”এখন একটু মোটা হয়ে গেছি,” শ্রীমানীর মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ”একসময় দারুণ খেলতাম। খালি ছক্কা মারতাম। বল মাটিতে পড়ার আগেই পাঁচ হাত বেরিয়ে হাঁকড়াতাম। তখন অনেক রোগা ছিলুম। আমায় নামতে দেখলেই ফিল্ডাররা আপনা থেকেই বাউন্ডারির ধারে সরে যেত।”
”আজ তা হলে আপনার ছক্কা দেখা যাবে।” বলতে যাচ্ছিলুম ‘দেখার সৌভাগ্য হবে’, কিন্তু তন্ময়দের দলটা কাছেই থাকায় বলতে পারলাম না।
”ভাল বোলার আছে কি? ফাস্ট বোলার? ব্যাঘ্রকণ্ঠে শ্রীমানী বলল। ”ফাস্ট বল না হলে আমি ঠিক ভাল খেলতে পারি না।”
ননীদার দিকে তাকালাম সঠিক ট্যাকটিকসের জন্য। ননীদা ইশারায় আমাকে চুপ করতে বলে, খুব বিষণ্ণ গলায় বললেন, ”ফাস্ট বোলার! নাহ আমাদের ক্লাবে নেই। কোথাও নেই, না বেঙ্গলে না ইন্ডিয়াতে। তাই তো ভাল ব্যাটসম্যানও পাওয়া যাচ্ছে না। আপনাদের আমলে বাঘা বাঘা বোলার ছিল তাই আপনারাও বাঘের মতো ব্যাট করেছেন।”
”ঠিক ঠিক। এখন বোলাররা ইঁদুর, তাই ব্যাটসম্যানরা ইঁদুর হয়ে গেছে।” শ্রীমানী গর্জন করে উঠল।
”আপনারা যদি একটু ইন্টারেস্ট নেন তা হলে আবার নিশ্চয় ফাস্ট বোলার পাব। মাঝে মাঝে আপনি যদি আমাদের ম্যাচগুলোয় নামেন তা হলে আপনার হাঁকড়ানোর ঠেলা খেয়ে বোলাররা জোরে বল করার জন্য ইন্সপায়ারড হবে।”
”বুঝলেন ননীনাবু, আমার খুবই খেলতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ব্যবসায় এত টাইম দিতে হয় যে—” ইঞ্জিনের স্টিম ছাড়ার মতো শ্রীমানীর দীর্ঘশ্বাস পড়ল।
সব থেকে মজবুত লোহার চেয়ারটা দেখিয়ে ননীদা ওকে বললেন, ”আপনি বিশ্রাম করুন।” আর লোহার চেয়ার ছিল না। দৌড়ে টেন্ট থেকে আর একটি শ্রীমানী—গিন্নির জন্য আনলাম। দুটো আঙুল দিয়ে চেয়ারটার বসার জায়গা টিপে পরীক্ষা করে তিনি বসলেন।
সারসের মতো গলা ও ঠ্যাং নিয়ে ভাইস—প্রেসিডেন্ট অ্যাটর্নি মাখন দত্ত সস্ত্রীক হাজির হলেন। বছরে ইনি ত্রিশ কিলো আলু, দশ কিলো মাংস, পঞ্চাশ পাউন্ড পাউরুটি ও পাঁচ কিলো সরষের তেল দেবেন। ওঁর জন্য বরাদ্দ দুটি টেস্টম্যাচ টিকেট। দত্ত—গিন্নিকে বসালাম শ্রীমানী গিন্নির পাশে। মাখন দত্ত, শোনা যায় কলেজ টিমে দু—চারবার খেলেছে।
কতকগুলো গোপন নিয়ম এই ম্যাচের জন্য স্থির করা আছে। খেলার দুই আম্পায়ার, স্কোরার এবং আমার মতো পুরনো দু—একজনই তা জানে। নিয়মগুলি ননীদার তৈরি। খেলার প্রথম একঘণ্টা আমি স্কোরার। শাঁসালো কেউ শূন্য রানে কোনওক্রমেই যাতে আউট না হয়, সেটা দেখবে আম্পায়ার। স্কোরারের কাজ দশকে পনেরো এবং পনেরোকে কুড়ি করা। বাই রান খুব সাহায্য করে টোটালকে তিরিশ—চল্লিশ রান বাড়াতে।
ভবানী আজ খুবই ব্যস্ত। শ্রীমানী একাদশের বিপর্যয় রোধ করার দায়িত্ব আজ তার ঘাড়ে। মিনুকে সে দত্ত—গিন্নির পাশে বসিয়েছে। শ্রীমানী নিজে ব্যাটিং অর্ডার করেছে। ভবানীকে রেখেছে দ্বাদশ স্থানে। তাই নিয়ে ভবানী খুবই অসন্তুষ্ট। অত দেরি করে নেমে কী খেলা সে মিনুকে দেখাবে? একটা লেমনেড মিনুর হাতে দিয়ে সে হাত নেড়ে কী সব বলছে। কানে এল ওর গলা, ”ভাল রিলায়েবল ব্যাটসম্যানরাই শেষদিকে থাকে। যখন গোড়ার দিকে ফেল করে তখন তারা আটকায়। যেমন সোবার্স এখন ছয়—সাতে নামছে।”
মিনু বলল, ”শুনেছি ব্র্যাডম্যান তিন নম্বরে নামত।”
”নামবে না কেন, ওদের তো এগারো নম্বরও সেঞ্চুরি করতে পারে। আমাদের টিমে সেরকম কেউ তো আর নেই। তাই আমাকে—”
শ্রীমানী—গিন্নি কটমট করে তাকিয়ে আছে দেখে ভবানী থমকে পড়ল।
”তোমাদের টিমের ক্যাপ্টেনটা ঠিক রোড রোলারের মতো। দৌড়বে কী করে, রান আউট হয়ে যাবে যে!” মিনু হাসতে হাসতে ঠোঁটে স্ট্র চেপে ধরল।
শ্রীমানী—গিন্নির দিকে তাকিয়ে ভবানী বলল, ”আমি চট করে রান্নার দিকটা একবার দেখে আসি। তুমি বরং এখানে থাকো।” বলতে বলতে ভবানী টেন্টের পিছন দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল।
শ্রীমানী—গিন্নি একটু চেঁচিয়ে দত্ত—গিন্নিকে বলল, ”ক্রিকেট মাঠে আজকাল, বুঝলেন দিদি, বড় আজেবাজেরা খেলা দেখতে আসে। এমন সব মন্তব্য তারা করে যে খেলা দেখাই দায় হয়ে ওঠে। চলুন আমরা বরং ওধারটায় বসি।”
”সেই ভাল।” দত্ত—গিন্নি উঠে দাঁড়ালেন।
ওরা এসে স্কোরারের টেবলের পিছনে একটা বেঞ্চে বসল।
ননীদা টসে জিতে সভাপতির দলকে ব্যাট করতে দিলেন। লাঞ্চের পর খেলার ইচ্ছা ওদের থাকে না বলেই, সভাপতির দলকেই প্রথমে ব্যাট করতে দেওয়া হয়। প্রথমে ব্যাট করতে নামল মাখন দত্ত আর পল্টু চৌধুরী। নামার আগে শ্রীমানী দুজনকে জানিয়ে দিল, ”তাড়াহুড়ো করবেন না। দেখে দেখে খেলবেন, বলের পালিশ উঠলে তবেই সামান্য হাত খুলবেন। তারপর আমি তো আছিই।”
নতুন একটি ছেলেকে ননীদা বল করতে দিয়েছেন। প্রবল উৎসাহের জন্যই ওর প্রথম বলটি ফুলটস হয়ে গেল। মাখন দত্ত ঘাবড়ে গিয়ে পিছিয়ে যাবার সময় ব্যাটটিকে হাতপাখার মতো সামনে একবার নেড়ে দিল। ব্যাটে লেগে বলটি শ্লিপে দাঁড়ানো তন্ময়ের পাশ দিয়ে তিরবেগে থার্ডম্যান বাউন্ডারিতে পৌঁছল। হই হই করে উঠল দর্শকরা। ব্যাঘ্র গর্জন উঠল, ”তাড়াহুড়ো নয়, বি স্টেডি।”
দত্ত—গিন্নি পুলকে লাল হয়ে শ্রীমানী—গিন্নিকে বলল, ”বিয়ে হওয়ার পর এই প্রথম ব্যাট ধরলেন।”
