ক্লাবের প্যাড চার জোড়া। ব্যাটিং গ্লাভস তিন জোড়া। ব্যবহার করতে করতে ঢলঢলে হয়ে গেছে সেগুলো, আঙুল থেকে খুলে পড়ে। ঘামে এবং ময়লায় এখন এমন দুর্গন্ধ ছড়ায় যে উইকেটকিপাররা পর্যন্ত পিছিয়ে বসে। গৌতম জানিয়েছে, নতুন উইকেটকিপিং গ্লাভস না পেলে সে এবছর ম্যাচে চল্লিশটা বাই দেবেই। প্র্যাকটিসের জন্য একটা ব্যাট ঠিক করা আছে। কেউ বলে সেটা কাঁটাল কাঠের কেউ বলে শালের। কেউ সঠিক বলতে পারে না, যেহেতু প্রায় পুরো ব্লেডটাই কালো সুতোর ব্যান্ডেজ ঢাকা। যেটুকু দেখা যায়, সেটার রং দুশো বছরের পুরনো কাগজের মতো। ওজন ছ—সাত পাউন্ড, হ্যান্ডেলটা মচমচ করে। গোটা চারেক বল নেট প্র্যাকটিসের জন্য বরাদ্দ থাকে।
সি সি এইচ সাধারণত একটি বলে দু—তিনটি ম্যাচ খেলে। আমি একবার আপত্তি তুলে বলেছিলাম, ”ননীদা, বলের ব্যাপারে অন্তত খরচ কমাবার চেষ্টা করবেন না। নতুন বল না হলে সুইং করানো যায় না। তা ছাড়া পুরনো বল নিয়ে খেলতে নামছি এতে কি ক্লাবের প্রেসটিজ থাকে?”
ননীদা পনেরো সেকেন্ড আমার মুখের দিকে তাকিয়ে তারপর বলেছিলেন, ”আইনে কি বলা আছে, নতুন বল নিয়ে খেলতে হবেই, নয়তো খেলতে দেওয়া হবে না?”
”তা লেখা নেই।” মাথা চুলকে বললাম।
”বল সুইং করলেই ম্যাচ জেতা যাবে?”
”না, তা কেন, কিন্তু সম্ভাবনা তো—”
”জেতার জন্যই খেলা। পুরনো কি নতুন যে বলেই খেলবে।”
এরপর আর কথা চলে না। ম্যাচে খেলা বলগুলি ননীদা কাঠের বাক্সটায় রেখে দেন। প্র্যাকটিসের বল নরম হয়ে তুবড়ে ফুলে উঠলে বা সেলাই ছিঁড়ে গেলে বাক্স থেকে বার করে বদলি করে দেন।
সাতটি ছেলে নেটে রয়েছে। ননীদা ঘড়ি ধরে এক—একজনকে ব্যাট করাচ্ছেন। অধিকাংশ সেকেন্ড ডিভিশনের তুলনায়ও কাঁচা। বিরক্তিতে ননীদার মুখ কুঁচকে রয়েছে। এক—একজনের দিকে মিনিটখানেক তাকান আর আকাশে চোখ তুলে বিড়বিড় করেন, ”যত্তসব এসে জোটে আমারই ঘাড়ে।” তারপর চেঁচিয়ে ওঠেন, ”নেক্সটম্যান।”
ভবানী এতক্ষণ আমার পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করছিল, ”একটাও পাশ করবে না, দেখে নিস, আজ নিয়ে আঠারোটা ছেলের ট্রায়াল হল। সোবার্স—কানহাই না পেলে বুড়োর মন উঠবে না। আরে বাবা এটা কি টেস্ট টিমের ট্রায়াল? থাকব তো আমরা লিগটেবলের তলার দিকে, অত বাছাবাছি করে নেবার দরকার কী! য়্যা, ক্লাবে চিরকাল থাকতে তো আর আসছে না, আমাদের মতো। ডানা গজালেই ফুড়ুক করে উড়ে পালাবে। আমার মতে ভাল প্লেয়ার নেয়াই উচিত নয়। তুই কী বলিস?”
ভবানীকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি। কিছু বললেই সেটা ননীদার কানে তুলে দেবে। তাই চুপ করে রইলাম। তাতে ওর কথা বলায় কোনও অসুবিধা হল না। ”এই ছেলেটাকে দ্যাখ। স্টাইলটা ভালই মনে হচ্ছে।” ভবানী খুব মন নিয়ে, নেটে ব্যাট করছে যে ছেলেটি তার দিকে নয়, ননীদাকে লক্ষ করতে লাগল। ননীদা বেশ আগ্রহ ভরেই ছেলেটিকে দেখছেন। দু—একবার মাথা নেড়ে যেন তারিফ করলেন। ভবানী সঙ্গে সঙ্গে ”লাভলি” বলে চেঁচিয়ে উঠল। ননীদা ভ্রূ কোঁচকালেন, ভবানী ”ওহ নো নো” বলে উঠল সখেদে। ভবানীর খুব শখ, অন্তত একবার সি সি এইচ—এর ক্যাপ্টেন হওয়ার। কিন্তু ননীদা বাদ সেধেছেন। দু—দুবার তিনি ভবানীর দাবি নাকচ করেছেন এই বলে, ”টিমটাকে কি ডোবাতে চাও। ক্যাপ্টেনসি মানেই ট্যাকটিকস অর্থাৎ বুদ্ধির খেল দেখাতে হবে। ওর বুদ্ধির ভাঁড়ে তো মা ভবানী।”
ভবানী কিন্তু হাল ছাড়েনি। সমানে ননীদাকে খুশি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ভবানী তার অফিসে নিজেকে ক্লাবের ক্যাপ্টেন রূপে পরিচিতি দিয়েছে। তা ছাড়া যে মেয়েটিকে সে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছে, সে ভবানীর অফিসেই চাকরি করে। বিবাহে মেয়েটি এখনও গড়িমসি করছে। তার মতে ভবানীর নাকি যথেষ্ট ব্যক্তিত্ব নেই। তাই মাঠের মাঝে কর্তৃত্ব ও দাপট, মেয়েটিকে দেখাবার ইচ্ছা তার খুবই। আমাকে অনুরোধ করেছে চুপিচুপি, ”দু—একটা ম্যাচে তুই বোস না, তা হলে আমি ক্যাপ্টেনসির চানস পাই সিনিয়ারমোস্ট প্লেয়ার হিসেবে। প্লিজ মতি, আমার অনুরোধটা রাখ। নয়তো আমার বিয়ে করা হয়ে উঠবে না। মিনুকে যে ভাবেই হোক ইমপ্রেস করতেই হবে।”
আমি ওকে কোনও কথা দিইনি। তাইতে ও মনে মনে চটে আছে আমার উপর, আমিও সাবধানে আছি ওর সম্পর্কে। কখন বিপদে ফেলে দেবে, কে জানে। ভবানীর একমাত্র গুণ—অনেকক্ষণ উইকেটে থাকতে পারে রান না করে। এজন্য টিমে ওকে অবশ্যই রাখতে হয়। ভবানীকে চটাবার ইচ্ছে আমার একদমই নেই, যেহেতু এবছর আমি ক্যাপ্টেন। জানি, ওর শরণাপন্ন হতেই হবে কোনও না কোনও সময়। ঠিক করেই রেখেছি, একটা সহজ ম্যাচের আগে আঙুলে চোট লাগার অজুহাত দিয়ে বসে যাব।
”হল না, হল না,” বলতে বলতে ননীদা নেটের মধ্যে ঢুকে ছেলেটির হাত থেকে ব্যাটটা ছিনিয়ে নিলেন। ”বলের লাইন হচ্ছে এই, আর তোমার বাঁ পা থাকছে ওখানে…লাইনে পা আনো, বাঁ কাঁধটা এইভাবে।” ননীদা কাল্পনিক বলের লাইনে পা রেখে ব্যাট চালালেন এবং একস্ট্রা কভারে কাল্পনিক বলটির বাউন্ডারি লাইন পার না হওয়া পর্যন্ত তাকিয়ে রইলেন। ”এইভাবে ড্রাইভ আর ফলো—থ্রু হবে, মাথা আর কাঁধ আসবে বলের পিচের উপর!”
ব্যাটটা ওর হাতে ফিরিয়ে দিয়ে, ননীদা আমার পাশে এলেন। ”বুঝলে, স্ট্রেট ব্যাট আর ডিফেন্স হল ব্যাটসম্যানশিপের নাইনটি পারসেন্ট। অথচ আজকালকার ছোকরারা এ দুটো রপ্ত না করেই ব্যাট চালায় সোবার্সের মতো।”
