”আস্তে, রঞ্জনবাবু আস্তে।” বলেই পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি শ্রীমানী—গিন্নি রঞ্জনবাবুকে দেখছে।
”আরে দূর মশাই, অমন মোটার আবার অ্যাকশন! ফরোয়ার্ড খেললে তো হাতির মতো দেখাবে, ব্যাক খেললে গণ্ডার মনে হবে।”
”প্লিজ রঞ্জনবাবু, ছবি চাই না, চুপ করুন।”
”আরে দূর মশাই, ভাল সাবজেক্ট পাব বলে ক্যামেরাটা—” রঞ্জনবাবু থেমে গিয়ে চোখ দুটো সরু করে টেন্টের পিছন দিকে দৃষ্টি পাঠিয়ে দিল। প্যাড পরে ভবানী গদগদ হয়ে মিনুকে কী বলছে। মিনুর হাতে ভবানীর ব্যাট। সে ব্যাটটা দোলাতে দোলাতে ভবানীর কথা শুনছে।
”দ্যাটস এ গুড আনন্দবাজার রবিবাসরীয়—র সাবজেক্ট।” বলেই ক্যামেরা বাগিয়ে রঞ্জনবাবু কুঁজো হয়ে শিকারির মতো এগোল। শ্রীমানী—গিন্নি জ্বলন্ত চোখে রঞ্জনবাবুকে লক্ষ করে যাচ্ছে।
শ্রীমানী ব্যাট করার জন্য তৈরি হয়ে হাজির। স্ত্রীর কাছে গিয়ে বলল, ”ওগো, গাড়ি থেকে সন্দেশ, দই, লেবুগুলো আনিয়ে রাখো।”
”আনবখন।” শ্রীমানী—গিন্নি মন্দ্রকণ্ঠে ঘোষণা করল।
শ্রীমানী কী একটা বলতে যাচ্ছিল, তখনই মাঠ থেকে ননীদার বিকট চিৎকার উঠল, ”আউজাট?” পটাবাবু কট অ্যান্ড বোল্ড হওয়া মাখন দত্তকে বিদায় সঙ্কেত জানাতে এবার আর দ্বিধা করল না। ৩১ রানেই ডগমগ হয়ে মাখন দত্ত ফিরল।
”ওয়েল প্লেড”, শ্রীমানী তারিফ ছুড়ে দিল।
আমি বললাম, ”মিস্টার শ্রীমানী, আপনাকে কিন্তু কয়েকটা ছক্কা আজ দেখাতেই হবে।”
হাই তুলে শ্রীমানী মুখগহ্বরের ফটকে কয়েকটা তুড়ি দিয়ে বলল, ”ফাস্ট বোলার তো তেমন দেখছি না। ছক্কা মারব কাকে?”
আমি মাথা চুলকে সরে এলাম। পরের ওভারেই দুটি উইকেট পড়ল। শ্রীমানী গ্লাভস পরতে শুরু করল। সভাপতির দল আট উইকেটে ৯৭। তন্ময়ের ওভারের প্রথম বলেই নবম উইকেটের অফ স্টাম্পের বেল উড়ে গেল। শ্রীমানী উঠে দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙল।
চাঁদমোহন শ্রীমানী মন্থর গতিতে উইকেটে পৌঁছল। তন্ময় কোমরে হাত দিয়ে একদৃষ্টে ওর দিকে তাকিয়ে। ননীদা লেগ ও অন থেকে যাবতীয় ফিল্ডসম্যান সরিয়ে অফে পাঠাতে শুরু করলেন। সাবধানের মার নেই। ফট করে কেউ ক্যাচ ধরে ফেলতে পারে। তারপর তন্ময়কে ডেকে কানে কানে কী বললেন। বাধ্যের মতো তন্ময় মাথা নাড়ল।
শ্রীমানী মিনিট চারেক ক্রিজের চার বর্গগজ এলাকা গভীর মনোযোগে ঘাড় হেঁট করে পরীক্ষা করল। গুটি চারেক কাঁকড় আবিষ্কার করে খুঁটে তুলে ফেলে দিল। ব্যাট দিয়ে কয়েকটি স্থান দুরমুশ করে ক্রিজে দাঁড়িয়ে গার্ড চাইল, ওয়ান লেগ। হাবলোদা নিখুঁত গার্ড দেবার জন্য মিনিট পাঁচেক সময় নিল। তারপর বুটের ডগা দিয়ে ক্রিজে দাগ কেটে শ্রীমানী শুরু করল ফিল্ড প্লেসিং নিরীক্ষণ। তাও হয়ে যাবার পর স্টান্স নিল।
তন্ময় এতক্ষণ বোলিং মার্কে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে দেখছিল। এবার বল করার জন্য ছুটতে শুরু করল এবং যখন মধ্যপথে, শ্রীমানী উইকেট থেকে তাড়াতাড়ি দু—পা পিছিয়ে গেল।
কী ব্যাপার! সকলের চোখ সাইট স্ক্রিনের দিকে ফিরল। দুর্যোধনের কুকুরটা সেখানে ঘাড় চুলকোতে ব্যস্ত।
হাবলোদা হেট হেট করে ছুটে যেতেই, বিস্মিত ও বিরক্ত হয়ে কুকুরটা লং অফ বাউন্ডারির দিকে সরে গেল। শ্রীমানী আবার চারিদিক পর্যবেক্ষণ করে তৈরি হয়ে দাঁড়াল। মুখে মৃদু হাসি।
অদ্ভুতভাবে তন্ময়ের অফ কাটারটা আধহাত বাইরে থেকে ভিতরে ঢুকে শ্রীমানীর অফ স্টাম্পটাকে শুইয়ে দিল। বেচারা শ্রীমানী। যে কোনও প্রথম শ্রেণীর ব্যাটসম্যান ওই বল সামলাতে হিমসিম খেয়ে যাবে।
দর্শকদের গুঞ্জন থেমে গেল। শ্রীমানী ফ্যালফ্যাল করে শায়িত স্টাম্পটির দিকে তাকিয়ে। তন্ময় কোমরে হাত রেখে হাসছে। ননীদা শুধু আম্পায়ারের উদ্দেশ্যে মাথাটা দু’বার নাড়লেন।
”নো বল।”
চমকে সবাই তাকিয়ে দেখল, হাবলোদা নির্বিকার মুখে ডান হাতটি ট্র্যাফিক পুলিশের মতো বাড়িয়ে দিয়েছে। শ্রীমানী ক্রিজ থেকে রওনা হয়েছিল, দাঁড়িয়ে পড়ল। ফিল্ডাররা মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। তন্ময় ঘুরে দাঁড়িয়ে জ্বলন্ত চোখে হাবলোদার দিকে তাকিয়ে বোলিং মার্কে ফিরে গেল।
শ্রীমানী ক্রিজে দাঁড়িয়ে উইকেটকিপারকে বলল, ”নো বলটা ডাকতে লেট না হলে একটা ছক্কা দেখাতুম।”
পরের বল সোজা কপাল টিপ—করা। শ্রীমানী মুখের সামনে ব্যাটটা তোলার সময়টুকু মাত্র পেয়েছিল। বলটা কনুইয়ে লাগতেই খটাং শব্দ হল। তারপর টাল সামলাতে না পেরে ঘুরে পড়ল উইকেটের উপর। মড়াৎ করে স্টাম্প ভাঙার শব্দ হল। তন্ময় ঘুরে দাঁড়িয়ে আম্পায়ার হাবলোদাকে বলল, ”নো বল।”
মাঠের মধ্যে সর্বাগ্নে ছুটে গেল ক্যামেরা হাতে রঞ্জনবাবু, তারপর আমি। শ্রীমানীকে আটজন চ্যাংদোলা করে যখন আনছে, শ্রীমানী—গিন্নি রাগে কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে এল।
”দারুণ সাবজেক্ট মতিবাবু, দারুণ।” স্ন্যাপ নিতে নিতে রঞ্জনবাবু মহাফুর্তিতে বলে উঠল।
খপ করে শ্রীমানী—গিন্নি ক্যামেরাটা ছিনিয়ে নিয়ে মাটিতে আছাড় মেরে বলল, ”নিকুচি করেছে তোর সাবজেক্টের। হতভাগা মিনসে ছবি তোলার আর জিনিস পেল না। যা না মুখপোড়া ওই ফড়িংয়ের মতো মেয়েটার ফস্টিনস্টির ছবি তোল না গিয়ে।”
রঞ্জনবাবু নির্বাক। আমরা সবাই কী বলব বা করব ভেবে পাচ্ছি না। তন্ময় শান্ত গলায় বলল, ”এখুনি হাসপাতালে নিয়ে যান, বোধহয় কনুইয়ের হাড় ভেঙেছে।”
