”তাতে কী হয়েছে, উত্তেজনায় ও রকম মুখ থেকে বেরিয়ে যায়ই।” আম্পায়ার সান্ত্বনা দিয়ে বলল।
কিন্তু কেন বেরোবে?” ননীদা অনুশোচনায় দগ্ধ হতে হতে বললেন, ”ডেড শ্যিওর না হয়ে কেন আপিল করব?”
ওভার শেষে মাথা নাড়তে নাড়তে ননীদা মিড অনে গিয়ে দাঁড়ালেন। আম্পায়ার গেল স্কোয়ার লেগে। পরের ওভারের দ্বিতীয় বলে ব্যাটসম্যানরা বিপজ্জনক একটি রান নিল। ননীদা বলটা উইকেটকিপারকে ছুড়তেই সে যখন উইকেট ভেঙে দিল, নন—স্ট্রাইকার তখন পপিং ক্রিজে পৌঁছে, পেরিয়ে গেছে। ননীদা চিৎকার করে উঠলেন রান আউটের আপিল করে। স্কোয়ার লেগ আম্পায়ার দ্বিধা না করে আঙুল তুলল।
”গুড ডিসিশ্যান।” ননীদা আম্পায়ারকে শুনিয়ে তারিফ করলেন। বিস্মিত ব্যাটসম্যানটি আম্পায়ারের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে রওনা হল। আমি ছিলাম সেকেন্ড শ্লিপে। এমন ডাহা বাজে রান আউট কল্পনা করা যায় না। একসময় ননীদাকে চাপা গলায় বললাম, ”ব্যাপার কী?”
”সাইকোলজি।” ননীদা জবাব দিলেন।
”ওর বাত আছে, সেটা কি জানতেন?”
”একদমই নয়। তবে পঞ্চাশ বয়সের উপর শতকরা ষাটটা বাঙালিরই তো বাত, নয়তো অম্বল আছে। তেল নয়তো বড়ি, দুটোর একটা লেগে যাবেই।”
”যদি লোকটার বাত না থাকত?”
”তা হলে ওর বাবা মা জ্যাঠা জ্যাঠি কারুর না কারুর তো পাওয়া যাবেই।”
ননীদার আপিলে সেই আম্পায়ারের কাছ থেকে চারটি এল বি ডবল্যু, দুটি কট বিহাইন্ড, একটি স্টাম্পিং ও দুটি রানআউট পেয়ে আমরা বিনা উইকেটে ৪১ রানের ইস্ট সাবার্বানকে ৬২ রানে নামিয়ে দিলাম।
কয়েকদিন পরে ননীদাকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম, তিসির তেলে রসুন, গোবর, কাঁচা লঙ্কাবাটা মিশিয়ে এক শিশি পাঠিয়ে দিয়েছেন আম্পায়ারকে। আমরা পরে ননীদার এই সব ট্যাকটিকসের নাম দিয়েছিলাম—ননীটিকস।’
আর একটি ননীটিকসও সিজনের প্রথম খেলার দিন সকালে মনে পড়ে গেল। ব্যাটসম্যান যখন খেলার জন্য তৈরি হচ্ছে এবং বোলার বল করায় উদ্যত, তখন সেকেন্ড শ্লিপ থেকে উইকেটকিপারের সঙ্গে ননীদার কথা বলে যাওয়া। ব্যাটসম্যান বল খেলুক, খেলতে গিয়ে ফসকায় বা ইচ্ছে করে ছেড়ে দিক—ননীদা কিন্তু সমানে ”আ হ হ হ” ”উ হ হ হ”, ”ই স স স”, ”আর একচুল যদি বলটা ঘুরত,” ”এবার নির্ঘাত গালিতে হয়ে যাবে” ইত্যাদি রানিং কমেন্টারি করে যাবেনই। স্টাম্পের এক গজ বাইরে গিয়ে বল বেরিয়ে গেলেও এমন করবেন যেন উইকেট ভেদ করে গেল।
নতুন ব্যাটসম্যান উইকেটে এসে দেখত ননীদা ভুরু কুঁচকে গম্ভীর মুখে গুডলেংথের কাছাকাছি একটা জায়গার দিকে তাকিয়ে। তারপর ব্যাটসম্যানকে শুনিয়ে আমাকেই বলতেন, ”একই রকম আছে হে মতি, ঠিক সেই রকম। কালও দুর্যোধনকে পইপই বলেছি, ভাল করে রোলার টানবি, নয়তো কোনদিন যে মানুষ খুন হবে কে জানে।
এই সময় আমার কাজ হল লক্ষ করা—ব্যাটসম্যান উৎকর্ণ হয়েছে কি না। যদি হয় তা হলে বলব, ”সত্যিই খেলা যায় না। তপনের কথা ভাবলে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে…ভাল কথা, ননীদা কাল হাসপাতালে গেছলেন?”
”না গেলেই ভাল ছিল, চোয়ালটা ঠিকমতো সেট হয়নি, মুখটা বেঁকে আছে। সামনের দাঁত দুটোরও কিছুই করার নেই।”
”তা হলে চিত্তকে আস্তে বল করতে বলুন।” আমি ভীষণভাবে উদ্বেগ দেখাই।
”এখনও তো বল লাফায়নি। আগে দেখি লাফায় কি না।”
এরপর ব্যাটসম্যানের টিকে থাকা বা না থাকা নির্ভর করে তার নার্ভের ক্ষমতার উপর। তবে প্রায় ক্ষেত্রেই দু’ওভারের মধ্যেই তারা ফিরে যায়। ননীদা তাঁর এই ট্যাকটিকসকে বলেন—প্রোপাগান্ডা।
আমার প্রথম ম্যাচ, ভ্রাতৃসঙ্গের বিরুদ্ধে ননীদার প্রোপাগান্ডা ট্যাকটিকস প্রয়োগ করলাম। ওদের সাত নম্বর ব্যাটসম্যানটি এগারো রান করে আট ঘণ্টা ধরে অটল অনড় হয়ে রীতিমতো জ্বালাচ্ছে। শুরু করলাম নতুন উইকেটকিপার বিষ্ণু মিশ্রের সঙ্গে পিচের ভয়াবহতা এবং গত ম্যাচে তপনের মুখমণ্ডল কী আকৃতি ধারণ করেছে সেই বিষয়ে উদ্বেগজনক আলোচনা। বিষ্ণু রীতিমতো অবাক হয়ে বলল, ”তপন তো লং অনে ফিল্ডিং করছে।”
চট করে লক্ষ করলাম, ব্যাটসম্যানটি আমাদের দিকে তাকিয়ে লাজুক হাসি হাসছে। তাতে বেশ খানিকটা ঘাবড়ে গেলাম। অবশেষে আর থাকতে না পেরে পরের ওভারে তাকে বললাম, ”পিচটা খুবই খারাপ, তাই না?”
ব্যাটসম্যান লাজুক হাসল।
”আগের ম্যাচে আমাদের বেস্ট ডিফেনসিভ ব্যাট তপন ঘোষের চোয়াল আর দাঁত ভেঙেছে। মালীটাকে এবার তাড়াতেই হবে, কিসসু কাজ করে না।”
ব্যাটসম্যান আবার লাজুক হাসল।
”তারককে অবশ্য বলে দিয়েছি, ওভারপিচ হয় হোক, তবু ওই স্পটে যেন বল না ফেলে। ম্যাচ জেতার জন্য তো আর মানুষ খুন করা যায় না।”
ব্যাটসম্যান এবারও হাসল আরও জড়োসড়ো হয়ে। আমি অপ্রতিভ হয়ে চুপ করে গেলাম। পরের ওভার শুরুর আগে অপর ব্যাটসম্যানকে বললাম, ”আপনার পার্টনারটি কেমন লোক মশাই, একটা কথারও জবাব দেয় না, শুধু হাসে?”
সখেদে উত্তর পেলাম, ”আমাদেরও এই একই মুশকিল হয়, হাবু একদমই কালা আর বোবা।”
ননীটিকসকে এই প্রথম ব্যর্থ হতে দেখলাম।
৫
চাঁদমোহন শ্রীমানী জানিয়ে দিয়েছে তার ব্যবসায় এখন মন্দা যাচ্ছে, পাঁচশো টাকার বেশি দিতে পারবে না। আমরা বুঝলাম তন্ময়ের জন্যই ক্লাবের হাজার টাকা জরিমানা হল। এত বড় ধাক্কা সামলানো ক্লাবের পক্ষে অসম্ভব ব্যাপার। ননীদা দারুণ মুষড়ে পড়লেন। আমি বললাম, ”গোটা চার—পাঁচ ম্যাচ খেলে বরং এই সিজনের মতো খেলা বন্ধ করে দেওয়া যাক, তাতে খরচ বাঁচবে।”
