”তারপর এই মাঠেই গ্যালারি বসিয়ে টেস্টখেলা হোক আর কী।” ননীদা শহিদ মিনারের গা বেয়ে সরসর করে চোখটাকে নামিয়ে এনে হা হা করে ছুটে গেলেন—”বাইরে দিয়ে, বাইরে দিয়ে। বাহারসে যাইয়ে।”
লোক দুটো থমকে গেল পিচের কিনারে এসে। পরস্পরের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে বলল, ”কাহে বাহার সে যায়গা?”
”পূজা হোগা। হোম যজ্ঞকে লিয়ে এই স্থান সাফ কিয়া থা।” ননীদা সসম্ভ্রমে পিচের দিকে ওদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। ”ক্রিকেট দেওতা কা পূজা হোগা।” শুনেই ওরা অবনত মস্তকে পিচের উদ্দেশে করজোড়ে প্রণাম করে, মহমেডান মাঠের বেড়া ঘেঁষে হাইকোর্ট মাঠের দিকে চলে গেল, সম্ভবত চিড়িয়াখানা কি ভিকটোরিয়া মেমোরিয়ালের দিকে।
এতক্ষণ আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছিলাম ও শুনছিলাম। ননীদা কাছে আসতেই বললাম, ”এটা কী হল?”
”ট্যাকটিকস, কুইক আউট করে দিলুম। যদি বলতে—ইয়ে হ্যায় ক্রিকেট পিচ, ইসকা উপর সে হাঁটা মানা হ্যায়, তা হলে অনেক তর্ক, অনেক ঝামেলা শুরু হত। ব্যাটসম্যানকে সেটল করতে দেবার আগেই ফিরিয়ে দেবে। মনে রেখো মতি, এবছর তুমি সি সি এইচ—এর ক্যাপ্টেন। তোমাকে ট্যাক্টফুল হতে হবে।”
সবিনয়ে ঘাড় নেড়ে বললাম, ”নিশ্চয়। তা ছাড়া আপনি তো আছেনই, দরকার পড়লে পরামর্শ নিশ্চয় করব।” খুশি করার জন্য কথাগুলো বলিনি, বিপদে ননীদাকে সত্যিই দরকার হবে। ননীদার ট্যাকটিকস, যাকে আমরা ‘ননীটিকস’ নামে আড়ালে অভিহিত করি, কতবার যে সি সি এইচ—কে বিপদ থেকে উদ্ধার করেছে তা লিখতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে। তবে দু’চারটের কথা অবশ্যই উল্লেখ করব।
ননীদা গত বছর পর্যন্ত আমাদের ক্লাবের ক্যাপ্টেন ছিলেন। কত বছর ছিলেন সেটা আমার পক্ষে খাতাপত্তর না দেখে বলা শক্ত। সম্ভবত সিকি—শতাব্দী। বারো বছর মাত্র এই ক্লাবে আছি। তার মধ্যে ননীদাকে যে রূপে দেখেছি তা বোঝাতে হলে, প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারি, ট্রেজারার, সিলেকটর, স্কোয়ার, মালী, সাবস্টিটিউট ফিল্ডার, ক্যাপ্টেন প্রভৃতিকে একত্রে একটি লোকের মধ্যে ভরে দিলে যা হয়, উনি তাই। ওঁর মুখের উপর কথা বলতে পারে বা ওঁর কথা অগ্রাহ্য করার সাহস দেখাতে পারে এমন কাউকে এখনও সি সি এইচ—এ দেখিনি। অনেককে গাঁইগুই করতে শুনেছি, কিন্তু আড়ালে। দুর্যোধনের পোষা নেড়িকুত্তাটা পর্যন্ত ননীদার গলার আওয়াজ পেলে লেজটাকে নামিয়ে সরে যায়। ননীদাকে এল বি ডবল্যু আউট দিয়ে এক আম্পায়ারকে দেখেছিলাম খেলা শেষে উইকেট থেকে তাঁবুতে না ফিরে হনহনিয়ে উলটোদিকে বঙ্গবাসী কলেজ—মাঠ পেরিয়ে একটা চলন্ত বাসে লাফ দিয়ে উঠে পড়তে।
ননীদার সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ বারো বছর আগে সি সি এইচ—এর এই নেটে।
আমাদের পাড়ার বিশ্বনাথদা চুয়াল্লিশ সালে মোহনবাগানে ক্রিকেট খেলেছেন সেই বছর রঞ্জি ট্রফিতে বাংলা দলের পনেরোজনের মধ্যেও নাকি ছিলেন। আমরা ওঁকে খুব খাতির করি, বিশেষ করে আমি আর চিতু, অর্থাৎ চিত্তপ্রিয়। আমাদের দুজনের ইচ্ছে বিশ্বনাথদার সুপারিশে মোহনবাগানে ঢোকা, তারপর খেলা দেখিয়ে উন্নতি করা। উন্নতি বলতে টেস্ট খেলা।
বিশ্বনাথদাকে বলতেই তো চোখ পিটপিট করে বললেন, ”মোহনবাগানে?” আমাদের আপাদমস্তক বার চারেক দেখে আবার বললেন, ”খেলবি? বলিস কী! তোদের সাহস তো কম নয়!”
চিতুটা টেঁটিয়া ছেলে। ফস করে বলল, ”আপনি খেলেছেন, আমরা পারব না কেন?”
”দুখিরামবাবুর ডাইরেক্ট শিষ্য ফকিরবাবুর কাছে আমি তালিম নিয়ে তবেই মোহনবাগানে খেলার কথা চিন্তা করেছি। আর তোরা? এখনও রাস্তায় ক্যাম্বিসবল পেটাস, ঘাস চিনলি না গড়ের মাঠের, ফুলটস আর ইয়র্কারের প্রভেদ জানিস না, অথচ মোহনবাগানে খেলতে চাস। পিচের উপর একটা আধলা রেখে তার উপর বল ফেলতে পারতুম। কেন জানিস? এবেলা চারঘণ্টা ওবেলা চারঘণ্টা, নাগাড়ে আন্ডার দ্য ওয়াচফুল আইজ অফ ফকিরবাবু আমি বল করেছি নেটে। যখন আউট অফ হানড্রেড পঁচানব্বুইটা বল আধলায় ফেললুম তখন ফকিরবাবু বললেন, এবার তোকে রিজার্ভে আনব। এই রকম ব্যাপার ছিল আমাদের সময়। গুরু ছিল, কঠিন সাধনা ছিল। আর এখন?”
চিতু বলল, ”আমরাও সাধনা করতে রাজি যদি কেউ দেখিয়ে দেন একটু। আপনি দেবেন?”
”আমি!” বিশ্বনাথদা আকাশ থেকে পড়লেন, ”আমি অফিস ফেলে এখন ক্রিকেট শেখাব? বরং তোরা ননীর কাছে যা। আমার গুরুভাই, গুড কোচ, ক্রিকেট নিয়েই দিনরাত পড়ে আছে, ভেরি হার্ড টাস্কমাস্টার। আমি একটা চিঠি লিখে দিচ্ছি তাই নিয়ে দেখা কর। আগে ছোট ক্লাবে খেলে তারপর বড় ক্লাবে খেলতে হয়, বুঝেছিস।”
বিশ্বনাথদার চিঠি নিয়ে আমি আর চিতু এক দুপুরে গড়ের মাঠে ক্রিকেট ক্লাব অফ হাটখোলার তাঁবুতে হাজির হলাম। মাঠে চারটি ক্লাবের চারটি নেট পড়েছে। প্রতি নেটে গড়ে দশজন। চিতু বলল, ”কোনটা সি সি এইচ—এর হবে বল তো?”
আমি অত্যন্ত মনোযোগে চারটি নেট লক্ষ করে শেষে বললাম, ”ওই ডানদিকেরটা—যেখানে টাকমাথা, ঢলঢলে প্যান্টপরা, বেঁটে কালো লোকটা কথা বলছে, ওই বোধ হয় ননীদা।”
”কী করে বুঝলি?”
”প্যান্টটা দেখ, মনে হচ্ছে নাকি ওটা ফকিরবাবুর আমলের তৈরি? আর কেউ কি অমন প্যান্ট পরে এখানে আছে?”
চিতু সারা মাঠে চোখ বুলিয়ে বলল, ”চল তা হলে ওর কাছে।”
