নেটের মধ্যে থেকে ছেলেটি মুখ ঘুরিয়ে ননীদার দিকে তাকাল একবার। কাঁধটা ঝাঁকিয়ে স্টান্স নিল।
বল করছে তিনটি ছেলে। তার মধ্যে একটি মাঝে মাঝে গুগলি ছাড়ছে। ননীদা বিড়বিড় করল, ”লেংথে বল ফেলা শিখল না, বাবু এখনি গুগলি দিচ্ছে। কিসসু হবে না।” ওর প্রথম বল লেগ স্টাম্পের বাইরে পড়ে অফ ব্রেক করে বেরিয়ে গেল। ব্যাটসম্যান ছেড়ে দিল। ননীদা বলে উঠলেন, ”ভেরি গুড।” ভবানী সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, ”কারেক্ট।”
এর পরের ছেলেটির কাছ থেকে এল সোজা একটি হাফ ভলি। ব্যাটসম্যান ফরোয়ার্ড ডিফেন্সিভ খেলে আস্তে বোলারের কাছে বলটা ঠেলে দিল। ননীদা ভ্রূ কুচঁকে বললেন, ”এটা লং অন বাউন্ডারিতে পাঠানোর কথা।” ভবানী চিৎকার করে উঠল, ”ড্রাইভ, ড্রাইভ, হিট হার্ড মাই বয়।”
ছেলেটি বিরক্ত চোখে আমাদের দিকে তাকাল। পিচে বোধহয় ইটের কুচি আছে, তৃতীয় বলটি হঠাৎ ফণা তোলার মতো সোজা খাড়া হয়ে ছেলেটির কানের পাশ দিয়ে নেট ডিঙিয়ে গেল। মুহূর্তের জন্য ওর মুখ ভয়ে ফ্যাকাশে হল।
”হুক করার বল ছিল।”
”হুক হুক। সপাটে। ডোন্ট বি অ্যাফ্রেড।”
পরের বলটি পিচে পড়ার আগেই ছেলেটি লাফিয়ে দু—গজ বেরিয়ে বলটিকে সোজা সত্তর গজ দূরে কাস্টমস টেন্টের উপর ফেলে দিল। ননীদা উত্তেজিত হয়ে এগিয়ে গিয়ে বললেন, ”দ্যাখো, বলের লাইন থেকে পা কত দূরে ছিল।”
”তার আগে দেখুন বলটা কত দূরে গেল।” ছেলেটি কাস্টমস টেন্টের দিকে ব্যাটের ডগা তুলে বলল। ”এতে ছ’টা রান পাওয়া যাবে। আর রানের জন্যই ব্যাট করা, তাই না?”
ননীদার মুখ থমথমে হয়ে গেল। ভবানী অসহায় ভাবে আমার আর ননীদার মুখের দিকে তাকাতে লাগল। হঠাৎ ”দুর্যোধন, দুর্যোধন” বলে ডাকতে ডাকতে ননীদা টেন্টের দিকে রওনা হয়ে গেলেন।
ভবানী বলল, ”ঠিক জবাব দিয়েছে, কী বলিস?”
এড়িয়ে গিয়ে বললাম, ”আগের থেকে ননীদার সহ্যশক্তি অনেক বেড়ে গেছে।” তারপর চেঁচিয়ে ছেলেটিকে বললাম, ”তোমার নাম কী ভাই?”
”তন্ময় বোস।” এই বলেই তন্ময় লেগব্রেক করা বলটাকে অফ স্টাম্পের উপর থেকেই লেটকাট করল।
সঙ্গে সঙ্গে আমি ননীদাকে দেখার জন্য তাঁবুর দিকে তাকালাম। ফেন্সিংয়ের গেটের কাছে ননীদা কথা বলছেন দুর্যোধনের সঙ্গে, কিন্তু তাকিয়ে আছেন নেটের দিকে। দেখলাম বিরক্তি ভরে মাথাটা নাড়ছেন। আমি জানি মনে মনে এখন উনি কী বলছেন। বারো বছর আগে আমায় বলেছিলেন, ”ফ্যান্সি শট, এ সব হচ্ছে ফ্যান্সি শট। সিজন শুরু হবার একমাসের মধ্যে খবরদার লেটকাট করবে না।”
”ন্যাচারাল ক্রিকেটার। ছেলেটার হবে মনে হচ্ছে।” ভবানী বিজ্ঞের মতো বলল। ”অবশ্য যদি গেঁজে না যায়।”
”কিন্তু এখনই লেটকাট করল! এ সম্পর্কে ননীদা কী বলেন, তোর মনে আছে কি?” ভবানীকে উশকাবার জন্য বললাম।
”নিশ্চয় মনে আছে।” ভবানী ভারিক্কি চালে নেটের কাছে গিয়ে বলল, ”দ্যাখো তন্ময় লেটকাট—ফাট জানুয়ারি মাসের আগে আমাদের ক্লাবে মারা বারণ।”
তন্ময়ের মুখে অকৃত্রিম বিস্ময় ফুটে উঠল। মনে হল, হাসবে না রাগবে ঠিক করে উঠতে পারছে না। ভবানী ভারী গলায় এবার বলল, ”উই ডোন্ট প্লে ফর ফান।”
”তা হলে কী জন্য খেলেন?” তন্ময় আরও অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল।
ভবানী ভ্যাবাচাকা খেয়ে আমার দিকে তাকাল। ও আশা করেনি এই রকম একটা প্রশ্নের সম্মুখীন কোনওদিন হতে হবে। আমি কিঞ্চিৎ খুশি হয়েই মুখে বিব্রত ভাব ফোটালাম। ভবানী জবাবের জন্য আমার দিকে তাকিয়ে আছে দেখে বললাম, ”ননীদা বলেন, আমরা খেলি জেতার জন্য।”
”নিশ্চয়, আমিও সেই জন্য দেখতে চাই।” তন্ময় নেট থেকে বেরিয়ে প্যাড খুলতে খুলতে বলল। ”কিন্তু মজাটাকে বাদ দিয়ে নয়। মজা না পেলে খেলা আর খেলা থাকে না, খাটুনি হয়ে যায়। আমি তো মজা পাব বলেই ক্রিকেট খেলতে এসেছি। পা কিংবা কাঁধ বলের লাইনে এল কি না, তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। বলটা ব্যাটের ঠিক মাঝখানে লাগার সুখটা পেতে চাই।”
ভবানী বলল, ”সুখ চায় যারা স্বার্থপর। কিন্তু ক্রিকেট টিমগেম। দলের কথা ভেবে খেলতে হয়।”
তন্ময় বলল, ”স্বার্থপর কিছু প্লেয়ার আছে বলেই লোকে খেলা দেখতে আসে। যারা পিটিয়ে খেলে, তাদের খেলাই কি দেখতে ইচ্ছে করে না?”
প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ভবানী ‘ননীদা বোধহয় ডাকছেন” এই বলে হঠাৎ তাঁবুর দিকে চলে গেল। আমি জানি, তন্ময়ের কথাগুলি ননীদার কানে তুলে দেবার জন্যই ও গেল।
তন্ময়ের নিকষ কালো রং। ছিপছিপে লম্বা বেতের মতো শরীর, বাড়তি মেদ ও মাংস কোথাও নেই। মাথার চুল হাল আমলের বিবাগীদের মতো ঝাঁকড়া হয়ে ঝুলে পড়েছে ঘাড় পর্যন্ত, জুলপিটাও ইঞ্চি চারেক। ওর বুটটা পুরনো আর তালি—মারা। জামা, প্যান্ট ময়লা। চোখের চাহনিতে ঔদ্ধত্য ও চ্যালেঞ্জ ঝকঝক করছে। ক্যাপ্টেন হিসেবে কেমন একটু আশ্বস্ত বোধ করলাম। এইসব ছেলেরাই হারা ম্যাচ হঠাৎ জিতিয়ে দিতে পারে।
নিজের নাম বলে ওকে জানালাম, এ বছর আমি সি সি এইচ—এর ক্যাপ্টেন। তারপর বললাম, ননীদা বা ভবানীর মনোভাবের সঙ্গে আমার ক্রিকেট ধারণার একদমই মিল নেই। ওঁরা গোঁড়াপন্থী, খেলাটাকে জীবন—মরণ সমস্যা বলে ধরে নেন। কিন্তু খেলাকে আমি ধরি নিজেকে প্রকাশ করার একটা উপায় হিসেবে।
আমার কথা তন্ময় ঠিকমতো বুঝল কি না জানি না, তবে হাসল। ”আমাকে কি এরা খেলাবে?”
