”আপনিই কি ননীবাবু?” চিতু কাছে গিয়ে খুব স্মার্টলি লোকটিকে বলল।
ব্যাট হাতে লোকটি তখন চশমাপরা রোগা ফরসা একটি ছেলেকে নেটের বাইরে থেকে বোঝাচ্ছিল কীভাবে ফরোয়ার্ড ডিফেন্সিভ খেলতে হয়। ছেলেটি তটস্থ হয়ে শুনছে। লোকটি বাধা পেয়ে বিরক্ত চোখে একবার চিতুর দিকে তাকাল মাত্র। ছেলেটিও তাকাল।
”লুক হিয়ার।” লোকটির বাজখাঁই কণ্ঠস্বরে ছেলেটির সঙ্গে আমিও চমকে উঠলাম। চিতু এক—পা পিছিয়ে এল।
”এই হচ্ছে স্টান্স।” লোকটি দেখাতে শুরু করল। ”লেফট শোলডার থাকবে এইভাবে, আমার পা লক্ষ করো, শরীরের ওজন সমানভাবে দুপায়ে চারিয়ে দিয়েছি, বোলারের দিকে মুখটা…ভাল কথা, তুমি লেফট—হ্যান্ডার না?”
”আজ্ঞে হ্যাঁ।” ছেলেটি ঢোঁক গিলে বলল।
”গুড, ভেরি গুড। আমি একটা লেফট—হ্যান্ডারই চাইছি। হ্যাঁ, তা হলে হবে রাইট শোলডার। বোলার বল করতে আসছে…এখন ডেলিভারি স্টাইলে, দ্যাখো ভাল করে দ্যাখো…এইভাবে ব্যাট উঠছে, ব্যাক লিফট কমপ্লিট…তারপর কী করবে?”
”ফরোয়ার্ড খেলব।” ছেলেটি প্রবল উৎসাহে চটপট বলল।
লোকটি সেকেন্ড পনেরো ওর মুখের দিকে ঠায় তাকিয়ে রইল, যেন চাঁদের নুড়ি দেখছে। তারপর ধীরস্বরে বলল, ”গবেট।” ছেলেটির ফরসা মুখ লাল হয়ে উঠল।
”আমি কি বলেছি বলের ডেলিভারি হয়েছে? বল এখন তো বোলারের হাতে। উইকেটের পেস কেমন, বাউন্স কেমন তাই জান না, আর আগে থেকেই বলে দিলে ফরোয়ার্ড খেলব?”
”আপনি ফরোয়ার্ড কীভাবে খেলতে হয় শেখাচ্ছেন তো, তাই বললুম।” ছেলেটি প্রায় কাঁদোকাঁদো হয়ে বলল। লোকটি আবার সেকেন্ড পনেরো তাকিয়ে থেকে বলল, ”বলটা শর্ট পিচ কি ওভার পিচ, স্টাম্পের মধ্যে না বাইরে, কতটা সুইং বা কতটা স্পিন, এসব না দেখেই ফরোয়ার্ড খেলবে?”
ছেলেটির ভ্যাবাচাকা মুখ দেখে চিতু হাসি সামলাতে পারল না। লোকটি সঙ্গে সঙ্গে ডান হাতের তর্জনীটি চিতুকে লক্ষ্য করে বাঁকিয়ে ঘুড়িতে টুঙ্কি দেবার মতো তিনবার নেড়ে বলল, ”কাম হিয়ার!”
চিতু খুব স্মার্ট ছেলে। সঙ্গে সঙ্গে সে বিশ্বনাথদার চিঠিটা এগিয়ে ধরল। ”আপনিই যে ননীবাবু, তা দেখেই বুঝে গেছি।”
”বটে”, লোকটি চিঠিটা পড়তে পড়তে বলল, ”বুঝে গেছ?”
”আমি নয়, মতিই আপনাকে চিনেছে ঢোলা প্যান্টটা দেখে।”
ননীদা সেকেন্ড দশেক আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কেমন ভয়—ভয় অস্বস্তি শুরু হল আমার, চিতুটার উপর রাগও ধরল। ফোঁপরদালালি করে এত কথা বলার কী দরকার! ননীদা কিছু বলার জন্য ঠোঁট ফাঁক করেছেন, চিতু অমনি বলল, ”আমার নাম চিত্তপ্রিয়, আই অ্যাম এ লেফট—হ্যান্ডার।”
ননীদার খোলা ঠোঁট দুটি একটা ফাস্ট ইয়র্কারকে সামাল দেবার মতো ঝটিতি বন্ধ হয়ে গেল।
”অ্যান্ড অ্যান ওপেনিং ব্যাট লাইক নরি কন্ট্রাক্টর।” চিতু বুক চিতিয়ে বলল। কন্ট্রাক্টর তখন দারুণ খেলছে। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে আগের বছরই একটা সেঞ্চুরি করেছে টেস্টে।
”তোমার লোয়েস্ট রান কত?”
চিতু একটু থতমত হলেও বেশ দ্রুতই বলল, ”ঠিক মনে পড়ছে না, তবে দশের কম নয়।”
”কটা জিরো করেছ?”
”একটাও না।”
লক্ষ করলাম ননীদার ঠোঁট দুটো এবার ফুলটস দেখে ব্যাট তোলার মতো খুলতে শুরু করল এবং সপাটে পুল করল—”তার মানে এখনও খেলাই শেখোনি।”
অবধারিত বাউন্ডারি, সুতরাং রানের জন্য দৌড়বার দরকার নেই, এইরকম ভঙ্গিতে ননীদা চিতুর দিকে পিছন ফিরলেন এবং এতক্ষণ অপেক্ষমাণ ছাত্রটিকে উদ্দেশ করে বললেন, ”ব্যাট যখন ওপর থেকে নামবে একদম পারপেন্ডিকুলার, স্ট্রেট নামবে। এসো দেখাচ্ছি।”
নেটের মধ্যে ননীদা যখন একটা বল গুড লেংথ বরাবর পিচের উপর রেখে ফরোয়ার্ড ডিফেন্সিভ খেলার মহড়া দিচ্ছিলেন, তখন চিতুকে বললাম, ”এখানে পেঁয়াজি করিসনি, লোকটা কড়া আর খেলাও বোঝে।” চিতু তাচ্ছিল্যভরে কাঁধ ঝাঁকাল।
ননীদা নেট থেকে বেরোলেন। তাঁবুর লোহার ফেন্সিংয়ের ধারে একটা জায়গার দিকে আঙুল দেখিয়ে ছাত্রটিকে বললেন, ”ওখানে গিয়ে যেমনটি দেখালুম, ঠিক সেইভাবে ফরোয়াড ডিফেন্সিভের শ্যাডো প্র্যাকটিস করো পঞ্চাশবার, যাও।” তারপর চিতুর দিকে ফিরে বললেন, ”ইয়েস মিস্টার নরি কন্ট্রাক্টর, প্যাড অন।”
তারপর আমার দিকে তাকিয়ে ভ্রূ কুঁচকে বললেন, ”তোমার নাম মতি, ফাস্ট বল করো?”
”আজ্ঞে হ্যাঁ।” এবং নিমেষে লিন্ডওয়ালকে হুক করার জন্য প্রয়োজনীয় ফুটওয়ার্কের দ্রুততার যোগ করলাম, ”মানে চেষ্টা করি।”
”দেখি কেমন চেষ্টা করো। যাও কন্ট্রাক্টরকে বল করো।”
এইবার আমার উভয়—সংকট। চিতু আমার বলে সুবিধা করতে পারে না, বিশেষ করে শর্টলেংথগুলো। যদি তেড়ে বল করি তা হলে ননীদার সামনে চিতুর অবস্থা কাহিল হয়ে পড়বে। হয়তো সি সি এইচ—এ ওকে নেবেই না। আবার আমি যদি চিতুর মুখ চেয়ে ঢিলে বল করি, তা হলে আমাকেই হয়তো আউট হতে হবে। মাঝামাঝি পথ নিলাম। যত জোরে পারি উইকেটের বাইরে দিয়ে বল করতে লাগলাম। বলের পেস কেমন ননীদা সেটুকু বুঝলেই হল।
নেটের পিচ খুবই খারাপ। কয়েকটা বল বিশ্রীভাবে লাফিয়ে উঠল, শুট করল। চিতু ডাইনে—বাঁয়ে গাঁইতির মতো ব্যাট চালাল। যেগুলো ব্যাটে—বলে হল তার বেশির ভাগই ব্যাটের কানায় লেগে স্লিপ বা উকেটকিপারের (যদিও নেটে কেউ ছিল না) মাথার উপর দিয়ে নেট টপকে গিয়ে মহমেডান মাঠের বেড়ায় ঠকাস ঠকাস শব্দ করল।
