”খেলানো তো উচিত। ব্যাটসম্যান দু—তিনজনের বেশি নেই।”
”এরা পয়সাকড়ি কিছু দেবে কি?”
আমি অবাক হয়ে বললাম, ”তুমি কি ফুটবল পেয়েছ? কলকাতায় ক্রিকেট প্লেয়ার ক’জন টাকা পায়, তাও সেকেন্ড ডিভিশন ক্লাবে।”
”আমাকে বুট কিনতে হবে, জামা—প্যান্টও করাতে হবে।”
আমি চুপ করে রইলাম। টেনেটুনে একজোড়া বুটের দাম হয়তো সি সি এইচ দিতে পারবে, কিন্তু তার আগে তন্ময়কে প্রমাণ করতে হবে—সে অপরিহার্য।
”আচ্ছা ওই টাকমাথা, বেঁটে কালো লোকটা এই ক্লাবের কে?”
”ক্রমশ টের পাবে ননীদা এই ক্লাবের কে এবং কতখানি!”
তন্ময় পকেট থেকে একটা দোমড়ানো সিগারেট বার করে আমায় বলল, ”দেশলাই আছে দাদা?”
৩
প্রতি বছর মরশুম শুরুর আগে ক্লাব সদস্যদের মধ্যে একটা ম্যাচ খেলা হয়। সভাপতির একাদশ বনাম ননীদার একাদশ। ম্যাচ না বলে ফিস্ট বলাই ভাল। লাঞ্চের নামে হয় ভুরিভোজ। তারপর আর কারুর খেলায় উৎসাহ থাকে না, অবস্থাও থাকে না। মিষ্টি নরম রোদে ঘাসের উপর বেশির ভাগই গড়িয়ে পড়ে। রিজার্ভে যে ছেলেরা থাকে তারাই তখন খেলে।
ননীদা খেলাটাকে প্রীতি—সম্মেলন হিসাবে দেখেন পঞ্চাশ ভাগ। পৃষ্ঠপোষকদের তোয়াজ করার জন্য পঁচিশ ভাগ রেখে, বাকি অংশটুকু নবাগতদের ট্রায়াল হিসেবে গণ্য করেন। সভাপতি হন তাঁর নিজের টিমের ক্যাপ্টেন, আর একদিকের ননীদা। ক্লাবের যাবতীয় কর্মকর্তা ও তাদের বাচ্চচা ছেলেরা থাকে সভাপতির দলে আর জনা দশেক অতিরিক্ত নিয়মিত প্লেয়ার ও একজন উইকেটকিপার। খেলা শুরুর আধঘণ্টার মধ্যেই একে একে অতিরিক্তদের মাঠে ডাক পড়ে। ননীদার দলে থাকে নবাগত ছেলেরা ও ননীদার সমসাময়িক ও তদূর্ধ্ব বয়সি বিগত দিনের কয়েকজন প্লেয়ার।
যদিও দুটি দলের নামে ‘একাদশ’ শব্দটি আছে, আসলে সেটা অষ্টাদশ কি ত্রয়োবিংশও হতে পারে। নির্ভর করে মাঠে খেলার আগে ক’জন হাজির হয়েছে। সদস্যরা গেস্টও আনতে পারে, সেজন্য মাথাপিছু পাঁচ টাকা দিতে হয়। ভবানীর গেস্ট এবার মিনতি ওরফে মিনু; অফিসের দারোয়ান—ইন—চার্জ কাম রিসেপশনিস্ট গুঁপো রঞ্জনবাবু আমার গেস্ট। অফিসে যত লোক দেখা করতে আসে রঞ্জন সেনগুপ্ত তার শতকরা পাঁচজনকে ভিতরে যেতে দেয়। আশা করছি এরপর আমার সঙ্গে যারা দেখা করতে আসবে তারা ওই শতকরা পাঁচজনের অন্তর্ভুক্ত হবে। টপ কর্মকর্তারা, যারা বাৎসরিক মোটা দক্ষিণা দেয়, তাদের গেস্টদের জন্য চাঁদা নেওয়া হয় না। তাদের সঙ্গে আসে স্ত্রী—পুত্রকন্যারা।
ক্লাব প্রেসিডেন্ট নির্বাচনও ননীদার হাতে। অর্থবান, যশোলোভী, ঈষৎ বোকা ধরনের, তোষামোদপ্রিয় লোক খুঁজে বার করে, তাকে নানানভাবে জপিয়ে প্রেসিডেন্ট বানিয়ে (ননীদা বলেন, ‘ট্যাকটিকস প্রয়োগ করে’) মোটা টাকা আদায় করার দায়িত্ব ননীদাই এতকাল বহন করে আসছেন। এই টাকার উপরই ক্লাবের জীবন—মরণের অর্ধেক নির্ভর করে।
আগের প্রেসিডেন্ট ছিল কাউন্সিলার দুলাল দাঁ। ইলেকশনে হেরে গিয়ে ডোনেশন ছাঁটাই করে, ১/৬—এ নামিয়ে এনেছে। ননীদা প্রতিশ্রুত ছিলেন ইলেকশনে সি সি এইচ খাটবে। কিন্তু কাজের সময় লুচি—আলুর দমের বাক্স সংগ্রহ ছাড়া ছেলেরা আর কিছুই করেনি। এবার ননীদা নাকি শাঁসালো একজনকে পাকড়িয়েছেন। চাঁদমোহন শ্রীমানী টেস্ট ম্যাচের পাঁচটি টিকিট চেয়েছে, বিনিময়ে দেড় হাজার টাকা দেবে। ননীদা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সি এ বি—তে তাকে কোনও একটি কমিটিতে ঢুকিয়ে দেবার ব্যবস্থা করবেন। শ্রীমানী, বলাই বাহুল্য, এ বছর আমাদের প্রেসিডেন্ট। গুড়, ঘি ও চালের আড়তদার, গোটা পাঁচেক রেশন দোকানের সে মালিক।
শ্রীমানীকে প্রথম দেখলাম এই খেলার দিন। গৃহিণী ও দুই ছেলেকে নিয়ে ওর মোটর পৌঁছতেই ননীদা ছুটে গিয়ে গাড়ির দরজা খুলে দিলেন। গাড়ি থেকে প্রথমে যখন শ্রীমানীর পা বেরোল, কে যেন পিছন থেকে আস্তে বলল, ”এ যে হাথি মেরা সাথি।” পিছন ফিরে দেখলাম, তন্ময় আর গুটি চারেক নতুন ছেলে ফিক ফিক হাসছে। শ্রীমানী নামার পর হাঁফ ছেড়ে গাড়ির স্প্রিং এক ইঞ্চি উঁচু হয়ে গেল। শ্রীমানী—গিন্নি নামার পর আর এক ইঞ্চি উঠল। দুই ছেলে নামতে ৩/৪ ইঞ্চি আরও উপরে উঠল। গাড়িতে রয়েছে পাঁচ বাক্স সন্দেশ, পাঁচ হাঁড়ি দই, এক ঝুড়ি কমলালেবু। সেগুলো নামানো হল না। ননীদা বললেন, ”গাড়িতে চাবির মধ্যে থাকুক। লাঞ্চের সময় বার করব। এখন টেন্টে নিয়ে গিয়ে রাখলে কিছু বাকি থাকবে না।”
”কেন, ক্লাবে বুঝি চোর—ফোর খুব আছে।” শ্রীমানী বলল। মনে হল বাঘ ডাকছে।
ননীদা কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, ”ছেলেপুলেরা একটু দুষ্ট হয়ই, বোঝেনই তো, হেঁ হেঁ, হেঁ, চুরি করে খেতেই ওদের ভাল লাগে। কিন্তু চোর ওরা নয়।”
”নয় যে, বুঝলেন কী করে? ক্রিকেটাররা বুঝলেন, রিলেতে শুনেছি, খেলতে খেলতে মাঠের মধ্যেই চুরি করে। পুষ্পেন সরকারকে পরিষ্কার বলতে শুনেছি—অম্বর রায় একটা রান চুরি করল এই ফাঁকে। বুঝন মাত্র একটা রান, কতই বা তার দাম। কিন্তু লোভ সামলাতে পারল না।” শ্রীমানী—গিন্নি ক্ষুব্ধস্বরে বলল।
শ্রীমানী—পরিবারের সঙ্গে সঙ্গে টেন্টের দিকে এগোতে লাগলাম। ননীদা আমায় চোখ টিপলেন। মুখে গদগদ ভাব এনে শ্রীমানীকে বললাম, ”আপনি যে ক্রিকেট খেলতেন তা আপনার হাঁটা দেখেই বোঝা যায়।”
