”তাই নাকি, ওমমা! দেখে তো মনে হল না।” শ্রীমানী—গিন্নি বিস্ময় প্রকাশ করল। ”উনিও বড় ছেলে হবার পর আর মাঠমুখো হননি। খেলার কোনও জিনিসই তো আর নেই, তাই আর্জেন্ট অর্ডার দিয়ে প্যান্ট জামা বুট করালেন। কী যে শখ।”
মাখন দত্তর অফ স্টাম্প ঘেঁষে পর পর দুটি বল বেরিয়ে যাওয়া মাত্র ননীদা বোলারের কাছে গিয়ে কী যেন বললেন। ছেলেটি অবাক হয়ে কী যেন বলতে গেল কিন্তু ননীদা তা শোনার জন্য অপেক্ষা না করে শর্ট লেগে নিজের জায়গায় ফিরে এলেন।
পরের তিনটি বল লোপ্পাই ফুলটস এবং লেগস্টাম্পের বাইরে। মাখন দত্ত হুমড়ি খেয়ে তিনবার ঝাড়ু দিলেন, ব্যাট বলে লাগল না। পরের ওভারে ননীদা বল নিলেন। ভাল লেগব্রেক করাতেন, এখনও পারেন, পল্টু চৌধুরীকে দুটি বল অফ স্টাম্পের বাইরে লেগব্রেক করালেন। শ্রীমানীর নির্দেশ ভুলে গিয়ে পল্টু চৌধুরী ব্যাটটাকে ছিপের মতো বাড়িয়ে রইল। বল ব্যাটে লেগে তিনবারই পয়েন্টের দিকে গেল।
”ইয়েয়েস”, মাখন দত্ত রান নেবার জন্য দৌড়ল, তন্ময় শ্লিপ থেকে ছুটে গিয়ে ব্যাকোয়ার্ড পয়েন্ট থেকে বলটা কুড়িয়ে সোজা উইকেটকিপারের গ্লাভসে বল পাঠাতেই সে উইকেট ভেঙে দিল। মাখন দত্তের তখন ক্রিজে পৌঁছতে চার হাত বাকি।
”হাউউজ দ্যাট!” কোরাসে আবেদন হল।
দ্বিধাহীন কণ্ঠে স্কোয়ার লেগ আম্পায়ার হাবলোদা বলল, ”নট আউট।”
নতুন ছেলেরা এমন ডাহা অন্যায়ের প্রতিকার প্রার্থনার ভঙ্গিতে ননীদার দিকে তাকাল। ননীদা বললেন, ”বেনিফিট অব ডাউট দিয়েছে আম্পায়ার।”
”চার হাত বাইরে, এতে কোনও ডাউট থাকতে পারে?” তন্ময় বিরক্ত হয়ে বলল।
ননীদা কথাটা শুনেও শুনলেন না। তন্ময় বিরক্ত হয়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে কোমরে হাত দিয়ে শ্লিপে দাঁড়িয়ে রইল। এই ম্যাচের গোপন নিয়মগুলো তন্ময়ের জানার কথা নয়। জানলে হয়তো এভাবে রাগ দেখাত না। সি সি এইচ—এর মতো ছোট ছোট ক্লাবগুলো কাদের দয়ায় চলে সে কথা যেদিন জানবে, সেদিন ও নিশ্চয় ক্লাবকে ভাল না বেসে পারবে না।
এক ঘণ্টা খেলার পর সভাপতি দলের স্কোর পাঁচ উইকেটে ৮১। মাখন দত্ত ৩১ নট আউট। যে পাঁচজন আউট হয়েছে তার মধ্যে ভুলু গোঁসাই একডজন বল দেয়, বিকাশ মাইতি দেয় একশো টাকা। গোঁসাইকে ২০ আর মাইতিকে ২৫ রানের মাথায় আউট দেওয়া হয়েছে। হাবলোদা আর পটাবাবু এ পর্যন্ত নির্ভুল আম্পায়ারিং করে চলেছে। তারা দুজনে এগারোটা এল বি ডব্লু, সাতটা রান আউট, নটা স্টাম্পিং ও তিনটে ক্যাচ আউটের আবেদন নাকচ করেছে। ঠিক করা আছে শ্রীমানীকে হাফ—সেঞ্চুরি করাতেই হবে, নয়তো পরের বছর ওকে প্রেসিডেন্ট পদে ধরে রাখা যাবে না।
পঞ্চাননদা এসে আমার কানে কানে বললেন, ”পোলোয়া চড়ানো হল এখন, তারপর চাটনি।”
ঘড়ি দেখে আমি ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। চাটনি নামলেই লাঞ্চ। বড় মন্থরগতিতে রান উঠছে, এতক্ষণে মাত্র পাঁচটি উইকেট পড়েছে। অথচ লাঞ্চের আগেই শ্রীমানীকে অন্তত হাফ—সেঞ্চুরি করিয়ে দিতে হবে। ব্যাটিং অর্ডারে সে নিজেকে রেখেছে ভবানীর আগে, এগারো নম্বরে। নবম উইকেট না পড়লে শ্রীমানী নামছে না, তার মানে দুটোর আগে নয়। কিংবা আড়াইটেও বাজতে পারে, কেন না আর এক ভাইস—প্রেসিডেন্ট দয়াশঙ্কর যোশির (তিন জোড়া প্যাড) আট বছরের পুত্র আট নম্বরে। তাকে ১৫ রান করাতেই হবে।
ভাবলাম শ্রীমানীকে বলি, আপনি ৯ নম্বরে এসে লাঞ্চটাকে তাড়াতাড়ি করিয়ে দিন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল, ব্যাটিং অর্ডার তৈরি করার সময় নিজের নামের পাশে ১১ লিখে শ্রীমানী বলেছিল, ‘তলার দিকে নিজেকে রাখলুম কেন বলুন তো?” ননীদা এবং আমি তখন, বাঘ মিউ না হালুম করে কেন, এমন এক প্রশ্নের জবাব খোঁজার মতো মুখ করে তাকিয়ে ছিলাম। শ্রীমানী মুচকি হেসে বলেছিল, ‘যদি ঝরঝর করে উইকেট পড়ে তা হলে আটকাবে কে?’ ওর বিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতায় স্তম্ভিত আমার মুখের দিকে ননীদা সপ্রশংস চোখে তাকিয়েছিলেন। তখন ভবানী কী একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু মিনুকে এগিয়ে আসতে দেখে ‘রান্নার দিকটা একবার ঘুরে আসি’ বলে দ্রুত মিলিয়ে যায়।
শ্রীমানীকে বিপর্যয়রোধের সুযোগ দেওয়া ও লাঞ্চকে ত্বরান্বিত করার জন্য মাঠে ননীদার কাছে চিরকুট পাঠালাম—”পোলাও চড়েছে। সভাপতিকে নামাবার ব্যবস্থা করুন।”
চিরকুট পাঠাতে ননীদা হাত তুলে বোঝালেন, ব্যস্ত হবার কিছু নেই। দুটি টুঙ্কি দিয়ে শ্লিপ থেকে তন্ময়কে ডেকে এনে, হাতে বল তুলে দিলেন। তারপর আম্পায়ারের দিকে তাকিয়ে মাথাটা হেলালেন। হাবলোদাও একই ভঙ্গিতে উত্তর দিলেন। দুর্যোধনকে ডেকে আমি বললাম, ”কলাপাতা, খুরি, গেলাসগুলো এবার ধুয়ে রেডি করে রাখ।”
হঠাৎ চোখে পড়ল আমার গেস্ট গুঁপো রঞ্জনবাবু আসছে। কাঁধে একটা ক্যামেরা ঝুলছে। আমায় দেখে একগাল হেসে বলল, ”ক্যামেরাটাও আনলুম। ক্রিকেটের ছবি তোলা আমার দারুণ হবি। ভাল অ্যাকশন পেলে তুলব। লাঞ্চের কদ্দুর?”
বললাম, ”খুব শিগগিরই।” মাথায় তখন একটা আইডিয়া এসে গেছে। শ্রীমানীর ছবি তুলে প্রেজেন্ট করলে কেমন হয়। নেটটা একদম অচল হয়ে গেছে। নতুন একটা কি খুশি হয়ে দেবে না?
”রঞ্জনবাবু, দারুণ অ্যাকশন পাবেন যদি ওই লোকটার ছবি তোলেন।”
”কোন লোকটা বললেন? ওই মোটা হোঁদল—কুতকুতের?”
