আড়চোখে ননীদার দিকে তাকালাম। দেখি, একদৃষ্টে তিনি নভেম্বর আকাশের শোভা নিরীক্ষণ করছেন। নেটের মধ্যে কী হচ্ছে না—হচ্ছে সে সম্পর্কে উদাসীন। ফ্রেন্সিং—এর ধারে ননীদার ছাত্রটি সমানে টিউবওয়েল হ্যান্ডেল টেপার মতো ব্যাট হাতে সামনে ঝুঁকে ওঠানামা করে যাচ্ছিল। পাম্প করা থামিয়ে এখন সে ফ্যালফেলিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে। ননীদা তাঁর দৃষ্টি আকাশ থেকে আকাশবাণী ভবনের চূড়া এবং তারপর ইডেনের প্রেসবক্স হয়ে মোহনবাগান মাঠের সবুজ গ্যালারির উপর রেখে বাজখাঁই গলায় বললেন, ”কটা হল?”
বোলিং মার্কে ফিরে যাচ্ছিলাম। থমকে বললাম, ”গুনিনি তো!”
ননীদা আর একটু গলা চড়িয়ে বললেন, ”পঞ্চাশটা হয়েছে?”
সঙ্গে সঙ্গে ফেন্সিং—এর ধারে দ্রুত টিউবওয়েল পাম্প শুরু হল। ননীদার আঙুলের তিনটি টুঙ্কিতে চিতু নেট থেকে বেরিয়ে এল।
”উই ডোন্ট প্লে ফর ফান। ক্রিকেট একটা আর্ট, আয়ত্ত করতে সাধনা লাগে। দু’রকমের ক্রিকেটার হয়, একদল ব্যাটকে কোদাল ভাবে, বাকিরা ভাবে সেতার। একদল কুলি, অন্যরা আর্টিস্ট।”
”পিচ যদি কোদাল চালাবার মতো হয় তা হলে ব্যাটকে কোদালই করতে হয়।” প্যাড খুলতে খুলতে চিতু বলল।
ননীদার মুখ থমথমে হয়ে গেল। আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, ”উইকেট—সোজা বল করবে আর লেংথে বল ফেলবে, কথাটা মাথায় ঢুকিয়ে রাখো, লেংথ আর ডিরেকশন। এ দুটোয় কমান্ড আনতে না পারলে বোলার হতে পারবে না। শুধু তখনই এই দুটো জিনিস ভুলবে যখন কুলিরা ব্যাট করবে। সোজা মাথা টিপ করে তখন বল ছাড়বে। তুমি কাল থেকে নেটে আসবে রেগুলার। আর, ওহে কন্ট্রাক্টর, তুমি অন্য ক্লাব দেখতে পারো।”
ননীদা কথা শেষ করেই তাঁবুর দিকে হনহনিয়ে চলে গেলেন। চিতুর জন্য মনটা খারাপ হয়ে গেল এক যাত্রায় পৃথক ফল হওয়াতে। অপমানে চিতুর মুখটা তখনও বেগুনি হয়ে আছে। ওকে বললাম, ”চল বরং অন্য ক্লাব দেখি আমরা। ঢের ঢের ক্লাব আছে গড়ের মাঠে।”
চিতু গোঁজ হয়ে রইল। ননীদার ছাত্রটি চুপ করে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। চশমার কাচ রুমালে মুছতে মুছতে বলল, ”প্রথম দিন আমায় বলেছিলেন বছর তিনেক দুর্যোধনের সঙ্গে পিচে জল দেওয়ার কাজ করতে। তাতে যদি ক্রিকেট সম্পর্কে কিছু জ্ঞান হয়।”
”তারপর পাঁচ বছর রোলার টানার কাজ!” চিতু তিক্তস্বরে মন্তব্য করল। ওকে সান্ত্বনা দেবার জন্য আমিও খুব বিরক্তিপূর্ণ ভঙ্গিতে বললাম, ”এই রকম একটা পাগলের কাছে আসতে হবে জানলে, কে আর আসত। ভাবা যায়, ব্যাট নিয়ে পঞ্চাশবার করে করে ওঠানামা করা?”
”কাল ব্যাক লিফট শিখেছি, গুনে একশোবার ব্যাট তুলতে হয়েছে আর নামাতে হয়েছে।”
”বলেন কী!” আমি রীতিমতো ভয় পেয়ে গেলাম। ”এরপর ড্রাইভ, হুক, কাট, পুল এসবও কি পঞ্চাশবার একশোবার ওইভাবে করতে হবে?”
শিউরে উঠে ছেলেটি বলল, ”না, না, তারও আগে ফিলডিং শিখতে হবে বলেছে। কমপ্লিট ক্রিকেটার তা না হলে হওয়া যায় না। দু’শো থ্রো আর দু’শো ক্যাচ লোফা, রো—ও—জ।”
”রানিং বিটুইন দ্য উইকেট?” আমি ওকে পাওয়াবার জন্য বললাম। ”প্যাড পরে ব্যাট হাতে একশোবার ছোটাছুটি করতে হবে না?”
চিতু এবার বিরক্ত স্বরে বলল, ”বাজে কথা রাখ তো, এভাবে উজবুকেরাই খেলা শেখে।”
এরপর চিতু আমাকে ফেলেই রেড রোড অভিমুখে চলে গেল। পরদিনই সি সি এইচ—এর চির প্রতিদ্বন্দ্বী রূপোলি সঙ্ঘের সম্পাদকের সঙ্গে সে দেখা করল। আমি কিন্তু হাটখোলাতেই রয়ে গেলাম। ননীদার ছাত্রটির সঙ্গে আমার খুব ভাব হয়ে গেল। ওর নাম অঞ্জন কর। বড়লোকের ছেলে। ক্রিকেটের বই অনেক পড়েছে। ব্র্যাডম্যানের ‘আর্ট অফ ক্রিকেট’ বইটা পড়ে প্রচুর জ্ঞান সংগ্রহ করে ফেলেছে কিন্তু ক্রিকেট কখনও খেলেনি। তাই প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং নিতে এসেছে ননীদার কাছে, বড় খেলোয়াড় হবার মোটেই ইচ্ছে নেই। ভদ্র এবং লাজুক অঞ্জন আমাকে একবার বলেছিল, ”খুব ইচ্ছে করে নেভিল কার্ডাসের মতো লেখক হতে। ওর সব বই আমার পড়া হয়ে গেছে।” আমি তখনও কার্ডাসের নাম জানতাম না, তাই বোকার মতো শুধু হেসেছিলাম আর মনে মনে বলেছিলাম, ছেলেটা আমারই বয়সি, কিন্তু পণ্ডিত। ওকে আমার ভাল লাগে এইজন্য যে, অনেক জেনেও চালিয়াত নয়, বাজে তর্ক করে না এবং ক্রিকেটে তার যে কিছুই হবে না, অকপটে তা স্বীকার করে। অঞ্জন এরপর এনজিনিয়ারিং পাশ করে বিলেত যায়। ফিরে এসে এখন দুর্গাপুরে বড় চাকরি করছে। সি সি এইচ—এর সঙ্গে ওর সংযোগ কখনও ছিন্ন হয়নি। ক্রিকেটকে ও সত্যিই ভালবাসে।
২
বারো বছর পর আজ আমার হঠাৎ সি সি এইচ নেটে প্রথম দিনের কথা মনে পড়ল।
নেটের ধারে আমি, ননীদা এবং ভবানী দাঁড়িয়ে প্র্যাকটিস লক্ষ করছি। এখন আমি ক্লাবের সিনিয়ার প্লেয়ার। এ বছরের ক্যাপ্টেন। প্রতিবারের মতো এবারও নতুন কয়েকটি ছেলে এসেছে। আমরা তিনজন সিলেকশন কমিটিরও মেম্বার, অবশ্যই নামকা ওয়াস্তে। কেননা ননীদা যা সিলেক্ট করেন আমরা তাতেই সই করে দিই বিনা প্রশ্নে। দ্বিতীয় ডিভিশন ক্লাব, প্লেয়াররা কেউ চাঁদা দেয় না। বছরের বাজেট প্রায় দু’হাজার টাকা। কীভাবে যে টাকা আসে একমাত্র ননীদাই তা জানেন।
ম্যাচ খেলার দিন তিনটি ব্যাটের মুখ দেখা যায়। খেলার শেষে ননীদা ব্যাটগুলি কাঠের বাক্সটায় ভরে তালা এঁটে নিজের কাছে চাবি রাখেন। ব্যাট তিনটি দিয়ে অন্তত আশিটা ম্যাচ খেলা হয়েছে। এ বছর নতুন একজোড়া না কিনলেই নয়। ননীদাকে সেকথা বলতেই উনি ঘাড় নেড়ে বলেছিলেন, ”হবে, হবে। একখানা যা মক্কেল এবার পাকড়েছি। ব্যাট কেন, গ্লাভস, প্যাড, নেট সব হবে।”
