আজ কোনির দেরী হয়ে গেছে। ক্ষিতীশের বাড়ি না গিয়ে, সে প্রায় ছুটতে ছুটতে প্রজাপতিতে এল। লীলাবতী নিজেই দোকান খুলেছে। পাশের ফোটগ্রাফি দোকানের ছেলেটি ভারী শাটারটা তুলে দিয়ে গেছে। লীলাবতী ওকে দেখেই রাস্তার দিকে আঙুল তুলে বলল, ”বেরিয়ে যাও। তোমায় আর দরকার নেই।”
ফ্যাকাসে হয়ে গেল কোনির মুখ। মুখ নামিয়ে সে দাঁড়িয়ে থাকল। এই সময় খদ্দের আসায় লীলাবতী আর কিছু বলল না। কোনি একে একে তার কাজগুলো করে গেল। ক্লান্তিতে এবং খিদেয় তখন সে ঝাপসা দেখছে, পা টলছে। তার খুব ঘুমোতে ইচেছ করছে কিন্তু দোকানে বসার মতো জায়গাও তার জন্য নেই। একবার সে ভয়ে ভয়ে লীলাবতীকে বলল, ”বৌদি, একটু বাড়ি যাব?”
বিরাট একটা মোটা খাতার উপর ঝুঁকে ফ্রকের মাপ লিখতে লিখতে লীলাবতী কড়া স্বরে বলল, ”না।”
কোনি সরে গিয়ে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকল। কাজটা থেকে বরখাস্ত হলে চল্লিশটা টাকা থেকে তাদের সংসার বঞ্চিত হবে।
ওদিকে ক্ষিতীশ বড় একটা থলি হাতে অ্যাপোলো থেকে বেরিয়ে তখন একটার পর একটা দর্জির দোকান ঘুরছে কাপড়ের ছাঁট কেনার জন্য। তিনটে লন্ড্রির সঙ্গে তার বন্দোবস্ত হয়েছে। মার্কা দেওয়া নম্বর টুকরো কাপড় লিখে জামাকাপড়ে বেঁধে কাঁচতে পাঠাবার জন লন্ড্রিগুলোর দরকার হয় এই ছাঁট। ছাঁট থেকে সমান মাপে কাপড় টুকরো করে কেটে ক্ষিতীশকে বিক্রি করতে হয়। ওরা দৈনিক প্রায় তিন কিলো কেনে। ক্ষিতীশ টাকা ছয়—সাত লাভ করে।
দুপুর প্রায় একটা নাগাদ ক্ষিতীশ ছাঁট ভর্তি থলি নিয়ে কোনিদের ঘরের দরজায় হাজির হল। কোনির মা বেরিয়ে আসতেই সে ঝাঁজিয়ে উঠল, ”কাল রাতে কোনি কখন ঘুমিয়েছিল?”
”কেন, রোজ যেমন সময়ে ঘুমোয়।” জড়োসড়ো হয়ে কোনির মা বলল।
”ঠিক বলছ?” ক্ষিতীশ তীব্র দৃষ্টিতে তাকাল। ”আজ এতো তাড়াতাড়ি ক্লান্ত হয়ে পড়ল কেন তাহলে? দ্যাখো মেয়ে, আমার কাছে কিছু লুকোলে কিন্তু ঠিক ধরা পড়ে যাবে। ঠিক করে বলো, কখন কোনি ঘুমিয়েছে।”
”না বাবা, আপনার কাছে মিছে বলব না। কাল রাতে কোনি যাত্রা শুনতে গেছল। রাত একটা নাগাদ ফিরে শুয়েছে।”
”হুঁ।” থলিটা এগিয়ে দিয়ে ক্ষিতীশ বলল, ”এগুলো কেটে রেখো, আজই, কাল সকালে কোনির হাত দিয়ে ক্লাবে পাঠিও।”
পাঁচটা টাকা কোনির মার হাতে দিয়ে, ফেরার আগে ক্ষিতীশ বিষণ্ণ স্বরে বলল,”ছোট মেয়ে,ওর তো সখ হবেই। কিন্তু ওর ভালর জন্যই তোমাকে কড়া হতে হবে। কে কোন খেলা সাধনার জিনিষ। সিদ্ধিলাভ করতে হলে সন্ন্যাসীর মতোই জীবন যাপন করতে হয়। বহু ছোটখাট ব্যাপার আছে সাধনার পক্ষে যা ক্ষতিকর। যাত্রা নিশ্চয় দেখবে, কিন্তু এখন এই ট্রেনিংয়ের সময় বিশ্রাম নষ্ট করে নয়। এগুলো তোমায় বুঝতে হবে।”
বাড়ি ফিরে ক্ষিতীশ দেখল লীলাবতী অপেক্ষা করছে। তখুনি সে খেতে বসে গেল। খেতে খেতে খুবই সাধারণভাবে জিজ্ঞাসা করল, ”কোনি খেয়েছে?”
লীলাবতী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, ”ওকে দিয়ে, আমার কোন কাজ হবে না, ঝিমোয় শুধু। বসতে দিই না, দাঁড়িয়েই আজ ঘুমোচ্ছিল।”
”আজ ওকে খুব খাটিয়েছি।”
”তাতে আমার কি লাভ। পাঁচ হাজার টাকা বাঁচিয়ে দিয়ে অন্যদিক থেকে সেটা নিয়ে নিচ্ছ।”
”ওর খাওয়ার জন্য তো মাসে পঞ্চাশ টাকা দিচ্ছি।”
”রোজ দুধ ডিম মধু, মাসে পঞ্চাশ টাকায় কি হয়।”
ক্ষিতীশ তাড়াতাড়ি খাওয়া সেরে উঠে পড়ল। ঘরে এসে দেখে কোনি মেঝেয় অকাতরে ঘুমোচ্ছে। বালিশের বদলে দুটি হাত জড়ো করে মাথার নিচে রাখা। ক্ষিতীশ ওর পাশে বসে আলতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। একটু পরেই কোনি নড়ে উঠে আরো গুটিসুটি হয়ে সরে এল ক্ষিতীশের দিকে। বিড়বিড় করে কি যেন বলল। ক্ষিতীশ ঝুঁকে পড়ল শোনার জন্য।
”দাদা?”
”হ্যাঁ।”
একটা পাতলা হাসি কোনির মুখে চারিয়ে গেল। ”আমায় কুমীর দেখাবে বলেছিলে।”
”দেখাব, চিড়িয়াখানায় তোকে নিয়ে যাব।” ফিসফিস করে ক্ষিতীশ বলল। ”আরো অনেক জায়গায় আমরা যাব—বেলুড় মঠ, ব্যান্ডেল চার্চ, ডায়মন্ড হারবার, জাদুঘর, অনেক অনেক জায়গায়। তারপর তুই যাবি দিল্লী, বোমবাই, মাদ্রাজ; তারপর যাবি আরো দূরে টোকিও, লন্ডন, বার্লিন, মস্কো, নিউইয়র্ক।”
ঘুমের মধ্যেই কোনির মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
”ক্ষিদ্দা আমাকে কষ্ট দেয় দাদা। আমি ঠিক মেডেল এনে দোব তোমায়।”
কোনি মুখে হাসি নিয়ে ঘুমের মধ্যে ডুবে গেল। ক্ষিতীশ ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, ”তোকে আরো কষ্ট দেব রে, আরো দেব।”
রবিবার প্রজাপতি বন্ধ থাকে। সেদিন কোনির ট্রেনিংয়েও ছুটি। ক্ষিতীশের কাঁধে ঝুলছে থলি। তাতে আছে, কাগজের মোড়কে রুটি, আলু ছেঁচকি, গুড়, সিদ্ধডিম আর কলা।
ওরা দুজন বাড়ি থেকে দশটায় বেরিয়েছে। চিড়িয়াখানায় ঘণ্টা তিনেক ঘুরে পুকুরধারে ঘাসে বসেছে। ক্ষিতীশ খাবারের মোড়ক দুটো বার করে বলল, ”জল খাওয়াটাই মুশকিল হবে। ওয়াটার বটলটা আনলে হতো।”
ওদের থেকে কিছু দূরে স্কুল ইউনিফর্ম পরা জনা তিরিশ মেয়ে হৈ চৈ করে হাজির হল। সঙ্গে চারজন টিচার। দুজন দরোয়ান খাবারের ঝুড়ি বয়ে আনল। ওরা গোল হয়ে খেতে বসেছে। কোনি কৌতূহলভরে মাঝে মাঝে ওদের দিকে তাকাচ্ছে। আর রুটি চিবোচ্ছে।
”ক্ষিদ্দা, ওদের কাছে জল আছে। চাইব?”
