ম্লান, বিষণ্ণ হাসিতে নারান কথাগুলোকে মুড়ে দিল এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মোড়কটা খুলে বলল, ”অবশ্য সেজন্য আমার কোনও দুঃখ নেই।”
”আগে খবর দিয়ে না এলে এইরকম হয়রান হতে হয়। আপনি বন্ধুকে বোধহয় আগে বলে রাখেননি?”
”না, বলে রাখিনি। ভেবেছিলাম হঠাৎ দেখা করে অবাক করে দেব।”
”এখন কি বাড়ি ফিরবেন?”
”হ্যাঁ, ধান্যকুড়িয়া। ওখানেই সাতচল্লিশ সাল থেকে আছি।”
”ওখান থেকে সাইকেলে ঝাউডাঙায় রোজ আসতেন কাগজ বিক্রি করতে!” ভদ্রলোকের বিস্ময় গলা আর চোখ ঠেলে বেরিয়ে এল। নারান শুধু হাসল।
”আপনি কি এখনও ঝাউডাঙায় থাকেন?”
”দমদমে বাড়ি করেছি। ওখানেই আমার কারখানা, জানলা দরজার গ্রিল তৈরি করি। এখানে এসেছিলাম জ্যাটোপেককে দেখার জন্য।”
”দেখলেন?” নারান উত্তেজনা দমন করে নিস্পৃহ কণ্ঠে বলল।
”হ্যাঁ। বেশ মোটা হয়ে গেছে। মাথার চুল তো কম ছিলই, এখন একেবারেই টাক।”
”আর কী দেখলেন?”
”আর কী দেখার আছে। এখন তো উনি নিবে যাওয়া আগ্নেয়গিরি।”
”উনিশশো বাইশের উনিশে সেপ্টেম্বর।” অস্ফুটে নারান বলল, ”দু বছরের ছোট।”
”য়্যাঁ?” লোকটি বুঝতে না পেরে জানতে চাইল।
”কিছু না, একটা জন্মসাল মনে পড়ল তাই। আমার বন্ধু যে আমার থেকে দু’ বছরের ছোট এটা ভুলেই গেছলাম। তা হলে জ্যাটোপেককে দেখে আপনি খুবই নিরাশ হয়েছেন।”
ট্রেনের আলো এগিয়ে আসছে। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো লোকেরা লাইনের ধার থেকে একটু পিছিয়ে এল। নারানের কথার জবাব না দিয়ে লোকটি তাকিয়ে রইল স্টেশনে প্রবেশরত ট্রেনের দিকে।
ট্রেনের দরজায় ওঠানামার একটা ধাক্কাধাক্কি প্রথমে হবেই। এই অনুমান করে নারান একটু বেশি পিছিয়ে এল। মুখ পাশে ফিরিয়ে তাকাল প্ল্যাটফর্মের ভিড় আর মন্থর হতে হতে থামা ট্রেনের দিকে। হঠাৎ তার মনে হল এই ট্রেনটাই যেন জ্যাটোপেক আর এই লোকগুলো যেন তার জীবনের পেরিয়ে আসা বছর। দুবার সে চেষ্টা করে এই ট্রেনটা ধরতে পারেনি।
হুড়মুড়িয়ে কামরা থেকে লোক নামছে আর ট্রেন ছেড়ে দেবার ভয়ে মরিয়া লোকেরা ঠেলেঠুলে ঢোকার চেষ্টা করছে। নারান যার সঙ্গে কথা বলছিল সেই লোকটি কোনদিকে যেন ছিটকে গেছে। ধাক্কাধাক্কি শেষ হবার পর সে পুঁটলি বগলে শান্ত ভাবে সামনের কামরায় উঠে দাঁড়াবার মতো জায়গা পেল।
ট্রেন চলতে শুরু করার পর নারান কামরার মধ্যে চোখ বোলাল। নানা ধরনের মানুষ, ছোট বড়, লম্বা বেঁটে, নানারকমের মুখ, পোশাক কথাবার্তা। এতগুলো, এত রকমের বছর! এরই মধ্যে আমলকীর, বাদামের, মুসম্বি লেবুর ফেরিওয়ালা নিজেদের পসরা বিক্রি করে যাচ্ছে। নারানের মনে হল, কত বছর ধরে সে ট্রেনে যাতায়াত করেছে কিন্তু এমন করে কখনও তো সে মানুষজনের দিকে তাকায়নি!
ট্রেনটা দুলছে। নারান চোখ বন্ধ করে পিছনের দিকে যত দূর দৃষ্টি যায় দেখার চেষ্টা করল। চেষ্টা করতে করতে তার মনে হল, জীবন তাকে অনেক কিছুই তো দিয়েছে। তার কোনও অভিযোগ নেই, জ্যাটোপেককে দেখতে না পাওয়ার জন্য কোনও আফশোস নেই। মানুষের সব আকাঙ্ক্ষাই কি পূরণ হয়? পূরণ হলে সেটাকে আর জীবন বলা যায় না।
রাত্রে বাড়ি ফিরে মহামায়ার জিজ্ঞাসু চোখের দিকে তাকিয়ে নারান বলল, ”আমি তো বলেই ছিলাম, এই বয়সে কি জেতা যায়?”
”শেষ করেছিলে তো?” উদ্বিগ্ন কণ্ঠে মহামায়া জানতে চাইল।
উদ্ভাসিত মুখে নারান বলল, ”নিশ্চয়ই। এইটুকু পথ দৌড়তে পারব না! যতদিন পারি হুসহুস করে আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলব।”
ননীদা নট আউট
ননীদা নট আউট – মতি নন্দী – কিশোর উপন্যাস
ক্রিকেট সিজনের শুরুতেই সি সি এইচ—এর অর্থাৎ ক্রিকেট ক্লাব অফ হাটখোলার নেট পড়ে মহামেডান মাঠের পাশে, মেম্বার গ্যালারির পিছনে।
চার শরিকের মাঠ। সি সি এইচ দেয় বছরে চারশো টাকা। হেড মালী দুর্যোধন মহাপাত্র। পুজো শেষ হলেই মাঠের মাঝে একখণ্ড জায়গার চারকোণে বাঁশ পুঁতে দড়ি দিয়ে ঘিরে দেয়। জল ঢেলে আর কয়েকদিন রোলার টেনে ডলাই—মলাই করে, দুর্যোধন যখন সগর্বে ঘাসবিহীন পাথুরে পিচের দিকে হাত তুলে বলল, ‘কী একখানা পিচো বনাইছি দেখ ননীবাবু, লরি চালাই দাও কিছু হবেনি।”
তখন ননীদা গম্ভীর থেকে আরও গম্ভীর হয়ে উঠলেন। তারপর খুব ঠাণ্ডা গলায় বললেন, ”ক্রিকেট লরি—ড্রাইভারদের খেলা নয়, দুর্যোধন।”
”মো কি সে কথা বলিছি। গত বৎসর আপোনি বলিলেন, কড়া ইস্তিরি—করা শার্টের মতো পেলেন পিচ না হলি ব্যাটোসম্যান স্টোরোক করি খেলবি কেমনে? তাই এবছর ইস্তিরির মতো করি রোলার টানিছি।”
”ক্রিকেট ধোপাদেরও খেলা নয়, দুর্যোধন।”
দুর্যোধন একটু ঘাবড়ে গেল ননীদার আরও ঠাণ্ডা গলার স্বরে। ক্ষুণ্ণ হয়েই সে বলল, ”গত বৎসরের আগের বৎসরো বলিলেন, কী পিচ বনাইছিস, এ যে খেতি জমি, ধানো ছড়াই দিলি গাছো হই যিব।”
”ক্রিকেট চাষাদেরও খেলা নয়, দুর্যোধন।”
এবার দুর্যোধন ভ্রূ কুঁচকে বিরক্ত চোখে ননীদার ভাবলেশহীন মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ”কিরিকেট তবে কারা খেলে?”
”ভদ্রলোকেরা।” ননীদা আকাশবাণী ভবনের গম্বুজ থেকে শহিদ মিনারের ডগায় উদাস চাহনিটাকে সুইপ করে নিয়ে গেলেন। ”পিচ হবে স্পোর্টিং, বোলার আর ব্যাটসম্যানকে ফিফটি—ফিফটি সুযোগ দেবে।”
দুর্যোধনের বেঁটে শরীরটা জিজ্ঞাসা চিহ্নের মতো বেঁকে গেল একটা অদৃশ্য ভারী গদা তুলতে গিয়ে। দাঁত কিড়মিড় করে সে বলল, ”তংকা বাড়াও, ইডেন মতো মো পিচো বনাই দিব।”
