর কী ক্ষতি হল, সেটা আমার মতো দু—চারজন ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারল না।
৪
এইবারই আমার প্রথম ক্যাপ্টেনসি। রীতিমতো ভয় ভয় করছে। এতকাল ননীদার আওতায় খেলে এসেছি, কোনও ভাবনাচিন্তা ছিল না। পাহাড়ের আড়ালে ছিলাম। এখন বুঝতে পারছি ননীদাকে কতখানি দরকার। আমার অনভিজ্ঞতার কথা বলে ওঁর সাহায্য প্রার্থনা করতেই, ননীদা একগাল হেসে পিঠে গোটা চারেক থাপ্পড় মারলেন।
”অত ঘাবড়াবার কী আছে! এবারের টিম তো খুব খারাপ নয়! তাছাড়া ম্যাচ জেতা কিংবা হার বাঁচানো, সেটা তো আর সব সময় টিমের শক্তি দিয়ে হয় না, হয়—” ননীদা আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন, অনুক্ত শব্দটি পূরণ করে দেব এই আশায়।
আমি বললাম, ”স্ট্র্যাটেজি।”
ননীদা ভীষণ খুশি চাপতে চাপতে বললেন, ”পারবে, তুমি পারবে। তবে তুমি একটু ভিতু গোছের আর চক্ষুলজ্জাটা একটু বেশি। ওসব থাকলে কিন্তু বিপদ কাটিয়ে বেরোতে পারবে না।”
”সেইজন্যই তো আপনার কাছে এলাম।”
ননীদা কয়েক মুহূর্ত ভেবে বললেন, ”স্ট্র্যাটেজি নির্ভর করবে স্থান, কাল আর পাত্র বিচার করে। এজন্য তিনটে জিনিসের উপর জোর দেবে; এক আইনের ফাঁক খুঁজে বার করে তার সুযোগ নেওয়া। বেশির ভাগই তো ক্রিকেট আইন না জেনে খেলতে নামে, তাছাড়া আইনের নানান ব্যাখ্যাও করা যায়। তুমি দেখো, অনেক ফাঁক বেরিয়ে পড়বে যেখান দিয়ে গলে যেতে পারবে। দুই, আম্পায়ারদের স্টাডি করবে। উকিলরা যেমন জজকে স্টাডি করে, তার মনের প্রবণতা, দুর্বলতার সুযোগ নেয়, তেমনি। সব আম্পায়ার যে আইনের মারপ্যাঁচ বোঝে তাও নয়। তা ছাড়া আইনের ব্যাখ্যা আর প্রয়োগ বেশ শক্ত ব্যাপার। মানুষ মাত্রই চাটু কথা পছন্দ করে, এটা ভুলে যেয়ো না। তিন অপোনেন্ট প্লেয়ারদের ঘাবড়ে দিয়ে নার্ভাস করা, ধাঁধাঁয় ফেলা। ডবলু জি গ্রেস এটা করত। জিততে হলে সব কিছু করতে হবে। ভদ্রতা করলে কোনও কিছুতেই জেতা যায় না, এই কথাটা বরাবর মনে রাখবে।”
ননীদার উপদেশ শিরোধার্য করে বিদায় নিয়েছিলাম। না করে উপায় নেই। ওই তিন থিওরি অনুসরণ করে ননীদা যে কতবার সি সি এইচ—কে উদ্ধার করেছেন তার ইয়ত্তা নেই। কয়েকটার কথা জীবনে ভুলব না।
তরুণ মিলনের সঙ্গে খেলার কথা মনে পড়ল। ওদের ৪৮ রানে নামিয়ে দেওয়ার পর আমরা করলাম ৮ উইকেটে ৩২। হার অবধারিত। ননীদা তখন খেলতে নামলেন। আর একদিকে ব্যাট করছে অঞ্জন। ননীদা—নির্দেশিত ‘টিউবওয়েল টেপা’ ফরোয়ার্ড ডিফেনসিভ খেলে প্রায় আধঘণ্টা উইকেটে রয়েছে। ননীদা ক্রিজে পৌঁছে বলে দিলেন, ”বলের লাইনে পা, মাথা নিচু, স্ট্রেট ব্যাট। বাকি যা করার আমি করছি।”
এরপর ননীদা ননস্ট্রাইকার এন্ডে গিয়ে এগারো রানে ছয় উইকেট পাওয়া তরুণ মিলনের ওয়েস হলের সঙ্গে আলাপ শুরু করলেন। আমাদের দুজনের কপালে আলু তৈরি এবং একজনের দুটি দাঁত কমিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে এই বোলারটিই দায়ী। বাইশ পা দূরের বোলিং মার্কে ফিরে যাচ্ছে বোলারটি, ননীদাও তার সঙ্গে চললেন কথা বলতে বলতে।
”অনেক বড় বড় স্পিনার দেখেছি—ভেরিটি থেকে শুরু করে প্রসন্ন পর্যন্ত, কিন্তু কোনও স্পিনারকে আপনার মতো এতটা দৌড়ে এসে বল করতে দেখিনি।” ননীদা দারুণ বিস্মিত স্বরে বললেন।
”স্পিনার!” বোলারটি থেমে গেল। ”আমি স্পিনার? আপনি অন্ধ নাকি! আমার বল দেখে কি আপনার তাই মনে হল?”
”সেই রকমই তো লাগছে!” নিরীহ মুখে ননীদা একগাল হাসলেন।
রাগে বোলারটির চোখ দুটি ঠিকরে বেরিয়ে আসার উপক্রম। কথা না বলে সে আবার বোলিং মার্কের দিকে চলল, সঙ্গে ননীদাও।
”তবে মানতেই হবে, গুপ্তে কি রামাধিন কি বেনোর থেকে কিছুটা জোরে বল করেন।”
মার্কে পৌঁছে বোলারটি ঘুরে দাঁড়াল। দু’চোখ দিয়ে এবার আগুন বেরোচ্ছে। ননীদা ভ্রূক্ষেপ না করে বলে চললেন, ”আপনার বোলিং অ্যাকশন অনেকটা ফাস্ট বোলারেরই মতো, চেহারাটাও বেশ, তা হলে জোরে বল করেন না কেন?”
”আম্পায়ার!” তরুণ মিলনের ওয়েস হল বাইশ পা দূর থেকে চিৎকার করে উঠল।
”আপনি কি এ লোকটার কাণ্ড দেখতে পাচ্ছেন না? একে থামাবেন তো!”
